সংকীর্ণ পাথুরে ক্যাটওঅক ধরে ছুটতে শুরু করল ও। আগে যেখানে হামাগুড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিল এখন সেখানেই হালকা পায়ে দৌড়াচ্ছে। বাতাস আঁকড়ে ধরতে চাইছে ওকে, ওর টিউনিকের হেমে বাড়ি মারছে, কিন্তু গতি কমল না ওর। ক্যাটওয়ের শেষে সুড়ঙের পাথুরে ছাদের কাছে পৌঁছে মাথা নিচু করে এগিয়ে গেল ও, বাক ও মোড়গুলো পেরিয়ে যাচ্ছে, সুড়ঙের বাঁকে পৌঁছার আগে আর থামল না ও। মূল শাখায় পা রাখল।
এমনকি এখানেও সময় ক্ষেপণের দরকার মনে করল না ও। গভীর শ্বাস নিচ্ছে ও, তবে স্থিতিশীল, সিডার গাছের গুঁড়ির মতোই শক্তিশালী ওর পা। তারপরেও মশালটা দেয়ালের স্বাভাবিক ফোকরে ঠেসে দিল ও, তারপর টিউনিক উঁচু করে একটা পাথুরে ধাপে পড়ল। টিউনিক কোমর পর্যন্ত তুলে পাজোড়া পরখ করল। মসৃণ ত্বকে হাত বোলাল: নিচের পেশি পরিপূর্ণ, স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। স্পর্শ করল ও; কঠিন ও জোরাল ঠেকল। এবার হাত খেয়াল করে দেখল ও। পিঠের চামড়া ঠিক তারুণের হাতের মতো। বয়সের গাঢ় বলীরেখা বিদায় নিয়েছে। বাহুজোড়া ঠিক পায়ের মতোই, কঠিন, সুঠাম। দুই হাত মুখের কাছে তুলে আনল ও। হাতের আঙুল দিয়ে পরখ করল। দাড়ি আগের চেয়ে ঘন লাগল, গলা ও চোখের নিচের ত্বক বুলীরেখাহীন। চুলে হাত চালাল ও। ঘন, আবার কাঁচা হয়ে গেছে।
খুশিতে কীভাবে এই বদল ঘটে গেছে ভেবে জোরে হেসে উঠল ও। ওকে দেওয়া আয়নাটা সাথে আনা উচিত ছিল, ভাবল ও। অন্তত এক শো বছর ন্যায়সঙ্গত গর্বের সন্তোষ বোধ করেনি ও।
আবার তরুণ হয়ে গেছি! চিৎকার করে বলে উঠল। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মশালটা হাতে তুলে নিল আবার।
*
আরও দূরে যাবার আগেই একটা সিপে এসে পৌঁছাল ও যেখানে ফাটল থেকে মিষ্টি পানি চুঁইয়ে বের হয়ে এসে টানেলের দেয়াল বেয়ে নেমে একটা স্বাভাবিক পাথুরে বেসিনে জমা হচ্ছে। দৌড়ানোর সময়ও ফেনের চিন্তা চলছিল ওর মনে। ওকে শেষ বার দেখার পর অনেক মাস কেটে গেছে। শেষবার দেখার পর মেয়েটার চেহারা কতটা বদলে গেছে ভাবল ও। এর আগে ওর সাথে সংক্ষিপ্ত যোগাযোগের সময় মেয়েটার মাঝে এক সাগর পরিবর্তন লক্ষ করেছে ও।
অবশ্যই বদলে গেছে ও, তবে আমার মতো অতটা নয়। এরপর দেখা হলে আমরা একে অন্যকে চমকে দেব। এখন তরুণী হয়ে উঠেছে ও। আমাকে কোন চোখে দেখবে? ওদের সাক্ষাতের কথা ভেবে কেমন যেন ঘোের লেগে যাচ্ছে।
সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সব বোধ হারিয়ে ফেলেছে ও। এখন দিন না রাত জানা নেই, কিন্তু এগিয়ে চলল। অবশেষে এমন একটা জায়গায় হাজির হলো। যেখান থেকে আরেকটা খাড়া সিঁড়ি নেমে গেছে। নিচে নেমে সামনে যাবার পথে একটা ভারি চামড়ার পর্দা আটকানো দেখতে পেল, সেটায় বিভিন্ন প্রতীক ও হরফের নকশা। চট করে মশালটা নিচু করে ওটার আরও সামনে চলে এলো। চামড়ার ফাঁক দিয়ে আলোর নরম একটা রেখা দেখা যাচ্ছে। মনোযোগ দিয়ে শুনল ও। ফন্টে নামার আগে যেমন ছিল তারচেয়ে ঢের বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে এখন ওর শ্রবণ শক্তি। কিছুই শুনতে পেল না। সাবধানে পর্দার ফোকরটা আরেকটু ফাঁক করে উঁকি দিল। ছোট অথচ চমৎকার আসবাবে সাজানো একটা কামরার দিকে তাকিয়ে আছে ও। জনমানুষের চিহ্ন আছে কিনা চট করে দেখে নিল, কিন্তু কোনও আভা পেল না। পর্দা তুলে ভেতরে পা রাখল ও।
