তা কি পূরণ করা সম্ভব? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
তোমার সামনেই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসাবে বসে আছি আমি।
তোমার বয়স কত, ইয়োস?
ফারাও চিপস গিযার মহান পিরামিড নির্মাণ করানোর সময়ই অনেক বয়স্কা ছিলাম আমি।
সেটা কি করে সম্ভব?
ফন্টের কথা শুনেছ তুমি? জানতে চাইল সে।
এটা অতীত কাল থেকে চালু একটা মিথ, জবাব দিল তাইতা।
মোটেই মিথ নয়, তাইতা। ফন্টের অস্তিত্ব আছে।
কী সেটা? কোথায়?
জীবনের নীল নদী, আমাদের মহাবিশ্বকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজনীয় শক্তি।
সত্যিই নদী বা ঝর্না এটা?
নীল নাম কেন? বর্ণনা দিতে পারবে?
এমনকি তেনমাস ভাষায়ও ওটার শক্তি ও সৌন্দর্য বর্ণনার উপযুক্ত শব্দ নেই। আমরা মিলে গেলে তারপর ওখানে নিয়ে যা তোমাকে। নীলে একসাথে ম্লান করব আমরা, তারুণ্যের সমস্ত জাঁকজমক নিয়ে বের হয়ে আসবে তুমি।
কোথায় ওটা? আকাশে নাকি জমিনে?
এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায় ওটা। সাগরের স্থান বদল আর পাহাড়ের ওঠা নামার সাথে বদলে যায়।
এখন কোথায় আছে ওটা?
আমাদের বসার এই জায়গা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, বলল ইয়োস। কিন্তু ধৈর্য ধরো। সময় হলেই ওখানে নিয়ে যাব তোমাকে।
অবশ্যই মিথ্যা কথা বলছে সে। স্বয়ং সে মিথ্যা। এমনকি ফন্টের অস্তিত্ব থাকলেও তাইতা জানে অন্য কাউকে ওখানে নিয়ে যাবে না সে। তারপরেও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি কৌতূহলী করে তুলল ওকে।
বুঝতে পারছি, এখনও আমাকে সন্দেহ করছ, মৃদু কণ্ঠে বলল ইয়োস। আমার আন্তরিক বিশ্বাস প্রমাণ করতে তোমার সাথে আরেকজনকেও ফন্টে নেওয়ার অনুমতি দেব তোমাকে, যাতে ওটার আশীর্বাদের ভাগ নিতে পারে। এমন কেউ যাকে অনেক ভালোবাসো তুমি। কেউ আছে এমন?
ফেন! নিমেষে ভাবনাটা আড়াল করে ফেলল ও, ইয়োসও যাতে টের না পায়। ফাঁদ পেতেছে ইয়োস, প্রায় ধরা দিতে যাচ্ছিল ও। না, নেই, জবাব দিল তাইতা।
একবার তোমাকে দেখার সময় বনের একটা পুকুর ধারে ছিলে তুমি। তোমার সাথে একটা বাচ্চাকে দেখেছিলাম, ওর মাথার চুল ফিকে রঙের।
ও হ্যাঁ, সায় দিল ও। এমনকি তার নামও ভুলে গেছি, কারণ তুমি যাদের উইপোকা বলো তাদের একজন ছিল সে। মুহূর্তের সঙ্গী।
ওকে ফন্টে নিতে চাও না?
