ইয়োস ও চকচকে মালাকাইটের দেয়ালের মাঝখানে ওর পিছলে যাবার মতো সামান্য জায়গা ছিল, চেম্বারের শেষ মাথায় পৌঁছুল ও। এখানে, আগেই যেমন জানা ছিল, একটা গোপন দরজা পেল ও। ওটাকে আয়নার মতো দেয়ালে এমন চতুরতার সাথে খোদাই করা হয়েছে যে প্রতিফলনে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। কেবল নিরেট সবুজ পাথরের মতো দেখতে জিনিসটা স্পর্শ করার পরেই পথটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ওর ঢোকার মতো যথেষ্ট প্রশস্ত ওটা।
ওপাশে একটা সংকীর্ণ প্যাসেজে আবিষ্কার করল নিজেকে। আগে বাড়ার সাথে সাথে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে শুরু করল আলো। সামনে হাত মেলে দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে এগোল ও, অবশেষে প্যাসেজটা যেখানে ডানে বাঁক নিয়েছে সেখানে পৌঁছাল। অন্ধকারে উপরে হাত বাড়িয়ে একটা পাথরের তাক পেল। হাতের পিঠে মাটির চুলোর উষ্ণতার ছোঁয়া পেল। পাতিলের দড়ির হাতলের কাছে নিয়ে গেল ওটা। হাঁড়িটা নামিয়ে আনল ও। তলায় ক্ষীণ আভা দেখা যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ফুঁ দিয়ে আবার শিখায় পরিণত করল ওটাকে। তার আলোয় আগাছায় বানানো মশালের একটা তূপ দেখতে পেল। একটা মশাল জ্বালল ও। পাথরের তাকে রাখা ঝুড়িতে দুটো বাড়তি মশাল দিয়ে মাটির হাঁড়িটা বসাল ও। তারপর ফের সংকীর্ণ টানেল ধরে আগে বাড়ল।
খাড়া কোণে নিচে নেমে গেছে সুড়ঙটা। ডান দিকের দেয়াল বরাবর ঝোলানো দড়ি ধরে ভারসাম্য বজায় রাখল ও। অবশেষে একটা ছোট কামরায় শেষ হলো সুড়ঙটা। এত নিচু ছাদ, ওটার নিচে প্রায় উবু হয়ে থাকতে হলো ওকে। মেঝের ঠিক মাঝখানে একটা গাঢ় মুখ দেখতে পেল ও, মনে হচ্ছে কুয়োর মুখ। ওটার উপর মশাল ধরে নিচে উঁকি দিল। অন্ধকার গ্রাস করে নিল দুর্বল আলো।
মেঝে থেকে একটা ভাঙা মাটির পাত্র তুলে গর্তে ফেলে দিল তাইতা। ওটা তলায় পৌঁছানোর অপেক্ষা করার সময় মনে মনে গুনতে লাগল। পঞ্চাশ গোনার পরও ওটার নিচের পাথর স্পর্শ করার কোনও আওয়াজ মিলল না। গহ্বরটা তলাহীন। ঠিক ওর সামনেই একটা মজবুত ব্রোঞ্জের হুক গুহার ছাদে গাঁথা রয়েছে। চামড়ার বেণী পাকানো একটা রশি ওটা থেকে নেমে গেছে গহ্বরে। ওর মাথার উপরের ছাদ ধোয়ায় কালো। এই গুহায় অসংখ্যবার আসা যাওয়া করার সময় মাথার উপর মশাল ধরে রেখেছিল ইয়োস, তারই ধোয়ায় এমন হয়েছে। মশাল দাঁতে চেপে ধরে দড়ি বেয়ে কুয়োয় ওঠানামা করার মতো শক্তি ও নৈপূণ্য ছিল তার।
