শক্তিশালী দৃশ্য ছিল ওগুলো, বলল তাইতা, ওর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক, নিরাসক্ত।
এর সবই সত্যি। যা যা কথা দিয়েছি সেগুলো তোমাকে দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে।
দুনিয়ায় এত মানুষ থাকতে আমাকে কেন বেছে নিলে?
এত মানুষ! ভর্ৎসনার সাথে বলে উঠল সে। আমার কাছে দুনিয়ার সব মানুষ উইয়ের ঢিবির একটা উইপোকার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওরা প্রবৃত্তির দাস, যুক্তি বা জ্ঞানের ধার ধারে না, কারণ এইসব গুণ আয়ত্ত করার মতো দীর্ঘদিন বাঁচে না ওরা।
শিক্ষিত, সহানুভূতিশীল ও মানবতাবাদী লোকের কথা জানি আমি, ওকে শুধরে দিল তাইতা।
তোমার অল্পদিনের আয়ুর ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছ তুমি, বলল ইয়োস।
অনেক দিন বেঁচেছি আমি, বলল ও।
কিন্তু আর বেশি দিন বাঁচবে না, ওকে বলল সে। তোমার দিন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
তুমি কাঠখোট্টা কথা বললো, ইয়োস।
আহ, এইমাত্র যেমন বলেছি, তোমার কাছে শুধু সত্যি কথাই বলব আমি। মানুষের শরীর একটা গুরুত্বপূর্ণ বাহন, আর জীবন ক্ষণস্থায়ী। সত্যিকারের প্রজ্ঞা ও উপলব্ধি অর্জন করার মতো দীর্ঘ আয়ু নিয়ে আসে না সে। মানুষের হিসাবে তুমি অনেক দীর্ঘজীবী, আমার হিসাবে দেড়শো বছর; কিন্তু আমার চোখে এটা প্রজাপতির বা সন্ধ্যায় ফুটে রাতের দিনের আলো ফোঁটার আগেই মরে যাওয়া ক্যাকটাস ফুলের চেয়ে বেশি নয়। তোমার আত্মা যে দেহখাঁচায় আছে অচিরেই তোমাকে ছেড়ে যাবে সেটা। অকস্মাৎ কালো জোব্বার নিচ থেকে ডান হাত বাড়িয়ে আশীর্বাদের একটা ভঙ্গি করল সে।
ওর পাজোড়া কমনীয় হলে হাতদুটো অসাধারণ সুন্দর। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এলো তাইতার, মহোনীয় ভঙ্গিমায় হাতের পশম শিউরে উঠল ওর।
অবশ্য তোমাকে একথা না বললেও চলে, মৃদু কণ্ঠে বলল ইয়োস।
আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি তুমি, ইয়োস। আমাকে কেন?
তোমার সংক্ষিপ্ত জীবনে সেই যোগ্যতা অর্জন করেছ তুমি। আমি তোমার জীবন চিরকালের জন্যে প্রসারিত করে দিলে দানবীয় বুদ্ধিমানে পরিণত হবে তুমি।
তাতে সব কিছুর ব্যাখ্যা মেলে না। আমি বুড়ো, কুৎসিত।
তোমার শরীরের একটা অংশ এরই মধ্যে ঠিক করে দিয়েছি আমি, যুক্তি দেখাল সে।
তিক্ত হাসল তাইতা। তাহলে এখন তরুণ, সুন্দর সেই অংশসহ বয়স্ক কদর্য পুরুষ আমি।
ওর সাথে হাসল সেও, সেই রোমহর্ষক শব্দ হলো। খুবই সুন্দর বলেছ। হাতটা আবার জোব্বার আড়ালে নিয়ে গেল সে। কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেল তাইতা। আবার কথা শুরু করল ইয়োস, গুহাতে তোমার তরুণ পুরুষ হিসাবে একটা ইমেজ দেখিয়েছিলাম। তুমি সুন্দর ছিলে, আবারও সুন্দর হয়ে উঠতে পারো।
চাইলে তো যেকোনও সুদর্শন তরুণকে পেতে পারো তুমি। আগেও যে তাই করেছ, তাতে আমার সন্দেহ নেই, চ্যালেঞ্জ করল ও।
সাথে সাথে জবাব দিল সে। সুন্দর, সতোর সাথে। দশ হাজার বার, বা তারও বেশি, কিন্তু সৌন্দর্য সত্ত্বেও ওরা ছিল পিঁপড়ার মতো।
আমি কি ভিন্ন হবো?
