একসাথে! এইবার! শক্তির বেড়ে ওঠা টের পেল ও। কিনারার উপর একটা হাত তুলে আনতে না পারা পর্যন্ত নিজেকে টেন তুলল। এক মুহূর্ত ঝুলে থেকে আবার ফের ফেনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।
আবার একসাথে, তাইতা। এবার!
উপরের দিকে উঠে অন্য হাতটাও তুলে দিল ও। ধরার মতো একটা জায়গা মিলল। দুই হাতের অবলম্বন পাওয়ায় সাহস ফিরে এলো। পোড়া পায়ের যন্ত্রণা ভুলে উপরে উঠে এলো, ওর শরীরের উধ্বাংশ কিনারার উপর এসে থপ করে পড়ল। পা ছুঁড়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে টেনে খোলা মুখের কাছে নিয়ে এলো নিজেকে। আবার উঠে বসার শক্তি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত স্রেফ পড়ে রইল। এবার পায়ের দিকে তাকাল, দেখল কোথায় পুড়েছে। পায়ের পাতায় লেগে থাকা লাভার টুকরোগুলো ধরে টানল, ওদের সাথে মাংসও উঠে এলো। পায়ের থোড়ের কাছে ফোস্কা পড়ে গেছে, ভেতরে স্বচ্ছ তরল ফুলে উঠছে। ব্যথায় অচল হয়ে পড়েছে ও, কিন্তু দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়াল ও। তারপর সুড়ঙ ধরে টলমল পায়ে এগিয়ে চলল। পায়ের পাতা একেবারে কাঁচা, পাথরের উপর রক্তাক্ত পায়ের ছাপ রেখে চলল ও। ওর পেছনের ফুটন্ত কাড়াইয়ের আলো পথ আলোকিত করে রেখেছে।
অল্প কিছুদূর সোজা এগিয়ে গেল সুড়ঙটা, তারপর ঢালু হয়ে গেল; ফলে লালচে আলো মিলিয়ে গেল। তারই শেষ আভায় দেয়ালের ফোকরে ঢোকানো আধপোড়া একটা মশাল দেখতে পেল। অনেক আগে ইয়োসের শেষ সফরের পর থেকেই এখানে আছে। ওটা জ্বালানোর কোনও উপায় নেই, ভাবল ও। তারপরই ডাইনীর কাছ থেকে পাওয়া শক্তির কথা ভাবল; হাত বাড়িয়ে দিল ওটার দিকে। তর্জনী দিয়ে পোড়া অংশটুকুর দিকে নির্দেশ করেছে, মনস্তাত্ত্বিক শক্তি স্থির করেছে ওটার উপর।
নেভা মশালের ডগায় একটা আভা দেখা দিল। ধোঁয়ার ক্ষীণ সর্পিল রেখা ফুটতে শুরু করল সেখানে। তারপর আচমকা দপ করে জ্বলে উঠল আগুন, উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে আগুন লাগল। ফাটল থেকে ওটা নামিয়ে উঁচু করে ধরে পোড়া পায়ে ল্যাঙচাতে ল্যাংচাতে যত দ্রুত সম্ভব আগে বাড়ল। আরেকটা ঢালু শূটের কিনারে এসে পৌঁছাল ও। এখানেও চলাচল হয়েছে, তবে পাথর তেমন ক্ষয়ে যায়নি, মিস্ত্রির বাটালির চিহ্ন এখনও টাটকা। ওটা ধরে নামতে শুরু করল ও, কিন্তু সিঁড়িগুলো অন্ত হীন মনে হচ্ছে; বিশ্রাম নিতে বারবার থামতে হলো ওকে। এমনি এক বিরতির সময় বাতাস ও যে পাথরের উপর বসেছিল তাতে এক ধরনের কাঁপন সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল ও। শব্দটা একটানা চলছে না, বরং ওঠানামা করছে; অনেকটা দানবীয় নাড়ীর স্পন্দনের মতো।
তাইতার জানা ছিল আওয়াজটা কীসের।
