বাতাস পরিষ্কার, ঠাণ্ডা। স্বস্তির সাথে গভীরভাবে শ্বাস টানল ও। কালো পুকুরের পাশে তাঁবুর দিকে এগোনোর সময় ফুসফুস থেকে ইয়োসের বদ গন্ধ ধুয়ে মুছে ফেলল। একটা বেঞ্চিতে বসল ও, এখানেই যখন সে তরুণী ও সুন্দরী ছিল তখন তার সাথে বসত ও। কাঁধের উপর চামড়ার জোব্বা টেনে নিল ও। ভেবেছিল ওই বিপদের মোকাবিলার পর নিজেকে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত আবিষ্কার করবে, অথচ উচ্ছ্বাস পরিপূর্ণ করে রেখেছে ওর সত্তা। নিজেকে শক্তিশালী, অপরাজেয় লাগছে।
ডাইনীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া শক্তি ও ক্ষমতার কারণে বদলে গেছে বোঝার আগ পর্যন্ত প্রথমে ব্যাপারটা বিস্মিত করল ওকে। এখন ওকে পূর্ণ করে রাখা পাহাড়সম জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সুলুক সন্ধান করতে গিয়ে বিশাল ও প্রসারিত হয়ে উঠল ওর মন। সেই সময়ের সূচনা পর্যন্ত ইয়োসের অস্তিত্বের সবগুলো সহস্রাব্দের দিকে নজর দিতে পারছে। প্রতিটি বিষয় একদম তরতাজা। তার কামনা ও ইচ্ছার তল খুঁজে পাচ্ছে, যেন এসবই ওর নিজস্ব। ইয়োসের নিষ্ঠুরতা ও নৈতিক স্থলনের গভীরতা দেখে হতবাক হয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণ মিথ্যা ও অমঙ্গলের আসল রূপ উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃতি বুঝে উঠতে পারেনি। তার কাছ থেকে এত কিছু শেখার ছিল যে, জানত এর অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ পরীক্ষা করতেই গোটা আয়ু লেগে যেত।
জ্ঞানটা এক ধরনের ভয়ঙ্কর ও ঘৃণিত মায়াজালে আচ্ছন্ন করে রাখার মতো। নিমেষে ও বুঝে গেল এর ঘোর লাগানো মুগ্ধতা থেকে নিজেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে এটা তাকে নষ্ট করতে না পারে। এমন অশুভ হাতের নাগালে এসে পড়ায় ওর নিজেরই ইয়োসের মতো দানবে পরিণত হওয়ার সমূহ ঝুঁকি রয়েছে। ডাইনীর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জ্ঞান ওর নিজের জ্ঞানের সাথে মিলে ওকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিতে পরিণত করেছে, এই ভাবনা বিনয়ী করে তুলল ওকে।
নিজের সব শক্তি এক করে স্মৃতিব গভীর কন্দরে জমে থাকা সমস্ত অশ্লীল বিষয় দূরে ঠেলে দিতে শুরু করল ও। যাতে সেগুলো ওকে তাড়া করে ফিরতে না পারে বা হামলা না করে, কিন্তু প্রয়োজনে এর যেকোনও অংশই আবার ফিরে পায়।
অশুভের পাশপাশি এখন ওর আয়ত্তে রয়েছে সমান বা বেশি পরিমাণ বিদ্যার সামগ্রিক আধার, যা হয়তো মানুষ ও মানবজাতির পক্ষে সীমাহীনভাবে উপকারী হতে পারে। ডাইনীর কাছ থেকে মহাসাগর, পৃথিবী ও স্বর্গের স্বাভাবিক রহেস্যর চাবিকাঠি ছিনিয়ে নিয়েছে ও, পেয়েছে জীবন, মৃত্যু, ধ্বংস ও পুনরুজ্জীবনের রহস্য; এর সবই মনের একেবারে সামনের দিকে জমা রাখল ও, যেখানে খোঁজ করতে পারবে, ঝালিয়ে নিতে পারবে।
