ওর নিচে লুটিয়ে পড়ল সে। গোঙাচ্ছে, বিড়বিড় করছে। মুখ দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরল তাইতা, গলার গভীরে জিভ ঢুকিয়ে, স্তব্ধ করে দিল আর্তচিৎকার। তার সত্তার অন্তস্থঃ জগৎ তছনছ করে দিল ও, ভাণ্ডার বিচ্ছিন্ন করে ফেলল, যেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছে তার সমস্ত জ্ঞান আর শক্তি। প্রবাহ টেনে নিতে লাগল ও। এ কাজ করার সময় নিজস্ব শক্তি বানের মতো ফিরে এলো। যতখানি সে কেড়ে নিয়েছিল তার শতগুন বেশি হয়ে।
বর্ণনাতীত কমনীয় চেহারা, অসাধারণ চোখের দিকে তাকাল ও, বদলে যেতে দেখল ওগুলো। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। লালার রূপালি ধারা গড়াচ্ছে। চোখজোড়া ম্লান হয়ে আসছে। নুড়ি পাথরের মতো ফ্যকাশে। আগুনের খুব কাছে ধরে রাখা মোমবাতির মতো নাকটা চওড়া কর্কশ হয়ে গেছে। উজ্জ্বল ত্বক এখন ম্লান হলদে রং পেয়েছে, সরীসৃপের আঁশঅলা ত্বকের মতো কর্কশ, শুষ্ক। ঠোঁট আর চোখের কোণে গভীর খাঁজ সৃষ্টি হয়েছে। চুলের সজীব কোঁকড়া ভাব চলে গিয়ে সোজা হয়ে গেছে, চাঁদিতে শুকনো ত্বক দেখা যাচ্ছে।
ধসে পড়া বাঁধের পানির মতো ইয়োসের কাছ থেকে প্রবাহিত হতে থাকা নাক্ষত্রিক ও মনস্তাত্ত্বিক সার বস্তুর ধারা টেনে নিচ্ছে। এত বিপুল সেই পরিমাণ যে ঘন্টার পর ঘণ্টা অব্যাহত রইল প্লাবন। ছাদের ফোকার দিয়ে ঢুকে পড়া রোদ মালাকাইটের মেঝে পেরিয়ে মধ্য দুপুরের রেখায় পৌঁছালে তাইতা বুঝতে পারল প্রবাহ দুর্বল ও ক্ষীণ হয়ে আসতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি শেষ হলো তা। সবই শুষে নিয়েছে ও। ইয়োস নিঃশেষ, শূন্য হয়ে গেছে।
খোলা মুখে শব্দ করে শ্বাস ফেলছে সে। তার শরীর ফুলে উঠতে শুরু করায় চোখজোড়া চেম্বারের ছাদের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির হয়ে রয়েছে। রোদে ফেলে রাখা লাশের মতো যেন পচা গ্যাসে ভরে উঠছে এমনভাবে কেঁপে উঠতে শুরু করল তার দেহ। সরু হাত-পা ফুলে ঢোল হয়ে গেল। শরীরের মাংস মাখনের ব্লাডারের মতো নরম আকারহীন হয়ে ফুলে উঠেছে। পেস্টের মতো শাদা ভাঁজের আড়ালে তার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত তার মাংস ফুলে ফেঁপে উঠতে দেখল তাইতা। কেবল মাথাটাই শরীরের বাকি অংশের তুলনায় ছোট রয়ে গেল।
ধীরে ধীরে চেম্বারের অর্ধেকটা দখল করে নিল তার ফোলা শরীর। কেঁপে ওঠার জায়গা করে দিতে লাফ দিয়ে কাউচ থেকে উঠে দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল তাইতা। এখন টিপির কেন্দ্রে শুয়ে থাকা রানি উইপোকার মতো লাগছে। তাকে। এই গুহা থেকে আর কোনও দিন পালাতে পারবে না সে। এমনকি ট্রগরা ওকে উদ্ধার করতে ফিরে এলেও না, ওকে কোনওদিন সংকীর্ণ পাথুরে প্যাসেজ দিয়ে ভোলা বাতাসে বের করতে পারবে না তারা।
