ওর সৌরভ কখনও বদলায় নাঃ সব সময়ই সূর্য শাপলার সুবাস। অবশ্য, সকাল-সন্ধ্যায় পোশাক পাল্টায় ও। সব সময়ই লম্বা ও বিশাল; সূক্ষ্ম কাপড়ের নিচে ওর শরীরের উত্থানপতন ও বাঁকগুলোর কোনও আভাসই মেলে না প্রায়। অনেক সময় প্রশান্ত ভাঙ্গিতে থাকে সে, অন্যান্য সময় অস্থির; আবার মানুষখেকো বাঘিনীর মতো জাঁকাল ঢঙে তাইতার কাউচের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। একবার ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে জ্ঞানগম্ভীর আলোচনা চালু রেখেই টিউনিকের নিচে হাত গলিয়ে উরুর দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল, তারপর সরিয়ে নিয়েছে। অন্যান্য সময় কালো আলখেল্লায় ফিরে গিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রাখে, এমনকি ওর গোড়ালি পর্যন্ত দেখতে দেয় না।
একদিন সকালে সবুজ কামরায় বসেছিল ওরা, ইয়োসের পরনে ছিল শাদা সিল্কের সূক্ষ্ম আলখেল্লা। এর আগে আর কখনও শাদা পোশাক পরেনি সে। কথোপকথনের মধ্যেই অপ্রত্যাশিতভাবে উঠে দাঁড়াল ইয়োস, ওর সামনে এসে দাঁড়াল। পরনের শাদা জোব্বা মেঘের মতো ওর শরীর ঘিরে উড়ছিল। ওর শরীরে আলো খেলা করার সময় পোশাকের আড়াল থেকে গোলাপি আর আইভরি ত্বক উঁকি দিচ্ছিল। সিল্কের ভেতর দিয়ে দেখতে ওর ইমেজ বায়বীয় মনে হচ্ছিল। ওর চাঁদের মতো ফিকে পেটটা ছুটন্ত হাউন্ডের মতোই পিচ্ছিল, ওর বুক অসীম ক্রিমের মতো।
তুমি সত্যিই চাও তোমার সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করি আমি, মাই লর্ড? জিজ্ঞেস করল সে।
তাইতা এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল যে চট করে জবাব দিতে পারল না। অবশেষে বলল, মনে হচ্ছে সারা জীবন এই মুহূর্তটিরই অপেক্ষায় ছিলাম যাতে তাই করো তুমি।
আমি তোমাকে আমার সবটুকু তুলে দিতে চাই। তোমার কাছে কিছুই লুকাব না। বিনিময়ে তোমার কাছে কিছুই প্রত্যাশা করি না। কেবল তোমার ভালোবাসা। রেশমী হাতা ছুঁড়ে ফেলে দিল ও; দৃঢ়, সরু আঙুলের ডগায় পর্দার হেম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। মুখ থেকে সরাতে শুরু করল। চিবুকের কাছে এসে থামল একবার। দীর্ঘ, মোহনীয় গ্রীবা ওর।
আমরা চেহারা দেখতে চাও কিনা নিশ্চিত হয়ে নাও। পরিণতি সম্পর্কে তোমাকে সতর্ক করেছি আমি। তোমার আগে যারাই আমার সৌন্দর্য দেখেছে, আমার দাসে পরিণত হয়েছে। তুমি তা প্রতিহত করতে পারবে?
