কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল ওরা। তাই ক্রুদ্ধ, হতাশ। ইয়োসের মুখ দেখতে চাইছে ও। যেন ওর মনের ভাব বুঝতে পেরেই তাইতার হাতে হাত রাখল সে। ওর স্পর্শ রোমাঞ্চিত করে তুলল তাইতাকে। কিন্তু নিজেকে স্থির রেখে জানতে চাইল, আমরা বাইরের চেহারা নিয়েই বেশি কথা বলেছি, ইয়োস। তোমার কি কোনও খুঁত আছে? সেকারণেই কি পর্দার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখো? নিজের চেহারা নিয়ে তুমি লজ্জিত?
ইয়োসের মতোই তাকে উস্কানি দিতে চেয়েছে তাই। কিন্তু জবাব দেওয়ার সময় তার কণ্ঠস্বর মিষ্টি ও শান্ত শোনাল: এই পৃথিবীর জীবন্ত নারী বা পুরুষের ভেতর সবচেয়ে সুন্দর আমি।
সেজন্যেই এই সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখ?
কারণ যারা দেখবে তাদের চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাদের মন ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
তোমার অহঙ্কার এমনিতেই বিশ্বাস করব?
এটা অহঙ্কার নয়, তাইতা। খাঁটি সত্যি।
তোমার সেই সৌন্দর্য আমাকে দেখাবে না কোনওদিন?
তৈরি হলেই আমার সৌন্দর্য দেখতে পাবে, যখন পরিণতি সম্পর্কে জানতে ও মেনে নিতে তৈরি থাকবে। ওর বাহুর উপর পড়ে আছে ইয়োসের হাত। বুঝতে পারছে না, আমার সামান্য স্পর্শও তোমাকে উতলা করে তুলছে? আমার আঙুলের ডগায় তোমার হৃদয়ের স্পন্দন টের পাচ্ছি। তাইতার ইন্দিয়কে উত্তাল অবস্থায় রেখে হাত তুলে নিল সে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল ওর। এসো, অন্য বিষয়ে কথা বলা যাক। আমাকে নিয়ে তোমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে, সেগুলোর সত্যি জবাব দেওয়ার কথা দিয়েছি আমি, বলল সে। ওর আমন্ত্রণ গ্রহণ করার সময় তাইতার কণ্ঠস্বর খানিকটা রুদ্ধশ্বাস শোনাল। নীলের উৎসমুখে বাঁধ দিয়েছ তুমি। এমন করার কী কারণ?
দুটি উদ্দেশ্য ছিল আমার। প্রথমত, এটা ছিল তোমার প্রতি আমার কাছে। আসার একটা আমন্ত্রণ। সেটা প্রতিরোধে অক্ষম ছিলে তুমি। এখন আমার পাশে আছ তুমি।
গভীরভাবে কথাটা ভাবল তাইতা। তারপর জানতে চাইল, দ্বিতীয় কারণ?
তোমার জন্যে একটা উপহার তৈরি করছিলাম আমি।
উপহার? বলে উঠল তাইতা।
বিয়ের উপহার। আমরা দেহমনে এক হয়ে যাবার পর তোমাকে মিশরের দুটি রাজ্যই উপহার দেব আমি।
কেবল সেগুলোকে ধ্বংস করে ফেলার পর? এটা কেমন বিকৃত ও বর্বর উপহার?
