ওর দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিল সে। মরণ বাঁধনে ধরে ফেলল ওকে মেয়েটা। ওর আঙুলগুলো শীতল, হাড় সর্বস্ব, অস্থিব্যামোয় বাঁকা; শুষ্ক, কর্কশ ত্বক।
আমাকে সাহায্য করো, তাইতা, আর্তনাদ করে উঠল লস্ত্রিস। কিন্তু এখন ওর কণ্ঠস্বর নয় এটা, নিদারুণ বয়স্ক পুরুষের যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠস্বর। আমাকে বাগে পেয়ে গেছে সে!
মরণভীতিতে ওর হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে লস্ত্রিস। অস্বাভাবিক ঠেকছে ওর শক্তি-ওর আঙুল মুচড়ে দিচ্ছে, বেঁকে যাওয়া হাড়ের যন্ত্রণা টের পাচ্ছে ও, পেশি ভেঙে পড়ছে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল ও। ছেড়ে দাও! চিৎকার করে বলল। তুমি লসি নও। এখন আর তরুণ নেই ও। ওকে পূর্ণ করে তোলা এক মুহূর্ত আগের শক্তি উবে গেছে। বয়স ও হাতাশা গ্রাস করে নিল ওকে, আপন। স্বপ্নের বিস্ময়কর নকশা প্রকাশিত হতে দেখে ভীতিকর বাস্তবতার ভয়ঙ্কর ঝাপ্টায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে ও।
বিপুল ভারের নিচে তাঁবুর মেঝেয় নিজেকে আবিষ্কার করল ও। ভারের কারণে বুক বসে যাচ্ছে; শ্বাস নিতে পারছে না ও। এখনও ওর হাতজোড়া চেপে ধরে রেখেছে কেউ। ওর কানের খুব কাছেই তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ধ্বনি, এত কাছে, মনে হচ্ছে কানের পর্দা ফেটে যাবে বুঝি।
জোর করে চোখ মেলে তাকাল ও। ওর স্বপ্নের শেষ দৃশ্যটুকু মিলিয়ে গেল। ওর মুখের মাত্র কয়েক ইঞ্চি উপরে দেখা যাচ্ছে দিমিতারের মুখ। বলতে গেলে চেনাই যায় না; যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গেছে। ফোলা, পিঙ্গল। মুখটা হাঁ হয়ে গেল, হলদে জিভ বের হয়ে এলো। হাঁপানি ও মরিয়া ফোঁপানিতে মিলিয়ে যাচ্ছে ওর আর্তনাদ।
এখন ধাক্কা খেয়ে পুরোপুরি সজাগ তাইতা। তাঁবুর ভেতরটা সাপের গন্ধের মতো গন্ধে ভরা। বিশাল আঁশটে প্যাঁচে ঢেকে গেছেন দিমিতার, কেবল ওর মাথা আর একটা হাত মুক্ত রয়েছে। এখনও মুক্ত হাতে তাইতাকে আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি-অনেকটা ডুবন্ত মানুষের মতো। ওকে ঘিরে নিখুঁত সমান লুপ তৈরি করেছে প্যাঁচটা। পেশির নিয়মিত খিচুনিতে এঁটে বসছে। প্যাঁচ চেপে বসায় পরস্পরের সাথে ঘসা খাচ্ছে আঁশগুলো: দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে দিমিতারের নাজুক শরীর। সাপের ত্বকে সোনা, চকলেট আর লালচে বাদামী দারুণ নকশা করা। কিন্তু কেবল ওটার মাথা দেখেই ওদের হামলা চালানো প্রাণীটিকে চিনতে পারল তাইতা।
