শেষে যেমনটা আশা করছিল, সুড়ঙের একটা বাঁকে পৌঁছাল তাইতা। মূল শূটটা সোজা নিচে নেমে গেছে, ছোট শাখাটা তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়েছে। দ্বিধা করল না তাইতা, সংকীর্ণতর ফোকরে পা রাখল। পা রাখার জায়গাটা রুক্ষ, কিন্তু প্রায় সমতল। বেশ কয়েকটা বাঁক হয়ে সুড়ঙ ধরে এগিয়ে চলল ও, শেষ পর্যন্ত আরেকটা গুহায় হাজির হলো। লালচে চুল্লীর মতো একটা আভায় আলোকিত। এমনকি ওঠানামা করতে থাকা আলো বিশাল জায়গাটার দূরতম প্রান্তে পৌঁছাতে পারছে না। পায়ের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল আরেকটা গভীর জ্বালামুখের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে ও। ওর অনেক নিচে ভীষণ লাভার হ্রদ উতড়াচ্ছে। উপরের তলটা ফুলে ফেঁপে উঠছে, টগবগ করছে; উপর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে গলন্ত পাথর ও স্ফুলিঙ্গ। তাপের ঝাপ্টা এত প্রবলভাবে এসে ধাক্কা দিল ওর মুখে যে ঠেকাতে হাত দিয়ে মুখ ঢাকতে হলো ওকে।
জ্বলন্ত লাভার অনেক উপর থেকে ঝড়ো হাওয়ার মতো বাতাস টেনে নিচ্ছে। হুহু গর্জন করে চলেছে, পোশাকে টান মারছে ওর, ঠেকাতে গিয়ে টলে উঠল ও। ওর সামনে টগবগ ফুটতে থাকা ডেগচির উপর একটা পাথরের টুকরো দেখতে পেল। ঠিক মাঝখানে ঝুলে গেছে, অনেকটা ঝুলন্ত দড়ির সেতুর মতো। এত সরু যে দুজন লোক পাশাপাশি যেতে পারবে না। গুহার ভেতরে গুমড়ে চলা হাওয়া স্থির নয়। এই দমকা হয়ে উঠছে, পরক্ষণেই আবার ফুঁসে উঠছে ভয়ঙ্করভাবে। কখনও কোনও আভাস ছাড়াই দিক বদল করছে। পেছনে টেনে নিচ্ছে ওকে। তারপরই ঠেলে দিচ্ছে সামনে। একাধিকবার ওকে টলিয়ে দিল, কিনারায় টলমল করতে হলো ওকে। ভারসাম্য ফিরে পেতে দুই হাত হাওয়া কলের মতো ঘোরাতে লাগল ও। শেষে জোর করে চার হাতপায়ে ভর দিতে বাধ্য করল ওকে। হামাগুড়ি দিয়ে এগোল ও। মাথার উপর শক্তিশালী হাওয়ার তোড় বয়ে যাবার সময় সেতুর সাথে মিশিয়ে দিল নিজেকে, আঁকড়ে থাকল। সারাক্ষণই নিচে টগবগ করে ফুটছে লাভা।
অবশেষে সামনে গুহার দূর প্রান্ত দেখতে পেল ও। আরেকটা খাড়া প্রাচীর। ওটার দিকে হামা দিয়ে এগিয়ে গেল ও, তারপর সভয়ে লক্ষ করল পাথুরে স্পরের শেষ অংশটুক ভেঙে নিচের ভয়ঙ্কর ডেগচিতে পড়ে গেছে। স্পারের শেষ মাথা আর গুহার অপর প্রান্তের দেয়ালের মাঝে বেশ খানেকটা ফারাক। দীর্ঘদেহী কোনও পুরুষের তিন কদম সমান হবে। প্রান্তে এসে ফোকরের উপর দিয়ে তাকাল ও। সামনের দেয়ালে একটা ছোট ফোকর রয়েছে।
ইয়োসের স্মৃতির কল্যাণে তাইতার জানা আছে, অনেক বছর এই পথে যায়নি সে। তার শেষ সফরের সময় চাতালটা অক্ষত ছিল। শেষ অংশটুকু নিশ্চয়ই সাম্প্রতিক কালে ভেঙেছে। এর কথা ইয়োসের জানা না থাকাতেই এই রকম একটা বাধার মুখে পড়তে তৈরি ছিল না ও।
