আমি ঘুমানোর সময় ও পাহারায় ছিল। এবার আমি ওকে পাহারা দেব, সৎ মেরেন, বললেন দিমিতার।
এটা আমার দায়িত্ব, তাইতার দিকে খেয়াল রেখে বলল মেরেন।
মানুষ আর জানোয়ারের হাত থেকে ওকে বাঁচাতে পারবে তুমি-তোমার চেয়ে ভালো পারবে না কেউ, বললেন দিমিতার। কিন্তু অকাল্টের সাহায্যে আক্রমণ করা হলে অসহায় হয়ে পড়বে। সৎ মেরেন, তোমার তীর-ধনুক নিয়ে যাও, আমাদের জন্যে তাগড়া একটা হরিণল শিকার করে আনো।
আরও কিছুক্ষণ তাইতার কাছে থাকল মেরেন, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁবুর পর্দা ফাঁক করে বের হয়ে গেল। তাইতার তক্তপোষের পাশে অবস্থান নিলেন দিমিতার।
*
তরঙ্গায়িত ঝিলমিল জলের পাশে তুষার-শাদা উজ্জ্বল সৈকতে সাগর তীর ধরে হাঁটছে তাইতা। জেসমিন ও লাইলাক ফুলের সৌরভ-মাখা হাওয়া পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে চোখে-মুখে, এলোমলো করে দিচ্ছে দাড়িগোঁফ। জলের কিনারায় এসে থামল ও, ছোট ছোট ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে লাগল ওর পায়ে। সাগরের উপর দিয়ে দূরে চোখ ফেরাল। ওধারের গাঢ় শূন্যতাই দেখতে পেল শুধু। জানে। পৃথিবীর একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পড়েছে ও, তাকিয়ে আছে চিরন্তন বিশৃঙ্খলার দিকে। রোদে দাঁড়িয়ে থাকলেও অন্ধকারের দিকে ওর চোখ। তারাগুলো জোনাকপোকার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে তার উপর।
লস্ত্রিসের তারার খোঁজ করল ও। কিন্তু নেই। ক্ষীণতম আভাটুকুও অবশিষ্ট নেই। শূন্যতা থেকে এসেছিল, আবার শূন্যতায় ফিরে গেছে। ভীষণ বেদনাবোধে আক্রান্ত হলো ও। আপন নিঃসঙ্গতায় তলিয়ে যাবার অনুভূতি হলো। ঘুরে দাঁড়াতে যাবে, এমন সময় অবশেষে গানের আওয়াজ শুনতে পেল: তরুণ কণ্ঠস্বর নিমেষে চিনে ফেলল, যদিও অনেক দিন আগে শুনেছিল। বুকের পাজরে মাথা ঠুকছে ওর হৃৎপিণ্ড। আওয়াজ আরও কাছে সরে এলে বুনো একটা পশু মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠল।
যখন প্রিয়তমার মুখখানি দেখি,
আহত কোয়েলের মতো ডানা ঝাপ্টায় আমার হৃদয়;
ওর হাসির রোদ্রালোকে
ভোরের আকাশের মতো লাল হয়ে ওঠে আমার মুখ…
এটাই ছিল ওকে শেখানো ওর প্রথম গান, সব সময়ই প্রিয় গান ছিল ওর। সাগ্রহে ওকে খুঁজে পেতে ঘুরে দাঁড়াল ও। কারণ ওর জানা আছে এই গায়িকা লস্ত্রিস ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। ওরই হেফাযতে ছিল সে, নদীর জরে ওর স্বাভাবিক মায়ের মৃত্যুর পরপরই দেখভাল ও শিক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওর ওপর। ওকে ভালোবেসে ফেলেছিল ও, যেভাবে কোনও দিন কোনও পুরুষ কোনও নারীকে ভালোবাসেনি।
রোদের আলোয় উজ্জ্বল সাগরের বিপরীতে চোখ আড়াল করল ও। একটা অবয়ব দেখতে পেল জলের বুকে। কাছে এগিয়ে এল অবয়বটা, আরও কাছে আসতে লাগল। ক্রমে স্পষ্ট হয়ে এলো ওটার কাঠামো। দেখা গেল ওটা একটা বিরাট সোনালি ডলফিন, এত দ্রুত ও জাকের সাথে সাঁতার কাটছে যে, ওটার নাকের কাছে কুঁকড়ে যাচ্ছে জল, ফেনা তুলে সরে যাচ্ছে। ওটার পিঠে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে, দক্ষ রথ চালকের মতো ভারসাম্য বজায় রেখেছে। সাগরের শৈবালের লাগাম ধরে পেছনে হেলে আছে, লাগাম দিয়েই অসাধারণ প্রাণীটাকে সামলাচ্ছে, গান গাওয়ার সময় ওর উদ্দেশে মৃদু হাসছে মেয়েটা।
হাঁটু গেড়ে বালির উপর বসে পড়ল তাইতা। মিস্ট্রেস! চিৎকার করে বলে উঠল। মিষ্টি লস্ত্রিস!