এমনকি আমাকে ধ্বংস করে দিলেও কাজটা করতে হবে, ফিসফিস করে বলল তাইতা। জানে এটা সেই ভীষণ মুহূর্ত যখন ওরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।
তবে তাই হোক, বলল ইয়োস, অসীম অসহনীয় ধীরতায় নেকাব ওঠাল সে। ওর চিবুক গোলাকার, টোল পড়া। ঠোঁটজোড়া পুরুষ্ট, বাকা, লাল রক্তের মতো পাকা চেরির রঙ। ঠোঁট চাটল সে। হাই ভোলা বেড়াল বাচ্চার মতো ডগার দিকটা বেঁকে গেল ওটার। ছোট, ঝলমলে দাঁতের আড়ালে হারিয়ে গেল। ওর নাক সরু, সোজা, তবে ডগার কাছটায় একটু ছড়ানো। হনুর হাড় সামান্য উঁচু হয়ে আছে, কপাল প্রশস্ত ও গভীর। ওর বাঁকা ভুরুজোড়া চোখের জন্যে নিখুঁত কাঠামো তৈরি করেছে। তাইতার আত্মার গভীরে নজর দিল ওগুলো। ওর চেহারা প্রতিটি অংশ নিখুঁত। একসাথে মেলালে অতুলনীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।
তোমাকে খুশি করতে পেরেছি, মাই লর্ড? জানতে চাইল সে। মাথার উপর থেকে ফেলে দিল নেকাব, সবুজ মালাকাইটের মেঝেয় লুটিয়ে পড়তে দিল ওটাকে। রুবি আলোর ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া কালো ফোয়ারা লুটিয়ে পড়েছে ওর কাঁধে। কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে, লাফাচ্ছে, কুঁকড়ে যাচ্ছে যেন নিজের জীবন আছে।
আমরা প্রশ্নের জবাব দাওনি তুমি, বলল সে। আমি কি তোমাকে খুশি করতে পেরেছি?
আমার মন তোমার সৌন্দর্য উপরব্ধি করতে পারছে না, কম্পিত কণ্ঠে বলল ও। এর সামান্য অংশ বর্ণনা করার মতোও কোনও ভাষার অস্তিত্ব নেই। এই সৌন্দর্যের দিকে তাকানোর পর বুঝতে পারছি লোকে কীভাবে এতে বন্দি হয়ে পড়তে পারে, ঠিক দাউদাউ জ্বলন্ত দাবানলের মতো। আমাকে ভীত করে তুলেছে, কিন্তু আমি একে ঠেকাতে অক্ষম।
ওর দিকে ভেসে এলো ও। সূর্য শাপলার সুবাস আচ্ছন্ন করে ফেলল ওকে। মুখ তুলে ওর দিকে না তাকানো পর্যন্ত ওর সামনে দাঁড়িয়ে রইল সে। ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে ওর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল, তারপর সরে গেল। কিন্তু তার স্বাদ বিস্ময়কর ফলের রসের মতো ওর মুখ ভরে রাখল।
মালাকাইট টাইলসের উপর দিয়ে সাঁই করে সরে গেল সে। পেছনে হেলে পড়ল, শরীরের চারপাশে উড়ছে শাদা জোব্বার প্রান্ত। চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে মেঝে। পাজোড়া নাচছে ওর, প্রবল গতির কারণে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাল রাখতে পারছে না ও। তারপর থেমে গেল ওগুলো, পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াল সে। মূর্তির মতো স্থির। কেবল ওর চুল চারপাশে দোল খাচ্ছে।
আরও আছে, মাই লর্ড, তার কণ্ঠস্বর গভীর, দপদপ করা প্রাবল্য লাভ করল, এর আগে এমন শোনেনি তাই। আরও অনেক কিছু আছে। নাকি যথেষ্ট দেখা হয়ে গেছে তোমার?
তোমার দিকে হাজার বছর তাকিয়ে থাকলেও যথেষ্ট হবে না।
মাথা ঝাঁকিয়ে কাঁধের উপর থেকে চুল সারাল সে। জ্বলন্ত চোখে তাকাল ওর দিকে। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে এসে দাঁড়িয়েছ তুমি, ওকে সতর্ক করল সে। এমনকি এই শেষ পর্যায়েও নিজেকে সরিয়ে নিতে পারো। একবার ঝাঁপিয়ে পড়লে ফেরার উপায় থাকবে না। তোমার জন্যে বিশ্বজগৎ চিরকালের জন্যে বদলে যাবে। অনেক চড়া মূল্য হবে সেটা তোমার কল্পনার চেয়েও বেশি। তুমি কি তৈরি?
