পরদিন ভোরের আগেই ধাক্কা দিয়ে মেরেকে জাগিয়ে তুলল ফেন। বাকিরাও উঠে পড়ল। ফেনের চোখে অশ্রু দেখে তলোয়ারের দিকে হাত বাড়াল মেরেন। কি ব্যাপার, ফেন? কী হয়েছে?
কিছু না! কেঁদে বলল ফেন। এবার ভালো করে ওকে দেখল মেরেন। বুঝতে পারল আনন্দে কাঁদছে ও। সবকিছু ঠিকঠাক আছে। রাতে আমার কাছে এসেছিল
তুমি ওকে দেখেছ? ওর হাত ধরে ঝাঁকুনি দিল মেরেন। এখন কোথায় আছেন তিনি? কোথায় গেছেন?
আমি ঘুমিয়ে থাকার সময় আমাকে দেখতে এসেছিল ও। জেগে ওঠার পর আমাকে ওর আত্মার প্রতীক দেখিয়ে বলেছে, শিগগিরই, খুব শিগগির তোমার কাছে ফিরে আসছি।
মাদুর থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল সিদুদু, ফেনকে জড়িয়ে ধরল। তোমার জন্যে অনেক খুশি লাগছে আমার, বাকি সবার জন্যেও।
এবার সব ঠিক হয়ে যাবে, বলল ফেন। তাইতা ফিরে আসছে, আমরা নিরাপদ হয়ে যাব।
*
যুগ যুগ ধরে তোমার আগমনের অপেক্ষায় আছি আমি, বলল ইয়োস। সে মহা মিথ্যাকে মূর্ত করে জানা থাকা সত্ত্বেও ওর কথা বিশ্বাস না করে পারল না তাইতা। ঘুরে গুহার মুখের কাছে ফিরে এলো সে। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল না তাইতা। জানে একে অনুসরণ করা ছাড়া কিছুই করার নেই ওর। তার মায়ার বিরুদ্ধে ওর সব প্রতিরোধ সত্ত্বেও এই মুহূর্তে ওকে যেখানে নিয়ে যায় সেখানে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে মন চাইছে না।
প্রবেশ পথের ওপাশে সুড়ঙটা ক্রমে সংকীর্ণ হতে হতে ছত্রাকে ঢাকা পাথর এক সময় ওর কাঁধ স্পর্শ করল। ওর পায়ের উপর দিয়ে বয়ে যাবার সময় টিউনিকের হেম ছুঁয়ে দিচ্ছে বরফের মতো শীতল ঝর্নার পানি। সামনে যেন ভেসে চলেছে ইয়োস। ওর কালো আলখেল্লার নিচে নিতম্বজোড়া ফণা তোলা গোখরা সাপের মতো নিখুঁত ছন্দে দোল খেয়ে চলেছে। ঝর্নার চেয়ে সংকীর্ণ পাথুরে র্যাম্প ধরে উঠতে শুরু করল সে। উপরে প্রসারিত হয়ে একটা প্রশস্ত প্যাসেজওয়েতে পরিণত হয়েছে সুড়ঙটা। দেয়ালগুলো বাস্তব ও কাল্পনিক মানুষ ও জম্ভজানোয়ারের আবক্ষ মূর্তি খচিত রুবি পাথরের টালিতে ঢাকা। মেঝেয় বাঘের চোখের নকশা আঁকা, ছাদ গোলাপি কোয়ার্টযে তৈরি। মানুষের মাথার আকৃতির বিরাট আকারের পাথরের স্ফটিক দেয়ালের ব্র্যাকেটে বসানো রয়েছে। ইয়োস কাছে পৌঁছানোমাত্র রহস্যময় কমলা আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, আলোকিত করে তুলছে সামনের প্যাসেজ। ওরা এগিয়ে যাবার সাথে সাথে আবার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। ইয়োসের ছোট নগ্ন পা সোনালি টালির উপর পিছলে যাচ্ছে। ওকে বিমুগ্ধ করে তুলছে, চোখ সরানো কষ্টকর হয়ে উঠছে। এগিয়ে যাবার সময় বাতাসে সুবাস রেখে যাচ্ছে সে। প্রবল আনন্দের সাথে উপভোগ করছে ও, ওটা সূর্যশাপলার গন্ধ, চিনতে পারছে ও।