তুমি যখন দ্বৈত মুকুট পরে আমার পাশে মিশরের সিংহাসনে বসবে, আমি আবার নীল ও তার পানিকে আমাদের মিশরের জন্যে পুনরুজ্জীবিত করব… আমাদের এমন আরও অসংখ্য রাজ্যের প্রথম হবে এটা।
আর এই অবসরে মানুষের সন্তানগুলো ভোগন্তি পোহবে? জানতে চাইল তাইতা।
এরই মধ্যে তুমি নিজেকে সমস্ত সৃষ্টির প্রভুর মতো ভাবতে শুরু করেছ, অচিরেই তাই হবে তুমি। গুহার পাশে মেঘ-বাগিচার ইমেজে সেটা তোমাকে দেখিয়েছি। সকল জাতি, অন্তহীন জীবন, তারুণ্য ও সৌন্দর্যের উপর আধিপত্য ও হাজার বছরের জ্ঞান ও শিক্ষা, যা কিনা হীরার পাহাড়।
সত্যিকেই সবচেয়ে বড় পুরস্কার মনে করি আমি, বলল তাইতা।
সেটা তোমার হবে।
আমি এখনও তোমার প্রস্তাবের ব্যাপারে সন্দিহান, সমান মাপের একটা কিছুর বিনিময় ছাড়া তোমার এমন করার কথা নয়।
ওহ, আমি তো এরই মধ্যে সে কথা বলেছি তোমাকে। আমার প্রস্তাবের বিনিময়ে তোমার চিরন্তন প্রেম আর নিবেদন দাবি করি আমি।
দীর্ঘদিন কোনও সঙ্গী ছাড়াই তো বেঁচে আছো, এখন কী কারণে তার প্রয়োজন?
শত বছরের একঘেয়েমিতে অবসন্ন আমি, আত্মার ক্লান্তি আর এইসব বিস্ময় ভাগাভাগি করে নেওয়ার মতো একজন সঙ্গীর অভাবের একঘেয়েমী।
আমার কাছে কেবল এইটুকুই চাইছ তুমি? তোমার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার সামান্য আভাস আমি পেয়েছি। তোমার সৌন্দর্য ও বুদ্ধি মিলে গেলে এই দামটা তো একেবারেই তুচ্ছ। তার মিথ্যাগুলো সত্যির আবরণে ঢাকা। তার কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করল তাইতার। ওরা পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়ানো দুই সেনাদলের অধিনায়কের মতো। এটা হচ্ছে যুদ্ধ শুরুর আগ মুহূর্তের মহড়া ও অস্ত্র শানানো। ভয় পাচ্ছে তাইতা, নিজের জন্যে ততটা নয়, যতটা মিশর ও ফেনের জন্যে; ওর কাছে অমূল্য দুটি বিষয়, দুটিই এখন ভয়ঙ্কর বিপদে রয়েছে।
পরের দিনগুলো কৃষ্ণ পুকুর পাড়ে বসে কাটাল ওরা, রাতগুলো ইয়োসের সবুজ কামরায়। ক্রমে আত্মা গোপন রেখে তাইতার কাছে দৈহিক রূপের আরও অনেক কিছুই প্রকাশ করল সে। রোজই আগের চেয়ে ঢের বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠল ওর আলোচনা। মাঝে মাঝে রূপার ট্রেতে রাখা ফলের টুকরো নিতে সামনে ঝুঁকে পড়ে সে, তখন বেমানানভাবে বাহু উন্মুক্ত করতে হাতা খসে পড়ার সুযোগ করে দেয়; কিংবা আইভরি কাউচে নড়েচড়ে বসার সময় কালো জোব্বার স্কার্ট খসে পড়তে দিয়ে হাঁটু উন্মুক্ত করে। ওর পায়ের হোড়ের মাংস সূক্ষ্ম। ওর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নিখুঁত আকারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা উচিত ছিল ওর, কিন্তু হয়নি। ওর গোটা শরীর উন্মুক্ত হবার সময়ের ভয়ে সময় কাটাচ্ছে ও। তার মোহ প্রতিরোধ করার আপন ক্ষমতায় সন্দিহান।
বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে পার হয়ে যেতে লাগল দিন-রাত। এক সময় অসহনীয় হয়ে উঠল ওদের মাঝখানে গড়ে ওঠা দৈহিক ও নাক্ষত্রিক টেনশন। ওকে স্পর্শ করল সে। কোনও একটা বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে ওর হাত নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। একবার নিজের বুকে ওর হাত চেপে ধরল ও। ওর বুকের উষ্ণ স্থিতিস্থাপকতা অনুভব করার সময়ে যন্ত্রণার কাছে পরাস্ত না হতে সম্পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ কাজে লাগাতে হলো ওকে।
