মন্দিরের সকালের রুটিন কি? জিজ্ঞেস করল ফেন।
সূর্য ওঠার আগে পুরোহিতিনীরা দেবীর উপাসনা করতে মেয়েদের মন্দিরে নিয়ে যায়। এর পর নাশতার জন্যে খাবার ঘরে যায় ওরা।
তারমানে এখন ওদের মন্দিরে থাকার কথা? জানতে চাইল মেরেন।
তা তো নিশ্চিতই, নিশ্চিত করল সিদুদু।
আর ট্রগরা?।
নিশ্চিত করে বলতে পারব না, তবে আমার ধারণা ওরা মন্দির এলাকা ও গাছপালার ভেতর টহল দিচ্ছে।
পুরোহিতিনীদের কেউ কি মেয়েদের প্রতি সহানুভূতিশীল? ওদের ভেতর ভালো কেউ আছে?
কেউ না! তিক্ত কণ্ঠে বলল সিদুদু। সবাই নিষ্ঠুর, নির্দয়। আমাদের সাথে খাঁচায় বন্দি জানোয়ারের মতো আচরণ করে। ওখানে আসা লোকগুলোর কাছে নিজেদের তুলে দিতে বাধ্য করে। পুরোহিতিনীদের কেউ কেউ নিজেদের বিকৃত আনন্দ ভোগ করতে ব্যবহার করেছে আমাদের।
মেরেনের দিকে তাকাল ফেন। ওদের নিয়ে কী করা যায়?
কেউ আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেই মেরে ফেলব।
তলোয়ার বের করে নিবিড়ভাবে আগে বাড়ল ওরা, ওদের উপস্থিতি আড়াল করার কোনও চেষ্টাই করছে না। ঐগদের দেখা যাচ্ছে না কোথাও। ওদের সরাসরি মন্দিরে নিয়ে গেল সিদুদু। মূল ভবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। দ্রুত ওটার দিকে ছুট গেল ওরা, কাঠের দরজার সামনে লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল। লাফ দিয়ে নামল মেরেন, অর্গল খোলার প্রয়াস পেল, কিন্তু ভেতর থেকে আটকানো।
হাত মেলাও! সাথে আসা লোকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল ও। এক সারিতে দাঁড়াল ওরা। ওর পরের নির্দেশে বর্ম উঁচু করে ধরে দরজার উপর হামলে পড়ল। দড়াম করে খুলে গেল দরজা। মন্দিরের ঠিক মাঝখানে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে মেয়েরা। চারজন কালো জোব্বা পরা পুরোহিতিনী পাহারা দিচ্ছে ওদের। একজন বেশ লম্বা, মাঝ বয়সী মহিলা, বসন্তের দাগঅলা কঠিন চেহারা। হাতে ধরা সোনালি তালিসমান মেরেনের দিকে তাক করল সে।
সাবধান! চিৎকার করে উঠল সিদুদু। ওটা নোনগাই, সবচেয়ে ক্ষমতাশালী জাদুকর। জাদু দিয়ে তোমাকে শেষ করে ফেলতে পারবে।
আগেই ধনুকে তীর পড়িয়েছে ফেন। দ্বিধা করল না ও। একক নড়াচড়ায় তীর ছুঁড়ে দিল। মন্দিরের চক্রের দৈর্ঘ্য বরাবর গুঞ্জন তুলে ছুটে গেল ওটা, ঠিক বুকে গিয়ে বিধল নোনগাইয়ের হাত থেকে তালিসমানটা ছুটে পাথুরে মেঝেতে পড়ল। বাকি তিনজন পুরোহিতিনী কাকের ঝাঁকের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। আরও দুটো তীর ছুঁড়ল ফেন। শেষ একজন বাদে বাকি সবাইকে ফেলে দিল। বেদীর পেছনের ছোট দরজার কাছে চলে গেল মহিলা। পেঁচিয়ে দরজা খোলার সময় তার পিঠের মাঝখানে একটা তীর পাঠিয়ে দিল সিদুদু। পাথরের বুকে রক্তের একটা ধারা রেখে পিছলে লুটিয়ে পড়ল মহিলা। আর্তচিৎকার করে চলেছে বেশির ভাগ সেবাদাসী। অন্যরা মাথার উপর চিতন টেনে দিয়েছে, সন্ত্রস্ত দলের মতো জড়োসড়ো হয়ে যাচ্ছে।
ওদের সাথে কথা বলো, সিদুদু, নির্দেশ দিল মেরেন। শান্ত করো ওদের।
মেয়েদের কাছে দৌড়ে গেল সিদুদু, কয়েকজনকে টেনে দাঁড় করাল।
আমি সিদুদু। তোমাদের ভয়ের কোনও কারণ নেই। ওরা ভালো মানুষ, তোমাদের উদ্ধার করতে এসেছে। ওদের ভেতর জিঙগাকে দেখতে পেল ও।
আমাকে সাহায্য করো, জিঙগা! ওদের বুদ্ধি ফেরাতে সাহায্য করো!