অবশেষে একটা বিশাল আঁকাল দর্শন চেম্বারে হাজির হলো ওরা। এখানকার দেয়ালগুলো সবুজ মালাকাইটের। মাথার উপরের উঁচু ছাদের ফোকরগুলো নিশ্চয়ই পৃথিবীর পিঠের কাছে পৌঁছে গেছে, কারণ ওগুলো দিয়ে সূর্যের আলো আসছে, দেয়ালে পড়ে জ্বলন্ত রুবি পাথরে ঝিলিক খেলছে। কামরার আসবাবপত্র আইভরি কুঁদে বানানো। মাঝখানে রয়েছে দুটো নিচু কাউচ। ওগুলোর একটায় বসল ইয়োস, নিতম্বের নিচে পাজোড়া ভাঁজ করল; এমনভাবে আলখেল্লা ছড়িয়ে দিল যাতে এমনকি ওর পাজোড়াও ঢেকে গেল। সামনের কাউচের দিকে ইঙ্গিত করল সে। দয়া করে আরাম করে বসো। তুমি আমার সম্মানিত ও প্রিয় মেহমান, তাইতা, তেনমাস ভাষায় বলল সে।
কাউচের কাছে গিয়ে ওর উল্টোদিকে বসল ও। রেশমী নকশা করা চাদরে ঢাকা ওটা।
আমি ইয়োস, বলল সে।
আমাকে প্রিয় বললে কেন? এটা আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। আমাকে তুমি চেনোই না।
আহ, তাইতা। নিজেকে যেমন করে চেনো তুমি ঠিক সেভাবে তোমাকে চিনি আমি, হয়তো তারচেয়ে বেশি।
ইয়োসের হাসির ওর কানে ওর শোনা যেকোনও সঙ্গীতের চেয়েও মিষ্টি শোনাল। মনকে অবরুদ্ধ রাখার চেষ্টা করল ও। তোমার কথা যুক্তিকে অস্বীকার করলেও কেন যেন তাতে সন্দেহ করতে পারছি না। মেনে নিচ্ছি আমাকে তুমি চেনো, কিন্তু নাম ছাড়া তোমার সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, জবাব দিল তাইতা।
তাইতা, আমাদের অবশ্যই পরস্পরের কাছে সৎ থাকতে হবে। তোমার কাছে শুধু সত্যি কথাই বলব আমি। তোমাকেও তাই করতে হবে। তোমার শেষের কথাটা মিথ্যা। আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানো তুমি। তুমি কিছু ধারণাও তৈরি করে নিয়েছ, যেগুলো দুঃখজনকভাবে ভুল। তোমাকে আলোকিত করে সেই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়াই আমার উদ্দেশ্য।
বলো, কোথায় আমার ভুল হয়েছে।
আমাকে শত্রু ভাবো তুমি।
নীরব রইল তাই।
আমি তোমার বন্ধু, বলে চলল ইয়োস। এত ভালো, মিষ্টি বন্ধু আর কখনও জোটেনি তোমার।
গম্ভীরভাবে মাথা কাত করল তাইতা, কিন্তু এবারও জবাব দিল না। মরিয়া হয়ে ইয়োসকে বিশ্বাস করতে চাইছে বলে আবিষ্কার করল। প্রতিরক্ষা বর্ম উঁচু রাখতে সম্পূর্ণ দৃঢ়তার প্রয়োজন হলো ওর।
খানিক পরে খেই ধরল ইয়োস, ভাবছ, তোমার সাথে আমি মিথ্যা বলব, আমার সাথে তুমি যেমন বলেছ আমিও তেমনি তোমার সাথে মিথ্যা বলেছি, বলল সে।
ইয়োসের পড়ার জন্যে কোনও আভা না ছড়ানোয় স্বস্তি বোধ করল তাইতা; ওর আবেগ লুকানো রয়েছে।
তোমার কাছে সত্যি কথাই বলেছি। গুহায় তোমাকে দেখানো দৃশ্যগুলো সত্যি। ওগুলোয় প্রতারণার কোনও উপাদান নেই, বলল সে।
