মনে শক্তি রাখ, তাইতা। আমি তোমার সাথে আছি, ওকে জানাল ফেন।
পরের গিঁটটা খুঁজে পেল ওর পা। পিছলে হাত নামিয়ে আনল ও। আবার আঁকড়ে ধরল। গুনছিল ও, তাই জানে এখনও অন্তত বিশটা গিট পার হওয়া বাকি, তারপর দড়ির শেষ মাথায় পৌঁছতে পারবে।
এগোও, তাইতা! আমাদের দুজনের খাতিরেই এগোতে হবে তোমাকে! তুমি ছাড়া আমি কিছু না। তোমাকে টিকে থাকতেই হবে, তাগিদ দিল ফেন।
উষ্ণ, নাক্ষত্রিক তরঙ্গ তুলে শক্তির প্রত্যাবর্তন টের পেল ও। উনিশ…আঠার… রক্তাক্ত হাত গলে নেমে যাওয়ার সময় বাকি গিটগুলো গুনে চলল ও।
তোমার শক্তি ও ইচ্ছা আছে, ফিসিফিস করে ওর মনের ভেতর বলল ফেন। তোমার পাশে আছি আমি। আমাদের স্বার্থে কাজটা করো। তোমার জন্যে আমার ভালোবাসার স্বার্থে। তুমি আমার বাবা ও বন্ধু। কেবল তোমার জন্যেই আমি ফিরে এসেছি। এখন আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।
নয়…আট…সাত… গুনতে লাগল তাই।
শক্তিশালী হয়ে উঠছ তুমি, মৃদু কণ্ঠে বলল ফেন। আমি বুঝতে পারছি। আমরা একসাথে বের হয়ে আসব।
তিন…দুই…এক…, নিচের দিকে একটা পা লম্বা করে দিল ও। আঙুল দিয়ে দড়ির খোঁজ করছে। এখন ওর পায়ের নিচে শূন্যতা ছাড়া কিছু নেই। দড়ির শেষ মাথায় পৌঁছে গেছে ও। লম্বা করে শ্বাস নিয়ে দুই হাত ছেড়ে দিতেই এত জোরে নিচে পড়ল যে দম বেরিয়ে যাবার যোগাড় হলো। দু পা ছড়িয়ে পড়ায় নীড় থেকে পড়ে যাওয়া পাখির ছানার মতো টলে উঠল ও। উপুড় হয়ে পড়ে রইল। ক্লান্তি ও স্বস্তিতে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এমনকি উঠে বসার মতো শক্তিও নেই।
তুমি ঠিক আছে, তাইতা? এখনও আছো? আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?
শুনতে পাচ্ছি, উঠে বসার সময় জবাব দিল ও। আমি ঠিক আছি আপাতত। তুমি না থাকলে অন্য রকম হতো ব্যাপারটা। তোমার শক্তি আমাকে সাহস যুগিয়েছে। এখন আমাকে যেতে হবে। আমার ডাকের অপেক্ষায় থেকো। তোমাকে নিশ্চিতভাবেই আবার প্রয়োজন হবে।
মনে রেখ, তোমাকে আমি ভালোবাসি, বলে উঠল ফেন, তারপর মিলিয়ে গেল ওর উপস্থিতি। আরও একবার অন্ধকারে একা হয়ে গেল ও। ঝুড়ি হাতড়ে আগুনের হাঁড়িটা বের করে আনল। ফুঁ দিয়ে আগুন উস্কে নতুন করে মশাল জ্বালল। মশাল উঁচু করে ধরে ওটার আলোয় আশপাশের এলাকা পরখ করল।
বামে খাড়া দেয়াল বরাবর বানানো একটা সংকীর্ণ কাঠের ক্যাটওঅকে রয়েছে। ও, ব্রোঞ্জের বোল্ট দিয়ে দেয়ালের সাথে আটকানো। অন্য পাশে মুখ হাঁ করে আছে অন্ধকার শূন্যতা। মশালের দুর্বল আলো তার গভীরতা আঁচ করতে পারছে না। শুড়ি মেরে ক্যাটওঅকের কিনারে এসে নিচের দিকে উঁকি দিল ও। নিচে বিছিয়ে রয়েছে অন্তহীন অন্ধকার। বুঝতে পারল একটা বিশাল গহ্বরের উপর ঝুলে আছে ও, পৃথিবীর পেটের ভেতর চলে গেছে ওটা, ইয়োসের উত্থানের সেই অস্তিত্বহীন জায়গা।