হ্যাঁ, তাইতা-হ্যাঁ।
কীভাবে?
মনের দিক থেকে, বলল সে। কেবল দৈহিক আবেগ অচিরেই ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু উন্নত বুদ্ধিমত্তা সব সময়ই প্রলুব্ধকর। চিরন্তন তরুণ দেহে মহান মন সময়ের সাথে সাথে শক্তিশালী হয়ে ওঠে: এগুলো দেবতাসুলভ গুণাবলী। তাইতা, তুমিই সেই নিখুঁত সঙ্গী ও সহচর যার জন্যে অযুত যুগ ধরে অপেক্ষা করে আছি।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করে গেল ওরা। ইয়োসের মেধা শীতল ও বৈরী জানা থাকলেও মুগ্ধকর ও বাধ্যকারী। নিজেকে শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে পরিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে ওর। শেষ পর্যন্ত নিজের বিরক্তির সাথে ওর মনে হতে লাগল যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইছে ও, কিন্তু সেটা উচ্চারণের আগেই ইয়োস বলল, তোমার জন্যে কোয়ার্টার আলাদা করে রাখা হয়েছে। তোমার ডান দিকের ওই দরজা দিয়ে গিয়ে প্যাসেজ বরাবর শেষ মাথায় চলে যাও।
ইয়োস ওকে যে কামরায় পাঠিয়েছে সেটা বেশ বড়সড়, দেখার মতো, তবে আশপাশ তেমন একটা খেয়াল করল না ও, কারণ ওর মনটা আলোকিত হয়ে আছে। একটুও ক্লান্তি বোধ করছে না। একটা কিউবিকলে চমৎকারভাবে খোদাই করা একটা টুল পেল ও, ওটার নিচে ল্যাট্রিন বাস্কেট রাখা। নিজেকে ভারমুক্ত করল ও। এক কোণে একটা নল থেকে আরেকটা পাথরের স্ফটিক বেসিনে সুবাসিত উষ্ণ পানি ঝরে পড়ছে। ধোয়া শেষ করেই আবার সবুজ চেম্বারে ফিরে এলো ও, মনে আশা ইয়োস হয়তো এখনও আছে ওখানে। এখন আর ছাদের ফোকর দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে না। রাত নেমেছে, কিন্তু দেয়ালের পাথুরে স্ফটিকগুলো উষ্ণ আলো বিলোচ্ছে। শেষবার যেভাবে দেখে গিয়েছিল সেভাবেই বসে আছে ইয়োস। ওর সামনে গিয়ে বসতেই সে বলল, তোমার জন্যে খাবার আর পানীয় আছে। চমৎকার আঙুলে ওর পাশের আইভরি টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করল সে। ওর অনুপস্থিতির সময় রূপার ডিশ ও একটা পাত্র এনে রাখা হয়েছে ওটার উপর। ক্ষিধে বোধ করছে না ও, কিন্তু ফল শরবত দেখে খাসা মনে হচ্ছে। নিস্পৃহভাবে খেল ও, পান করল। তারপর সাগ্রহে আবার কথোপকথনে ফিরে এলো। অনায়াসে অনন্ত জীবনের কথা বলছ?
ফারাও থেকে শুরু করে চাষী পর্যন্ত সবার স্বপ্ন, বলল ইয়োস। কাল্পনিক স্বর্গে অনন্ত জীবনের আশায় থাকে তারা। এমনকি আমার জন্মের আগে যারা বেঁচে ছিল সেই বয়স্ক লোকেরাও গুহার দেয়ালে সেই স্বপ্নের ছবি এঁকে রেখে গেছে।