আবার বার বছর বয়সে ফিরে গেছে ও, যখন প্রথম ওর সাথে জানাশোনা হয়েছিল। পরনে কেবল ব্লিচ করা একটা লিনেনের স্কার্ট, কড়কড়ে, ঝলমলে; সারসের ডানার মতো শাদা। ওর ছিপছিপে দেহের ত্বকের রঙ বিবলসের ওধারের পাহাড় থেকে আনা তৈলাক্ত সিডার কাঠের মতো চকচক করছে। সদ্য পাড়া ডিমের মতো ওর বুক, গোলাপি গার্নেট বসানো।
লস্ত্রিস, আমার কাছে ফিরে এসেছ। আহা, দয়াময় হোরাস! হে, করুণাময় আইসিস! ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছ,ফুঁপিয়ে উঠল ও।
তোমাকে কোনওদিনই ছেড়ে যাইনি আমি, প্রিয় তাইতা, গানে বিরতি দিয়ে বলল লস্ত্রিস। ওর অভিব্যাক্তিতে দুষ্টুমি আর ছেলেমানুষি আমোদের ছাপ। ওর কমনীয় ঠোঁটজোড়া হাসিতে বেঁকে গেলেও চোখে কোমল সহানুভূতির ছাপ। নারীসুলভ প্রজ্ঞা ও উপলব্ধিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে ও। তোমাকে দেওয়া আমার প্রতিশ্রুতির কথা কোনওদিনই ভুলিনি।
পিছলে সৈকতে উঠে এলো সোনালি ডলফিন। লাফ দিয়ে ওটার পিঠ থেকে মোহনীয় ভঙ্গিতে বালির উপর নেমে দাঁড়াল লস্ত্রিস। ওর দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক পাশের কাঁধের উপর নেমে এসে বুকের মাঝখানে ঝুলছে ঘন চুলের গোছা। ওর মুখের প্রতিটি জায়গা ও রূপালি বাঁক খোদাই হয়ে আছে ওর মনে। কাছে এসো, তাইতা, বলতেই ওর দাঁতগুলো মুক্তো-মালার মতো ঝিকিয়ে উঠল। আমার কাছে ফিরে এসো, আমার সত্যিকারের ভালোবাসা!
ওর দিকে পা বাড়ানোর চেষ্টা করল তাইতা। প্রথম কয়েক পদক্ষেপে বয়সের ভারে টলে উঠল ন্যূজ পাজোড়া, কিন্তু তারপরই নতুন শক্তি খেলে গেল ওর দেহে। সোজা হয়ে দাঁড়াল ও, অনায়াসে এগিয়ে গেল শাদা বালির উপর দিয়ে। টের পাচ্ছে ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে আছে শরীরের পেশিগুলো। ওর পেশি এখন কোমল, উজ্জীবিত।
ও, তাইতা, তুমি কত সুন্দর! আহবান জানাল লস্ত্রিস। কত ক্ষিপ্র, শক্তিশালী, কী তরুণ, প্রিয় আমার। মেয়েটার কথাগুলো সত্যি জানে বলে অমোদিত হয়ে উঠল ওর হৃদয়-মন। আবার তরুণ হয়ে গেছে ও, প্রেমে পড়েছে।