একটা ভীতিকর দুর্গন্ধ গুহা ভরে তুলেছে। ইয়োসের ত্বকের বিভিন্ন ছিদ্র থেকে বের হয়ে শব বেয়ে নামছে পুরু তেলতেলে তরল। ফোঁটাগুলো ফিকে সবুজ, তাতে পচনের আভাস। বমি জাগানো গন্ধ তাইতার শ্বাস বন্ধ করে দেওয়ার যোগাড় করল, ফুসুফুস জ্বালিয়ে দিল। পচা লাশের গন্ধ। তার খুনে ক্ষিধের শিকার, জঠর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া জন্ম-না-নেওয়া শিশু ও ওদের পেটে ধরা অল্প বয়সী মা; বিভিন্ন জাতির উপর চাপিয়ে দেওয়া দুর্ভিক্ষ, খরা ও প্লেগে প্রাণ হারানো লাশ, তার উস্কে দেওয়া ও নেতৃত্বে সংঘটিত যুদ্ধে প্রাণ হারানো যোদ্ধা; ফাঁসিকাঠ বা চিতায় যাদের মেরেছে সে; খনি ও গহ্বরে প্রাণ হারানো দাসদের লাশের গন্ধ। এক বিশাল অশুভের গন্ধে আরও জোরাল হয়ে উঠেছে যা, তার মুখ থেকে বের হয়ে আসা প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে বের হয়েছে। এমনকি ইন্দ্রিয়ের উপর তাইতার নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত এই পরিবেশে টলে উঠল। গুহার সীমিত জায়গায় যতটা সম্ভব তার কাছ থেকে দূরে সরে দেয়াল ঘেঁষে সুড়ঙের মুখের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ও।
এক অশুভ শব্দ থমকে দিল ওকে। যেন দানবীয় সজারু সতর্ক করতে কাঁটা ঝাঁকি দিচ্ছে। ইয়োসের ভৌতিক মাথা ওর দিকে গড়ান খেল, ওর মুখের উপর স্থির হলো তার চোখ। চেহারা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ায় সৌন্দর্যের কোনও চিহ্নই আর নেই। চোখজোড়া গভীর, অন্ধকার গহ্বরে পরিণত হয়েছে। ঠোঁটজোড়া সরে গিয়ে খুলির দাঁতের মতো দাঁত বের হয়ে পড়েছে। অনির্বচনীয় কুৎসিত তার চেহারা, জটিল আত্মার আসল রূপ। কর্কশ, ফাসফেঁসে কণ্ঠে কাকের মতো কথা বলে উঠল সে। আমি বেঁচে উঠব, বলল সে।
তার নিঃশ্বাসের কটু গন্ধে চমকে পিছিয়ে এলো ও। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ইয়োসের চোখে চোখে তাকাল। মিথ্যা সব সময়ই টিকে থাকবে, তেমনি সত্যিও। এই যুদ্ধের কখনও শেষ হবে না, জবাব দিল ও।
চোখ বন্ধ করল ইয়োস, আর কথা বলল না। কেবল তার নিঃশ্বাসের শব্দ গলায় ঘরঘর আওয়াজ করে চলল।
*
জোব্বা খুঁজে নিয়ে সবুজ চেম্বার হয়ে বাইরের হাওয়া-বাতাসে খোলা প্যাসজে চলে এলো তাইতা। ইয়োসের গোপন উদ্যানে এলো যখন, তখন সূর্যের আলো ক্লিফের চূড়া স্পর্শ করছে, কিন্তু জ্বালামুখের গভীর ছায়ায় ফেলে রেখেছে। ইয়োসের কোনও ট্রগের ছায়া দেখা যায় কিনা দেখতে সাবধানে ইতিউতি তাকাল ও। ওদের আভা খুঁজছে, কিন্তু নেই। এটা ওর জানা ছিল, ইয়োসের ধ্বংসের সাথে সাথে তারা পথ চলার বুদ্ধি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এখন দিশাহারা হয়ে মরার জন্যে পাহাড়ের সুড়ঙ ও প্যাসেজে ঢুকে পড়েছে।