স্যান্ডেল খুলে ঝুড়িতে রেখে দিল তাইতা। তারপর মশালটা পাশের দেয়ালের একটা ফোকরে গেঁথে দিল যাতে নিচে নামার সময় ওটা থেকে সামান্য হলেও আলো মেলে। ঝুড়ির হাতলটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাত বাড়াল দড়ির দিকে, গহ্বরের উপরে উঠে পড়ল। সবিরতিতে দড়ির উপর গিঁট দেওয়া রয়েছে। হাত ও নগ্ন পায়ের পক্ষে নাজুক এক ধরনের অবলম্বনের কাজ দিল ওগুলো। আগে পা তারপর হাত চালিয়ে দেয়াল বেয়ে নামতে লাগল ও। জানে এই অবতরণ কত দীর্ঘ ও কষ্টসাপেক্ষ হতে পারে। সাবধানে অগ্রসর হচ্ছে, বিশ্রাম নিতে ও গভীরভাবে শ্বাস নিতে নিয়মিত থামছে।
বেশি সময় পেরুনোর আগেই ওর শরীরের পেশি কাঁপতে শুরু করল, দুর্বল হয়ে এলো হাত-পা। নিজেকে আগে বাড়তে বাধ্য করল ও। মাথার উপরের চেম্বারে রেখে আসা মশালের আলো এখন স্রেফ একটা ঝলকে পরিণত হয়েছে। অন্ধকারে ক্রমেই নেমে চলল ও, কিন্তু ইয়োসের স্মৃতি থেকে পথ চেনা আছে ওর। ওর ডান পায়ের থোড়ের মাংসে ঝিঁঝি ধরে গেল, ব্যথা করছে। পঙ্গু করে দিতে চাইছে। কিন্তু মনকে ওটা থেকে সরিয়ে রাখল ও। ওর হাত এখন অসাড় থাবা। বুঝতে পারছে পেরেকে লেগে একটা হাত ছড়ে গেছে, কারণ ওর উপরে কাত করে রাখা মুখে রক্তের ফোঁটা পড়ছে। জোর করে দড়ির উপর হাত খুলছে, বন্ধ করছে ও।
নামছে তো নামছেই; অবশেষে বুঝতে পারল আর নামতে পারবে না। অন্ধকারে নিথর ঝুলে রইল ও। ঘামে ভিজে একসা, দোলায়মান দড়ির উপর আবার মুঠি বদলাতে অক্ষম। অন্ধকার ওর শ্বাস রুদ্ধ করে দিচ্ছে। রক্তে পিচ্ছিল হয়ে গেছে হাত, আঙুল খুলে যেতে শুরু করায় পিছলে যেতে চাইছে।
মেনসার! শক্তির শব্দ ফুটিয়ে তুলল ও। কিদাশ! নিউবে! অমনি স্থির হয়ে গেল ওর পা, দৃঢ় হলো হাতের মুঠি। কিন্তু তারপরেও পরের গিঁটের দিকে এগিয়ে যেতে নিজের শরীরকে বাধ্য করতে পারল না ও।
তাইতা! প্রিয় তাইতা আমার! জবাব দাও! ফেনের কণ্ঠস্বর এত স্পষ্ট, মিষ্টি মনে হলো অন্ধকারে ওর পাশেই ঝুলছে ও। ওর আত্মার প্রতীক শাপলার জটিল রেখা ফুটে উঠল। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে লাগল। আবার ওর পাশে এসে পড়েছে ও। এমন জায়গায় এসে গেছে ও যেখানে দুর্বল ডাইনী শক্তিও ওদের নাক্ষত্রিক যোগাযোগে বাদ সাধতে পারবে না।
ফেন! ইথারে মরিয়া আহ্বান পাঠাল ও।
ওহ, দয়াময় মাতা আইসিসকে ধন্যবাদ। পাল্টা আহ্বান জানাল ফেন। অনেক দেরি হয়ে গেছে ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম কঠিন অবস্থায় পড়েছ তুমি। যেমন শিখিয়েছ, তোমার শক্তির সাথে আমার সমস্ত শক্তি মেলাচ্ছি আমি।
কম্পিত পাজোড়া অটল, কঠিন হয়ে আছে, টের পেল ও। গিঁটের উপর থেকে পা সরিয়ে নিল ও, হাতের উপর ঝুলে থেকে পায়ের আঙুল নিচে নামাল। নিচের শূন্যতা টেনে নিতে চাইল ওকে, দড়ির উপর পাক খেতে লাগল ও।
