হিলোর স্যাডলের পেছন থেকে মন্দিরের একটা মেয়েকে টেনে নামিয়ে নেওয়া হলো, হিলতো ওটার খুলি বরাবর আঘাত হানার আগেই এক কামড়েই গলা ফাঁক হয়ে গেল তার। নাকোন্তো যখন শেষ ট্রগটাকে শেষ করল ততক্ষণে অনেকগুলো ঘোড়াই কামড় খেয়েছে। একটা এমন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে যে ওটার খুলিতে আঘাত হেনে মারতে বাধ্য হলো ইম্বালি।
আবার জড়ো হলো ওরা, উপত্যকা থেকে বের হয়ে এলো; পথের মোড়ে পৌঁছানোর পর পুবে বাঁক নিয়ে পাহাড় ও কিতানগালে গ্যাপের পথ ধরল। রাতভর এগিয়ে চলল ওরা, পরদিন বেশ সকালে ওদের সামনের সমতলে প্রথম ধোয়ার মেঘ উড়তে দেখল। দুপুরের আগেই শরণার্থীদের একটা বিশাল সারির শেষ মাথায় যোগ দিল ওরা। পেছনে ছিল তিনাত, ওদের দেখেই দুলকি চালে পিছিয়ে এলো। ভালো জায়গাতেই দেখা হলো, কর্নেল ক্যাম্বিসেস! চিৎকার করে বলল সে। দেখতে পাচ্ছি মেয়েদের বাঁচাতে পেরেছ?
যারা বেঁচে ছিল, সায় দিয়ে বলল মেরেন। তবে অনেক ভোগান্তি গেছে ওদের। এখন বন্দি দশার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে।
ওদের জন্যে ওয়্যাগনে থাকার ব্যবস্থা করব আমরা, বলল তিনাত। কিন্তু তোমার ও তোমার দলের কী হবে? আমাদের সাথে জাররি থেকে বের হয়ে যাবে, নাকি প্রবীন ম্যাগাসের খোঁজে আবার ফিরে যাচ্ছ?
আমাদের জবাব আগেই জানো তুমি, কর্নেল তিনাত, মেরেন কিছু বলার আগেই জবাব দিল ফেন।
তাহলে তোমাদের বিদায় জানাতে হচ্ছে। তোমাদের সাহসের জন্যে ধন্যবাদ, আর আমাদের জন্যে তোমরা যা করেছ তার জন্যেও ধন্যবাদ। হয়তো আর কোনওদিনই আমাদের দেখা হবে না, তবে তোমাদের বন্ধুত্ব আমার পক্ষে অনেক সম্মানজনক ছিল।
কর্নেল তিনাত, স্যার, তুমি চিরন্তন আশাবাদী লোক, ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল ফেন। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, এত সহজে আমাদের হাত থেকে তোমার নিস্তার নেই। ওয়ার্লউইন্ডকে ঠেলে তার ঘোড়ার পাশে নিয়ে এলো ও। ওর দাড়িভরা গালে চুমু খেল। আবার যখন মিশরে আমাদের দেখা হবে তখন অন্য গালে চুমু খাব, বলল সে। তারপর ওয়ার্লউইন্ডকে ঘুরিয়ে নিল ও পেছনে তিনাতকে আমোদিত বিভ্রান্তি ফেলে এগিয়ে চলল। ওর দিকে চেয়ে রইল তিনাত।
*
এখন ছোট একটা দলে পরিণত হয়েছে ওরা। মাত্র তিনজন মেয়ে আর তিনজন নপুরুষ। একবারের জন্যে ছোটার বদলে ঘোড়া হাঁকানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নাকোন্তো ও ইম্বালি, দুজনই একটা করে বাড়তি ঘোড় নিয়ে এগোচ্ছে।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? পাশাপাশি চলার সময় মেরেনকে জিজ্ঞেস করল ফেন।
পাহাড়ের যতটা কাছে গেলে নিরাপদে থাকা যাবে, জবাব দিল মেরেন। তাইতা ফিরে এলে দ্রুত ওর সাথে যোগ দিতে হবে আমাদের। সিদুদুর দিকে ফিরল ও। ওর অন্য পাশে ঘোড়া হাঁকাচ্ছে সে। পাহাড়ের কাছে লুকোনোর মতো কোনও জায়গা চেনা আছে তোমার?