এবার সাগ্রহে উঠে দাঁড়াল ও। নামতে শুরু করল আবার। সামনে বাড়ার সাথে সাথে চড়া ও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল শব্দটা। ক্রমেই নিচে নেমে চলল তাইতা, শব্দটা ওর উত্তেজনা চাগিয়ে তুলতে লাগল। পায়ের যন্ত্রণাকে ম্লান করে দেওয়ার মতো প্রবল না হয়ে ওঠা পর্যন্ত এগিয়ে চলল ও। বিশাল নাড়ীর স্পন্দনের শব্দ সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছাল। থরথর কাঁপছে পাথরের দেয়াল। নিজেকে টেনে সামনে নিয়ে চলল ও, তারপর থমকে দাঁড়াল। হতবাক। ইয়োসের কাছ থেকে এখানকার স্মৃতি পেয়েছে ও, কিন্তু টানেলটা কানা গলিতে পরিণত হয়েছে। ধীর পায়ে, যন্ত্রণাকাতরভাবে সামনে বেড়ে দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়াল ও।
দেখে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক কর্কশ পাথর। কোনও ফোকর বা পথ নেই, কিন্তু ঠিক ওটার মাঝখানে ওর চোখ বরাবর তিনটা চিহ্ন খোদাই করা রয়েছে। প্রথমটা লাভা গামলার সালফারাস গ্যাসে ক্ষয়ে গেছে, বোঝা যাচ্ছে না; ওটার প্রাচীনত্ব বোঝার অতীত। দ্বিতীয়টা সামান্য টাটকা, বেশ ভালো করে পরখ করার পর ক্ষুদে পিরামিডের আউটলাইন দেখতে পেল, পুরোহিত বা কোনও পবিত্র পুরুষের আত্মার চিহ্ন। তৃতীয়টা সবচেয়ে নতুন, তবে তারপরেও অনেক শতাব্দী প্রাচীন। ওটা ইয়োসের আত্মার চিহ্ন বেড়ালের থাবার আউটলাইন।
খোদাইগুলো ওর আগে এখানে যারা এসেছিল তাদের আত্মার চিহ্ন। সময়ের সূচনা থেকে মাত্র তিনজন এখানে আসার পথ খুঁজে পেয়েছে। পাথরটা স্পর্শ করতেই ফেলে আসা নারকীয় জ্বালামুখ আর জ্বলন্ত লাভার বিপরীত শীতল ঠেকল।
এটাই সেই ফন্ট যার খোঁজে মানুষ যুগ-যুগ অনুসন্ধান চালিয়ে গেছে, গভীর শ্রদ্ধায় বিড়বিড় করে বলল ও। বেড়ালের থাবার প্রতাঁকের উপর হাত রাখল। ওর স্পর্শে উষ্ণ হয়ে উঠল ওটা। পৃথিবীর নাড়ীর স্পন্দনে একটু বিরতির অপেক্ষায় থাকল ও। তারপর ডাইনীর কাছে থেকে নেওয়া শক্তির তিনটা মন্ত্র উচ্চারণ করল। এটা তার গোপন মন্ত্র, আর কেউ যা জানে না।
তাশকালোন! আ্যাসকররা! সিলোনদেলা!
গুঙিয়ে উঠে ওর হাতে নিচে সরে যেতে শুরু করল পাথরটা। আরও জোরে চাপ দিল ও। পাথরের দেয়ালটা ধীর গতিতে একপাশে সরে যেতে শুরু করায় কর্কশ ঘর্ষণের শব্দ উঠল, যেন ঘানি চলছে। ওটার ওপাশে আরেকটা ছোট সিঁড়িঘর রয়েছে, তারপর সুড়ঙের একটা বাঁক থেকে আহত পশুর আর্তনাদের মতো একটা শব্দ আসছে। ওর চারপাশে আওয়াজ করে চলা পৃথিবীর নাড়ীর স্পন্দন এখন আর দরজার কারণে চাপা পড়েনি। নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার আগেই ওটার শক্তিতে পিছিয়ে যেতে হলো ওকে। সামনের সুড়ঙটা নীল আলোয় আলোকিত, নাড়ীর জোরাল স্পন্দনের সাথে সাথে প্রবল হয়ে উঠছে, তারপর শব্দ কমে এলে ক্ষীণ হচ্ছে।
