ফোকর দিয়ে ভেতরে পা রাখল তাই। দুই পাশে দেয়ালের কুলঙ্গিতে একটা করে মশাল রাখা। ওগুলো জ্বালল। সেগুলো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে প্যাসেজ বরাবর নেমে চলল ও। এক ধরনের বিস্ময় বোধে অভিভূত ও, যার সাথে এর আগে পরিচয় ঘটেনি, এমনকি মিশরের মহান দেবদেবীদের পবিত্র অন্দরমহলেও না। প্যাসেজের শেষ মাথায় বাঁক ঘুরল ও, আরেকটা ছোট সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াল। শাদা বালির মসৃণ মেঝে দেখতে পেল নিচে।
মনে ভীতি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল ও, ভূগর্ভস্থ নদীর শুকনো তলদেশের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে আবিষ্কার করল। ওর জানা ছিল অচিরেই অন্ধকার সুড়ঙে আওয়াজ ও আলো প্রবল হয়ে উঠবে। জীবন নদীর জলকে ওর নিজের উপর দিয়ে বয়ে যেতে দিলে কী পরিণতি হবে?
অনন্ত কাল বেঁচে থাকা আশীর্বাদের চেয়ে বরং অভিশাপই হওয়ার কথা। সময়ের প্রথম কাল পেরিয়ে যাওয়ার পর পঙ্গু করে দেওয়া একঘেয়েমী ও স্থবিরতা দেখা দিতে পারে, যা থেকে নিস্তার পাওয়ার সুযোগ মিলবে না। সময়ের প্রবাহে কি নৈতিকতা ও বিবেক ক্ষয়ে যাবে? ইয়োস যাতে জড়িয়ে পড়েছিল সেভাবে কি নীতি ও সৌজন্যতা বিকৃত অশুভ ও দুষ্কর্মে প্রতিস্থাপিত হবে?
ওর স্নায়ু ভেঙে পড়ল। পালাবে বলে ঘুরে দাঁড়াল ও। কিন্তু আর দ্বিধা করল না। তীব্র নীল ভরে ফেলল সুড়ঙটা। চাইলেও এখন আর পালাতে পারবে না ও। সুড়ঙের দিকে মুখ করে দাঁড়াল ও। আগুয়ান বজ্রকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত করে নিল নিজেকে। ভূগর্ভস্থ নদীর মুখ থেকে এক ধরনের ঔজ্জ্বল্য বিস্ফোরিত হলো, যার আপাত কোনও উৎস আছে বলে মনে হলো না। কেবল ওর পায়ের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময়ই বুঝতে পারল ওটা বায়বীয় বা তরল কিছুই নয়। বাতাসের মতোই হালকা, কিন্তু একই সময়ে ঘন, ভারি। চামড়ার উপর বরফ শীতল অনুভূতি সৃষ্টি করছে, কিন্তু নিচের মাংসকে উষ্ণ করে তুলছে।
এটাই অনন্ত জীবনের আরক!
নিমেষে বানে পরিণত হলো তা, কোমর অবধি উঠে এলো। পানি হলে ওকে পৃথিবীর গভীরে টেনে নিয়ে যেত। কিন্তু এটা কমনীয় আলিঙ্গনে উপরে ঠেলে দিচ্ছে ওকে। বজ্রের ধ্বনি কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে, নীরব স্রোত কাঁধ পর্যন্ত উঠে এলো। নিজেকে ওজনহীন, মুক্ত মনে হলো ওর, যেন উড়ন্ত ফুল। শেষবারের মতো গভীর শ্বাস টানল ও। মাথার উপর দিয়ে ঢেউ বয়ে যাওয়ার সময় চোখ বন্ধ করে ফেলল। বন্ধ চোখের পাতার ভেতর দিয়েও নীল আভা দেখতে পাচ্ছে, বজ্রের ধনি কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে।
শরীরে নিচের অংশে নীলাভার চুঁইয়ে ঢুকে পড়া টের পাচ্ছে, ওর শরীর পরিপূর্ণ করে তুলছে। চোখ খুলল ও, ওগুলোকে ধুয়ে দিল তা। চেপে রাখা দম ছাড়ল ও, আবার শ্বাস টেনে নিল। বুঝতে পারল নীল আরক ওর নাকের ফুটো দিয়ে ফুসফুেসে চলে যাচ্ছে। এবার হাঁ করে নীল মুখে টেনে নিল। ফুসফুস থেকে রক্তের ধমনীতে নীল ঢুকে পড়ায় প্রবলভাবে স্পন্দিত হতে শুরু করল হৃৎপিণ্ড। শরীরের প্রতিটি অংশে বয়ে যেতে লাগল। হাত পায়ের আঙুলের ডগায় সুরসুরি তুলল। ওর ক্লান্তি ভেসে গেল, নিজেকে এতই শক্তিমান বোধ হলো যেমনটা কখনও বোধ করেছে বলে মনে পড়ে না। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছতায় ঝিলিক দিয়ে উঠছে ওর মন।