মাত্র এক মুহূর্ত ভাবল সে। হ্যাঁ, জবাব দিল তারপর। একটা উপত্যকা আছে যেখানে মৌসুমের সময় বাবার সাথে ব্যাঙের ছাতা কুড়োতে যেতাম। একটা গুহায় শিবির করতাম আমরা, খুব অল্প লোকই ওটার খবর রাখে।
অচিরেই পশ্চিম দিগন্তে মাথা তুলে দাঁড়াল তিনটা আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত চূড়া। মুতাঙ্গি গ্রামের পাশ দিয়ে এলা ওরা, নিচু টিলার উপর থেকে ভস্মীভূত ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকাল। এখানে একটা বুনো শুয়োর শিকার করল ওরা। ছাই আর পোড়া লাশের গন্ধ ভেসে আসছে। ঘুরে পশ্চিমে পাহাড়ের পথ ধরার সময় কেউই তেমন একটা কথা বলল না।
ওদের পাহাড়ের পাদদেশে লুকানো একটা উপত্যকায় নিয়ে এসেছে সিদুদু। গাছপালা ও জমির ভাজে এমনভাবে আড়াল করা ওটা যে ঠিকমতো না দেখা পর্যন্ত। চোখেই পড়ে না। ঘোড়ার জন্যে ভালো চারণভুমি রয়েছে এখানে, ঝর্না থেকে প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পানি মিলবে। গুহাটা শুকনো, উষ্ণ। একজোড়া পুরোনো ট্যাপ খাওয়া রান্নার হাঁড়ি ও অন্যান্য তৈষজপত্র পেছনের একটা ফাটলের ভেতর এক গাদা লাকড়ির সাথে রেখে গেছে সিদুদুর পরিবার। সন্ধ্যার খাবার রান্না করল মেয়েরা। আগুনের পাশে বসে খেল সবাই।
এখানে বেশ আরামেই থাকতে পারব, বলল ফেন, কিন্তু দুর্গ আর মেঘ বাগিচার রাস্তা থেকে কত দূরে আছি আমরা?
উত্তরে ছয় বা সাত লীগ, জবাব দিল সিদুদু।
ভালো! মুখে হরিণের মাংসের স্টু নিয়ে বলল মেরেন। চোখে না পড়ার মতো যথষ্ট দূরে আবার তাইতা ফিরে আসার সময় ওর সাথে যোগ দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট কাছে।
তুমি যদি ফিরে আসে না বলে ফিরে এলে বলায় খুশি হলাম, বলল ফেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা বজায় রইল। কেবল তামার বাটিতে চামচের আওয়াজ শোনা গেল।
ও কখন আসছে কীভাবে জানতে পারব? জিজ্ঞেস করল সিদুদু। রাস্তায় পাহারা দিতে হবে? ফেনের দিকে তাকাল সবাই।
তার দরকার হবে না, জবাব দিল ফেন। ও এলে আমি টের পাব। আমাকে আগেই জানাবে ও।
লাগাতার চলার উপর ছিল ওরা, ঘোড়র পিঠে থেকে লড়াই করে গেছে অনেকগুলো মাস। এর ভেতর রাতের পাহারা দেওয়ার পালায় বিরতি বাদে এটাই ছিল সারারাত ঘুমোনোর প্রথম সুযোগ। মাঝরাতের পাহারার দায়িত্ব নিল ফেন ও সিদুদু; তারপর যখন দক্ষিণ আকাশে তারকামণ্ডলীর বিশাল ক্রস দিগন্তে ডুব দিল, পাহারা দেওয়ার জন্যে সিদুদু ও নাকোন্তোকে ডেকে তুলতে আধা ঘুমে হামাগুড়ি দিয়ে গুহায় ঢুকল। তারপর মাদুরে লুটিয়ে পড়ল ওরা, হারিয়ে গেল অজানায়।