নেওয়ার কোনও কারণ নেই। চুপ করে রইল ইয়োস, কিন্তু কপালে কোমলতম ছোঁয়া টের পাচ্ছে তাইতা; অনেকটা আঙুলের চাপের মতো। তাই জানে ওর কথা বিশ্বাস করেনি ইয়োস, এখন ওর মাথার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে, ওর ভাবনা চুরি করতে চায়। মানসিক প্রয়াসে বাধা দিল ও, সাথে সাথে। সরে গেল ইয়োস।
তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছ, তাই। কিছুক্ষণ ঘুমানো দরকার।
মোটেও ক্লান্ত নই আমি, জবাব দিল ও, সত্যিই নিজেকে প্রাণবন্ত ও টাটকা মনে হচ্ছে ওর।
আমাদের অনেক কিছু আলোচনার রয়েছে, যেন আমরা এক দীর্ঘ প্রতিযোগিতার দৌড়বিদ। আমাদেরকে অবশ্যই ঠিকমতো পা ফেলতে হবে। হাজার হোক, চিরকালের সাথী হওয়াই আমাদের নিয়তি। তাড়াহুড়োর কোনও প্রয়োজন নেই। সময় আমাদের খেলার সামগ্রী, শত্রু নয়। কাউচ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ইয়োস, কোনও কথা না বলে কালো দেয়ালের দরজা গলে পিছলে উধাও হয়ে গেল; এই দরজাটা আগে খেয়াল করেনি তাইতা।
*
কান্তি বোধ না করলেও নিজের চেম্বারে এসে গদিমোড়া রেশমী মাদুরে শোয়ামাত্র গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল তাইতা। জেগে ওঠার পর দেখল ছাদের ফোকর গলে সূর্যের আলোর একটা ধারা নেমে আসছে। নিজেকে ওর অসাধারণ জীবন্ত মনে হলো।
ওর নোংরা পোশাকআশাক উধাও হয়েছে, তার জায়গায় ওর চামড়ার জোব্বার পাশে একজোড়া স্যান্ডেলসহ একটা টাটকা টিউনিক বিছিয়ে রাখা। গোসল করে পোশাক পরে নিল ও। সূক্ষ্ম কাপড়ে তৈরি ইয়োসের দেওয়া টিউনিকটা, ওর গায়ে যেন আদর বোলাচ্ছে, সদ্যজাত ছাগলের চামড়া দিয়ে বানানো হয়েছে স্যান্ডেল জোড়া, সোনালী পাতা খোদাই করা তাতে। নিখুঁতভাবে লেগে গেছে তাইতার পায়ে।
ইয়োসের সবুজ কামরায় এসে দেখল ওটা ফাঁকা। কেবল ওর সৌরভের অবশেষ রয়ে গেছে। গত রাতে ইয়োস যে দরজা গলে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেটার দিকে এগিয়ে গেলও। ওটার ওপাশের দীর্ঘ প্যাসেজ রোদের আলোয় নিয়ে এলো ওকে। চোখজোড়া সয়ে আসার পর দেখল আরেকটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে এসে পড়েছে ও, মেঘ-বাগিচার মতো অত বড় নয়, তবে ওটার চেয়ে ঢের সুন্দর। কিন্তু জ্বালামুখের মুখের মেঝে বিপুলভাবে ঢেকে রাখা সমৃদ্ধ বন ও বাগানের তুলনা করার মতো ভাষা ওর জানা নেই। ঠিক ওর সামনেই বিছিয়ে আছে একটা সবুজ প্রাঙ্গণ, এখানে ঠিক মাঝখানে ছোট মাৰ্বল পাথরের ছামিয়ানা টাঙানো একটা ছোট পুকুর রয়েছে। ঝলমলে পানির একটা ধারা গড়িয়ে পড়ছে তাতে। পানির ধারা পরিষ্কার হলেও পুকুরটা পলিশ করা জেটের মতো কালো, চকচকে।
তাবুর মাৰ্বল বেঞ্চে বসে আছে ইয়োস। তার মাথা উন্মুক্ত, কিন্তু মুখটা অন্যদিকে ফেরানো থাকায় কেবল চুলই দেখতে পাচ্ছে তাই। নীরবে ওর দিকে এগিয়ে গেল তাইতা, অজান্তে তার কাছে যাওয়ার আশা করছে, মুখটা এক নজর দেখতে পাবে। কোমরের কাছে নেমে এসেছে ইয়োসের চুল; পুকুরের জলের মতোই কালো। কিন্তু অনির্বচনীয়ভাবে ঢের বেশি ঝলমলে। কাছাকাছি যাবার পর লক্ষ করল চুলের গোছায় রোদের আলো দামী রুবি পাথরের মতো আভা তুলে ঠিকরে যাচ্ছে। ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করল ওর, কিন্তু হাত বাড়াতেই মাথার উপর নেকাব ওঠাল ইয়োস, ঢেকে ফেলল নিজেকে। ওকে ক্ষণিকের জন্যেও তার চেহারা দেখার সুযোগ দিল না। তারপর ফিরে তাকাল ওর দিকে। আমার পাশে বোস, কারণ তোমার স্থান ওখানেই।