অল্প খানিকটা পিছিয়ে এলো ও। হাঁটু গেড়ে বসে স্যান্ডেল খুলে ঝুড়ির হাতল আলগা করে কাঁধ থেকে কাঁধের উপর থেকে ফেলে দিল। ঝুড়ি আর স্যান্ডেল কিনারার উপর দিয়ে লাভার হ্রদের দিকে ধেয়ে গেল। জানে ওর আর ফিরে যাবার মতো শক্তি নেই, সুতরাং সামনেই যেতে হবে। চোখ বন্ধ করে শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়মিত করে নিয়ে, শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু একত্র করে সম্পূর্ণ মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির সাহায্যে বাড়িয়ে তুলল। তারপর প্রতিযোগিতার সূচনা বিন্দুতে এসে দাঁড়ানো ম্যারাথন দৌড়বিদের মতো উবু হয়ে গেল। চাতালের উপর দিয়ে বয়ে চলা ভীষণ বাতাসের একটা বিরতির অপেক্ষা করল ও, তারপর সংকীর্ণ পথ ধরে সামনে ঝুঁকে পড়ে এক দৌড়ে আগে বেড়ে লাফ দিল। মহাশূন্যে বের হয়ে এলো ও, এবং নিমেষে বুঝে ফেলল দূরত্বটুকু পার হতে পারবে না। নিচে ওর জন্যে অপেক্ষা করছে ফুটন্ত ডেগচি।
ঠিক তখনই ফের বিলাপ শুরু করল হাওয়া। দিক বদলে দ্বিগুন হয়ে গেছে ওটার হিংস্রতা। ওর ঠিক পেছন থেকে ধেয়ে এলো। টিউনিকের স্কার্টের নিচে ঢুকে ফুলিয়ে তুলল ওটা, সামনে ঠেলে দিল ওকে। তবে যথেষ্ট দূরে নয়। দেয়ালে বাড়ি খেল ওর শরীরের নিচের অংশ। কোনওমতে ফোকরের কিনারা আঁকড়ে ধরতে পারল ও। ওখানেই ঝুলে রইল, গহ্বরের উপর ঝুলছে ওর পা, গোটা দেহের শক্তি ছেড়ে দিয়েছে দুই হাতের উপর। একটা কনুই কিনারার উপরে ওঠাতে নিজেকে টেনে তোলার চেষ্টা করল ও।, কিন্তু অল্প একটু ওঠার পরেই আবার আগের জায়গায় নেমে আসতে হলো। পাগলের মতো বাতাসে নগ্ন পা ছুঁড়তে লাগল ও, ক্লিফের গায়ে পা রাখার মতো জায়গা খুঁজছে, কিন্তু পাথরের শরীর মসৃণ।
ওর নিচে লাভার হ্রদ থেকে গলন্ত লাভার একটা ফোয়ারা উঠে এলো। আবার নিচে নেমে যাবার আগে গলন্ত ম্যাগমার ছিটে লাগল পায়ের তালুতে। ব্যথা অসহনীয়। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল ও।
তাইতা! ওর ব্যথা টের পেয়েছে ফেন, ইথারে আহ্বান জানাল ওকে।
সাহায্য করো, ফুঁপিয়ে বলে উঠল ও।
আমি তোমার সাথে আছি, জবাব দিল ফেন। আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে-এইবার!
ব্যথাটা ছিল খোঁচার মতো। হাতের পেশি ছিঁড়ে যাবার মতো একটা বোধ না হওয়া পর্যন্ত উপরের দিকে উঠতে লাগল ও। আস্তে আস্তে যন্ত্রণাদায়কভাবে চোখজোড়া কিনারার সমান্তরালে না উঠে পর্যন্ত নিজেকে টেনে তুলল ও। কিন্তু এরপর আর উঠতে পারল না। বুঝতে পারল ওর হাতজোড়া আবার খসে পড়তে যাচ্ছে।
ফেন, বাঁচাও! আবার চিৎকার করে উঠল ও।