আরেকটু সময় বিশ্রাম নিল ও। পিপাসা চড়ে উঠেছে, কিন্তু গলায় ঢালার মতো কিছুই নেই। মনের শক্তি দিয়ে পিপাসার গলা টিপে মারল ও, হাত পায়ের ক্লান্তি দূর করল। ঝুড়ি থেকে স্যান্ডেল বের করে পায়ে বেঁধে নিল। দড়ির ঘায়ে ক্ষত হয়ে গেছে। অবশেষে উঠে ক্যাটওঅক ধরে কোনওমতে আগে বাড়ল। ওর বাম পাশের গহ্বরের সাথে কোনও রকম বাধা নেই। ওখানকার অন্ধকার সম্মোহনী শক্তিতে টানছে ওকে, ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ধীরে সাবধানে এগিয়ে চলল ও, বুঝেশুনে একের পর এক পা ফেলছে।
মনের চোখে ইয়োস কীভাবে এই ক্যাটওয়াক ধরে হালকা পায়ে দৌড়ে যেত সেই দৃশ্য দেখল, ঠিক ছোট বাচ্চা যেভাবে উন্মুক্ত মাঠে ছুটে বেড়ায়; কীভাবে শক্তিশালী শাদা দাঁতের ফাঁকে জ্বলন্ত মশাল ধরে গিঁট লাগানো দড়ি বেয়ে অনেক উঁচুতে নিজের আবাসে উঠে যেত। তাই জানে, তার বিপরীতে পায়ের নিচের এই মসৃণ মেঝে বরাবর আগে বাড়ার মতো সামান্য শক্তিই রাখে ও।
ওর পায়ের নিচে কাঠের তক্তা কর্কশভাবে ভাঙা পাথরে পরিণত হলো। পাহাড়ের একটা চাতালে এসে পৌঁছেছে ও। পা রাখার মতো সামান্য চওড়া। তীক্ষ্ণভাবে ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে; ভারসাম্য বজায় রাখতে দেয়াল আঁকড়ে থাকতে হলো ওকে।
চাতালটা যেন অন্তহীন, আতঙ্ক দূর করতে ওর সমস্ত মানসিক শক্তি এক করতে হলো। চাতাল ধরে বেশ কয়েক শো কিউবিট নামার পর অবশেষে একটা গভীর ফাটলে পৌঁছাল ও। ওটা দিয়ে আরেকটা সুড়ঙে পা রাখল। এখানে আবার বিশ্রাম নিতে বাধ্য হলো। পাথরের গায়ে কুঁদা একটা ফোকরে মশালটা আটকে রাখল। অগুনতি মশালের আঁচে মাথার উপরের পাথর কালো হয়ে গেছে। দুহাতে মুখ ঢেকে চোখ বন্ধ করল ও। লম্বা করে শ্বাস টেনে হৃপিণ্ডের স্পন্দন ধীর করে আনল। মশালটা নিভে যাবার আগে ধোয়া উগড়ে পটপট শব্দ করছে। নিভন্ত আগুন দিয়ে শেষ মশালটা জ্বালল ও। তারপর আবার সড়ঙ ধরে নামতে শুরু করল। এইমাত্র ছেড়ে আসা উন্মুক্ত চাতালেরও চেয়েও ঢের বেশি ঢালু। শেষে একটা পাথুরে সিঁড়িঘরে পরিণত হলো ওটা, সাপের মতো এঁকেবেঁকে নিচে নেমে গেছে। শত শত বছর ধরে ইয়োসের পায়ের ঘায়ে মসৃণ, অবতল হয়ে গেছে।
তাইতার জানা ছিল পাহাড়ের ভেতরটা প্রাচীন আগ্নেয়গিরি ও ফাটলের একটা মৌচাকের মতো। পাথর এত উত্তপ্ত, স্পর্শ করা যায় না। একেবারে কেন্দ্রের বুদ্বুদ থেকে তৈরি তাপে উত্তপ্ত। বাতাসে সালফারের গন্ধ, কয়লার চুল্লী থেকে আসা ধোয়ার মতো দম বন্ধ করে দিতে চাইছে।