এটা ইয়োসের খাস কামরা। দেয়াল ও ছাদ আইভরি টালিতে ঢাকা, প্রত্যেকটায় চমৎকার সব নকশা আঁকা, মনিমুক্তার রঙে রঙ করা। ফলাফল রীতিমতো মহোনীয়, উজ্জ্বল। ব্রোঞ্জের চেইনে চারটা তেলের কুপি ঝোলানো রয়েছে। ওগুলোর বিচ্ছুরিত আলো কোমল। দূর প্রান্তের দেয়াল ঘেঁষে রেশমী কাপড়ে ঢাকা একটা কাউচ ঠেস দেওয়া, ওটার উপর কুশন; নিচু একটা সেগুন কাঠের টেবিল রয়েছে মেঝের মাঝখানে। ওটার উপর রাখা ফল, মধু, পিঠা ও অন্যান্য মিষ্টির গামলা। সাথে একটা ছোট স্ফটিকের মদের জগ। সোনালি ডলফিনের মতো লাগছে। টেবিলের আরেক পাশে প্যাপিরাসের স্ক্রল ও আকাশমণ্ডলীর মহাজাগতিক মডেল রাখা, অনন্য সোনায় বানানো সূর্য, চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহনক্ষত্রের যাত্রাপথ তুলে ধরেছে। মেঝে কয়েক পাল্লা রেশমী কাপড়ে ঢাকা।
সোজা স্ফটিক টেবিলের কাছে এসে বাটি থেকে এক গোছা আঙুর তুলে নিল ও। ডাইনীর আবাস থেকে যাবার পর আর কিছুই খায়নি ও। অথচ এখন কমবয়সী তরুণের মতো ক্ষুধার্ত হয়ে আছে। গামলার অর্ধেকটা ফল শেষ করে কাউচের পাশে দ্বিতীয় দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এটাও আরেকটা পরিচ্ছন্ন নকশার পর্দায় আড়াল করা। যেটা দিয়ে কামরায় ঢুকেছিল সেটারই অনুলিপি। ওটার পাশে কান পাতল ও, কিছুই শুনতে পেল না। পর্দার আড়াল ভেদ করে এবার অপেক্ষাকৃত। ছোট একটা কামরায় পা রাখল ও। এখানে দূরের দেয়ালের কাছে একটা টুল রাখা, দেয়ালের গায়ে একটা পিপহোল। ওটার কাছে গিয়ে ফোকর দিয়ে উঁকি দিল।
দেখতে পেল অলিগার্কদের সুপ্রিম কাউন্সিল চেম্বারের দিকে তাকিয়ে আছে। এটা একটা স্পাই হোল, পাহাড় থেকে এখানে কাউন্সিলের সভায় সভাপতিত্ব ও নির্দেশনার জন্যে এলে এটা দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করত সে। এই চেম্বারেই আকের, এক-তাঙ ও কায়থরের সাথে দেখা করেছিল তাইতা। এখন ওটা পরিত্যক্ত, আধোঅন্ধকার। পেছনের উঁচু জানালা রাতের আকাশের একটা চৌকো ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সেরাস নক্ষত্রপুঞ্জের একটা অংশ ধারণ করেছে ওটা। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। প্রাসাদ নীরব। ইয়োসের খাস কামরায় ফিরে বাকি ফলগুলো খেয়ে নিল। তারপর কাউচে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল, ঘুমে থাকার সময়ে নিজেকে বাঁচাতে চারপাশে আড়ালের একটা পর্দা তৈরি করে নিল, তারপর চোখ বন্ধ করতেই ঢলে পড়ল ঘুমে।
৮. সুপ্রিম কাউন্সিল
সুপ্রিম কাউন্সিল চেম্বার থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরের আওয়াজে জেগে উঠল ও। মাঝখানের দেয়ালে তা চাপা পড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ওর শ্রবণ শক্তি অনেক বেড়ে যাওয়ায় লর্ড আকেরের কণ্ঠস্বর পরিষ্কার শনাক্ত করতে পারল।