ঘোড়র কাছে নিয়ে যাও ওদের, জিনে তুলে দাও, ফেনকে বলল মেরেন। যেকোনও মুহূর্তে ঐগদের দিক থেকে হামলা আসতে পারে।
দরজা পথে মেয়েদের টেনে নিয়ে চলল ওরা। কেউ কেউ এখনও কাঁদছে, বিলাপ করে চলেছে, জোর করে ওদের ঘোড়ার জিনে তুলে দিতে হলো। ওদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করল মেরেন, ফেনের উদ্দেশে চিৎকার করে ওঠায় একজনকে চড় কসাল ও। ওঠো, নির্বোধ মেয়েছেলে! নইলে ঐগদের হাতে রেখে যাব তোমাকে।
অবশেষে ঘোড়ার পিঠে উঠল সবাই। চিৎকার করে উঠল মেরেন। দুলকি চালে আগে বাড়ো! উইন্ডস্মোকের পাশে পায়ের গোড়ালির খোঁচা দিল। ওর পেছনে রয়েছে দুটি মেয়ে, ওকে আর পরস্পরকে আঁকড়ে ধরেছে। ফেনের রেকাবের সাথে ঝুলে আছে নাকোন্তো ও ইম্বালি। ওদের সাথে নিয়ে চলেছে ও। ওদের পেছনে সিদুদু ও জিঙগা, সামনে বসেছে একটা মেয়ে। বাকি ঘোড়াগুলো কমপক্ষে তিনজন করে মেয়ে বইছে। বিশাল ভার নিয়ে খুব কাছাকাছি থেকে মন্দিরের আঙিনা দিয়ে দ্রুত পায়ে ছুটছে ওগুলো পাহাড় ও কিতানগালেমুখী রাস্তার দিকে।
বনের ভেতরের পথে উঠতেই দেখা গেল ওদের অপেক্ষা করছে ট্রগগুলো। পাঁচটা বিশাল শিম্পাঞ্জি গাছে উঠে পড়েছিল, ঘোড়াগুলো নিচ দিয়ে যাবার সময় ওগুলোর উপর লাফ দিয়ে পড়তে লাগল। একই সময়ে অন্য শিম্পাঞ্জিগুলো আগাছার আড়াল থেকে মুখ খিঁচিয়ে সগর্জনে ছুটে এলো। ঘোড়সওয়ারদের লক্ষ্য করে লাফ দিল, কিংবা শক্তিশালী চোয়ালে কামড়ে ধরল ঘোড়ার পা।
একটা খাট বর্শা ছিল নাকোন্তোর ডান হাতে, দ্রুত হাত চালিয়ে তিনটা জানোয়ারকে মেরে ফেলল সে। বাতাসে সই সই শব্দ তুলল ইম্বালির কুড়োল, আরও দুটোকে নামিয়ে দিল সে। মেরেন ও হিলতো তলোয়ার দিয়ে কুপিয়ে চলল, ঘাই মারল, ওদের পেছনে অনুসরণ করে আসতে থাকা সৈনিকরা ঘোড়ার পেটে স্পার দাবাতে লাগল যুদ্ধে যোগ দিতে। কিন্তু ট্রগের দল ভীতিহীন, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ; ভয়ঙ্কর চেহারা পেল লড়াইটা। এমনকি মারাত্মকভাবে আহত বা মরণোন্মুখ হলেও জোর করে উঠে দাঁড়াচ্ছে শিম্পাঞ্জিগুলো, যোগ দিচ্ছে যুদ্ধে। উইন্ডম্মেকের ঘাড়ের উপর উঠে ওটার পেছনের পায়ে কামড় বসানোর চেষ্টা করল দুটো ট্রগ। ঝেড়ে দুটো লাথি কষাল ধূসর মেয়ারটা। প্রথম লাথির আঘাতে একটার খুলি ভেঙে গেল, দ্বিতীয় লাথিটা লাগল অন্যটার চোয়ালের নিচে, পরিষ্কার ভেঙে দিল ওটার ঘাড়।