সব কিছু মনের ভেতর নতুন করে সাজাতে সাজাতে সূর্য পাটে বসল, রাত পার হলো। তারপরই কেবল নিজের জৈবিক চাহিদা সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠল ও বেশ কয়েক দিন ধরে মুখে কিছু দেয়নি ও, পান করলেও তৃষ্ণার্তই রয়ে গেছে। এখন ডাইনীর আস্তানার অন্ধিসন্ধি চেনা হয়ে গেছে ওর, যেন এখানে তার মতোই অনেক দিন ধরে ছিল। জ্বালামুখ ছেড়ে পাথুরে বসতিতে ফিরে নির্ভুলভাবে গুদাম ঘর, ভাঁড়ারঘর আর রান্নাঘর খুঁজে বের করল, যেখানে ট্রগরা ইয়োসের সেবা করেছে। সেরা ফল ও পনির খেল ও, এক কাপ মদ গিলল। তারপর তরতাজা হয়ে ফিরে এলো তাঁবুতে; এখন ওর সবচেয়ে বড় কাজ হলো ফেনের সাথে যোগাযোগ করা।
নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে প্রথমবারের মতো ইথারে আহ্বান পাঠাল, পরিষ্কার, উন্মুক্ত কণ্ঠে ডাকল ওকে। অমনি বুঝতে পারল ডাইনীর ক্ষমতাকে খাট করে দেখেছিল ও। ফেনের কাছে পৌঁছানোর ওর প্রয়াস ডাইনীর অবশিষ্ট রয়ে যাওয়া কোনও শক্তির কারণে আবার ওর কাছে ফিরে আসছে। এমনকি তার বেহাল অবস্থায়ও নিজের ও তার চালাদের চারপাশে একটা প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে তুলতে পারছে সে। চেষ্টাটা বাদ দিল ও, পাহাড় থেকে পালানোর একটা উপায় খুঁজতে শুরু করল। ইয়োসের স্মৃতি হাতড়ে এমন কিছু আবিষ্কার করল যা ওকে টলিয়ে দিল, বিশ্বাসের সর্বশেষ সীমায় পৌঁছে দিল ওকে।
আবার তাবু ছেড়ে গেল ও, ইয়োসের সবুজ পাথুরে চেম্বারের দিকে চলে যাওয়া পাথুরে সুড়ঙে চলে এলো। নিমেষে পচনের গন্ধ এসে ঘা দিল নাকে। আর কিছু না হোক, আগের চেয়ে আরও প্রবল হয়ে উঠেছে সেটা। আরও বিরক্তিকর। টিউনিকের হেম দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখল। বমির বেগ দমন করল। এখন প্রায় পুরো গুহাটা ভরে ফেলেছে ইয়োসের শরীর। ওটার নিজস্ব পচা গ্যাসে ফুলে উঠেছে। তাইতা লক্ষ করল এখন মানুষ থেকে কীটে পরিণত হওয়ার একটা পর্যায়ে রয়েছে সে। তার শরীরের বিভিন্ন ছিদ্র থেকে বেরিয়ে আসা তরল শরীর আবৃত করে এখন চকচকে খোলে পরিণত হতে চলেছে; নিজেকে একটা মুটকীটে ঘিরে ফেলছে সে। কেবল মাথাটাই এখনও দেখা যাচ্ছে। চুলের অবশেষ এখন সবুজ মেঝেয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চোখ বন্ধ। তার কর্কশ শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ হাওয়াকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এক গভীর শীত নিদ্রায় নিজেকে ছুঁড়ে দিচ্ছে সে। জীবনের এক স্থগিতাবস্থা, অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত যা চলতে পারে।
যেমন অসহায় পড়ে আছে সেভাবেই তাকে শেষ করে দেওয়ার কোনও উপায়। আছে? ভাবল ও। কাজটা করার উপায়ের খোঁজে সদ্য প্রাপ্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার হাতড়াল। নেই, সিদ্ধান্তে পৌঁছল ও। অমর নয় সে, কিন্তু আগ্নেয়গিরি অগ্নিশিখায় সৃষ্টি করা হয়েছে তাকে, কেবল ওই আগুনেই সে ধ্বংস হতে পারে। মুখে ও বলল, শুভেচ্ছা ও বিদায়, ইয়োস! দশ হাজার বছর ঘুমিয়ে থাকো যেন, যাতে দুনিয়াটা অল্প সময়ের জন্যে হলেও তোমার কাছ থেকে রক্ষা পেতে পারে। উবু হয়ে তার এক গাছি চুল তুলে নিল ও। পেঁচিয়ে পুরু একটা বেণীতে পরিণত করে যত্নের সাথে বেল্টের পাউচে ভরে রাখল।