পাইথন, জোরে বলে উঠল ও। ওর দুহাতের মুঠি মেলালে যত বড় হবে তার দ্বিগুন সাপটার মাথার আকার। মুখ ব্যাদান করে রেখেছে ওটা, দিমিতারের হাড় সর্বস্ব কাঁধে বিধে আছে দাঁতগুলো। দাঁত কেলানো মুখের দু-কোণ থেকে চকচকে লালার ধারা গড়িয়ে নামছে-সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেওয়ার আগে শিকারকে এই তরলে ঢেকে নেয় সে। তাইতার দিকে চেয়ে থাকা ছোট গোল চোখজোড়া কালো, নিষ্করুণ। আরও একবার কুণ্ডলীটা চেপে বসল। মানুষ আর সাপের ভারের নিচে নিজেকে অসহায় মনে হলো তাইতার। দিমিতারের মুখের দিকে তাকাল ও, নীরবতায় আটকে গেছে বেচারার অন্তিম আর্তনাদ। এখন আর শ্বাস নিতে পারছেন না দিমিতার। কোটর থেকে ফেটে বের হয়ে আসার যোগাড় হয়েছে ওর ম্লান চোখজোড়া। নিদারুণ চাপে পাঁজরের একটা হাড় ভাঙার শুনল তাইতা।
কোনওমতে যথেষ্ট শক্তি এক করে চেঁচিয়ে উঠল তাইতা, মেরেন! জানে দিমিতার নেই বললেই চলে। ওর হাতের উপর মরণ মুঠি ঢিলে হয়ে এসেছে, নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ও। কিন্তু এখনও ফাঁদে আটকে আছে। দিমিতারকে বাঁচাতে একটা কিছু অস্ত্র দরকার। এখনও মনের পর্দায় লস্ত্রিসের ইমেজ ভাসছে ওর, গলার কাছে উড়ে এলো ওর হাত। চেইনে ঝোলানো একটা সোনালি তারা ঝুলছে ওখানে। লখ্রিসের তাবিজ।
আমাকে শক্তি দাও, প্রিয়া আমার, ফিসফিস করে বলল ও। ভারি ধাতব অলঙ্কারটা ওর হাতের তালুতে খাপে খাপে এঁটে বসল। ওটা দিয়ে পাইথনের মাথায় আঘাত হানল ও। একটা গোল চোখের দিকে তাক করেছিল, তীক্ষ্ণ ধাতব ডগাটা চোখ ঢেকে রাখা স্বচ্ছ আঁশ ভেদ করে গেল। হিংস্র, বিস্ফোরক শব্দে হিসহিস করে উঠল সাপটা। কুণ্ডলী পাকানো শরীরে খিঁচুনি উঠল, পাক খেল ওটা। কিন্তু দাঁতগুলো দিমিতারের কাঁধে বিধে রইল। এমনভাবে কোনাকুনি এঁটে বসেছে যে, শিকার গেলার সময়ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়। প্রকৃতিগতভাবেই সহজে ছেড়ে দেওয়ার নয়। চোয়াল আলগা করে নেওয়ার প্রয়াসে বেশ কয়েকটা সহিংস উদগীরণের ভঙ্গি করল পাইথনটা।
ফের আঘাত করল তাইতা। সাপের চোখের ঠিক মাঝখানে হাকাল ধাতব তীক্ষ্ণ ডগাটা, তারপর প্যাঁচাতে শুরু করল। দিমিতারকে ছেড়ে পাইথনের সর্পিল শরীর কুণ্ডলী শিথিল হয়ে এলো। প্রবল বেগে এপাশ ওপাশ মাথা দুলিয়ে এক সময় দিমিতারের শরীর থেকে দাঁত তুলে নিল ওটা। দুটো চোখই উপড়ে নেওয়া হয়েছে। ওদের উপর শীতল তেলতেলে রক্ত ছিটিয়ে সরে গেল সাপটা। বুকের উপর থেকে ভার সরে যেতেই ছোট করে শ্বাস টানল তাইতা। তারপর একপাশে সরিয়ে দিল দিমিতারের শিথিল শরীর, ওর চেহারা বরাবর আঘাত হানল ক্রুদ্ধ পাইথন। চট করে হাত ওঠাল ও, কব্জিতে দাঁত সেঁধিয়ে দিল সাপটা। কিন্তু তারা ধরে রাখা হাতটা এখনও মুক্ত। কব্জির হাড়ে তীক্ষ্ণ দাঁতের ঘর্ষণের অনুভূতি টের পাচ্ছে ও। কিন্তু ব্যথা নতুন করে শক্তি যোগাল ওকে। আহত চোখে ফের ডগাটা বসিয়ে দিল ও, এবার আরও গভীরে। খুলির ভেতর থেকে চোখটা বের করে আনল তাইতা, যন্ত্রণায় কুকড়ে গেল পাইথন। বিস্ফোরণ ঘটেছে যেন। আবার আক্রমণ করতে চোয়াল ছাড়িয়ে নিল ওটা। বর্ম পরানো মুঠির মতো যেন ওটার নাকের আঘাতগুলো। তাঁবুর মেঝেয় গাড়িয়ে বেড়াতে লাগল তাইতা। আঘাত এড়ানোর প্রয়াস পাচ্ছে। চিৎকার করে ডাকছে মেরেনকে। ওর বুকের চেয়েও চওড়া সাপটার দোলানো কুণ্ডলী ভরে রেখেছে গোটা তাঁবু।