নীলাভা ওর ক্লান্ত প্রবীন শরীরকে উষ্ণ করে তুলছে, সুস্থ ও নবায়িত করছে। পায়ের ব্যথা চলে গেছে। পোড়া মাংস সেরে উঠছে, হাড় হয়ে উঠছে মজবুত। মেরুদণ্ড ঋজু হয়ে উঠেছে ওর, মাংস পেশি দৃঢ়; অনেক দিন আগে হারিয়ে ফেলা সেই তারুণ্যের বিস্ময় ও আশাবাদে আবার ভরে উঠেছে মন। কিন্তু সরলতা এখন ওর ভাণ্ডারে সঞ্চিত প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতায় শক্তিশালী হয়েছে।
তারপর ক্রমশঃ ঔজ্জ্বল্য ফিকে হতে শুরু করল। বজ্রের ধনি কমে গেল। সুড়ঙ বরাবর ছুটে যাবার আওয়াজ পেল। নীরব নদীর তলদেশে একাকী দাঁড়িয়ে রইল ও। নিজের দিকে তাকাল একবার। পা উঁচু করল। পায়ের থোড়ের মাংস ও পায়ের পাতার পোড়া জায়গাগুলো সেরে গেছে। ত্বক মসৃণ, খুঁতহীন। কঠিন, গর্বিত চঙে উঁচু হয়ে উঠেছে পায়ের পেশি। ছুটতে চাইছে ওর পাজোড়া। ঘুরে সিঁড়ি বয়ে গড়ানো পাথরের দরজার উদ্দেশে ছুটল ও। একেকবারে তিন চারটে করে কর্কশ পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল, একবারের জন্যেও পা হড়কে গেল না। চেম্বারের মুখে একপলকের জন্যে থামল ও। ব্র্যাকেট থেকে এক ঝটকায় মশাল তুলে নিয়ে শক্তির মন্ত্র পড়তে ঘুরে দাঁড়াল। ঘরঘর করে বন্ধ হয়ে গেল পাথরের দরজা। এবার অন্য তিনটা প্রতাঁকের পাশে আরেকটা প্রতীক খোদাই হয়ে থাকতে দেখল ও। আহত বাজপাখীর প্রতীক, ওর আত্মার প্রতীক। সরে এলো ও, খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল আবার। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় পেছনে ফন্টের চিরন্তন বজ্ৰধনি শুনতে পাচ্ছে; বুকের ভেতর দপদপ করছে পৃথিবীর হৃৎস্পন্দন।
বিশ্রামের জন্যে থামার কোনও প্রয়োজন বোধ করছে না ও। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ও হালকা, পাথরের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে ওর নগ্ন পা। উপরে উঠতে লাগল ও, সেই সাথে ফন্টের শব্দ মিলিয়ে যেতে লাগল, অবশেষে আর কোনও শব্দ কানে এলো না ওর। নামার চেয়ে ওঠা অনেক বেশি কম কষ্টকর মনে হচ্ছে। প্রত্যাশার আগেই সামনে ফুটন্ত ডেগচির আভা দেখতে পেল। আরও একবার ফুটন্ত লাভার হ্রদের দিকে তাকাল ও। পাথুরে চাতালের ফোকরের দূরত্বটুকু চোখের আন্দাজে বোঝার জন্যে ক্ষণিকের জন্যে থামল। এক সময়ের অমন ভয়ঙ্কর ও ভীতিকর জিনিসটাকে এখন কেমন যেন তুচ্ছ মনে হচ্ছে। ছয় কদম পিছিয়ে গেল ও, তারপর দ্রুত ছুটল সামনে। জ্বলন্ত মশালটা উঁচু করে ধরে মুখ থেকে লাফ দিল। ফোকারের উপর দিয়ে উড়ে চলল। ফাটলের ঠিক তিন কদম দূরে নিখুঁতভাবে নেমে এলো। এমনকি ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকটা দমকা হাওয়া ওকে আক্রমণ করলেও ভারসাম্য বজায় রইল, এতটুকু নড়ল না ও।
