তিনটা প্রধান খনি পড়েছে পাহাড়সারির দক্ষিণ-পুব পাদদেশে। সবচেয়ে বড়টার স্টোপে কঠিন পরিশ্রম করছে হাজার হাজার দাস আর বন্দি, মূল্যবান রূপা। তুলে আনছে। প্রহরীদের অধিনায়ক তিনাতের লোক; তিনাত ও মেরেনকে শ্রমিকদের পোশাক পরিয়ে দাসদের ব্যারাকুন ও বন্দি শিবিরে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিল সে। নিজেদের গোপন সেলে সংগঠিত করেছে বন্দিরা, নেতা স্থির করে রেখেছে। অনেক আগে থেকেই বেশির ভাগ নেতাকে চেনে তিনাত, গ্রেপ্তার ও বন্দি হওয়ার বেশ আগে থেকেই ওরা ওর বন্ধু, সতীর্থ। খুশি হয়েই ওর নির্দেশ শুনল।
নবান্নের চাঁদের অপেক্ষা করো, ওদের বলল সে। পাহারাদাররা আমাদের সাথে আছে। নির্দিষ্ট সময়ে তোমাদের মুক্ত করে দিতে গেট খুলে দেবে ওরা।
অন্য খনিগুলো ছোট। একটায় তামা ও তামাকে ব্রোঞ্জে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সঙ্কর ধাতু জিঙ্ক উৎপাদিত হয়। সবচেয়ে ছোটটাই বেশি সমৃদ্ধ। শ্রমিকরা এখানে পুরু সোনার কোয়ার্ট তুলে আনে, এত সমৃদ্ধ যে খাঁটি সোনার টুকরো শ্রমিকদের বাতির আলোয় চিকচিক করতে থাকে।
স্মেল্টারে পনের ওয়্যাগন ভর্তি খাঁটি সোনা আছে আমাদের, তিনাতকে জানাল প্রধান প্রকৌশলী।
বাদ দাও! কাটা কণ্ঠে নির্দেশ দিল মেরেন।
মাথা দোলাল তিনাত। হ্যাঁ! সোনা ফেলে যাও!
কিন্তু এত বেশি সম্পদ! প্রতিবাদ করল প্রকৌশলী।
স্বাধীনতা আরও বড় সম্পদ, বলল মেরেন। সোনা ফেলে যাও। ওসব আমাদের ধীর করে দেবে। ওয়্যাগনের আরও ভালো ব্যবহার বের করতে পারব আমরা। ওগুলো নারী, শিশু ও যারা খুব দুর্বল বা অসুস্থ বা হাঁটতে পারে না তাদের বহন করবে।
*
নবান্নের চাঁদের বিশ দিন বাকি থাকতেই আক্রমণ হানল অলিগার্করা। পরিকল্পিত যাত্রার কথা অনেকেই জেনে গিয়েছিল, ফলে গোটা জাররিতে উজ্জ্বল একটা আগুন জ্বলছিল। গোয়েন্দারা ধোয়ার গন্ধ পাবে এটাই স্বাভাবিক। অলিগার্করা দুই শো লোকসহ ক্যাপ্টেন ওনকাকে মুতাজিতে পাঠিয়েছে, এখন থেকেই গুজবের ডালপালা গজিয়েছে।
এক রাতে শহর ঘেরাও করে সব বাসিন্দাকে আটক করল ওরা। গ্রাম্য পরিষদের কুঁড়েয় একজন একজন করে ওদের জেরা করল ওনকা। চাবুক ও জ্বলন্ত লোহা ব্যবহার করল সে। জেরার সময় আটজন পুরুষ নিহত ও আরও অনেকে অন্ধ হয়ে গেলেও তেমন কিছু জানতে পারল না। এবার মেয়েদের উপর চড়াও হলো সে। বিলতোর কনিষ্ঠা স্ত্রীর ছিল যমজ সন্তান। চার বছর বয়সী একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। সে ওনকার প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার গেলে তার ছেলেকে দ্বিখণ্ডিত করার সময় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে বাধ্য করল তাকে। তারপর ছেলেটার দ্বিখণ্ডিত দেহ ছুঁড়ে দিল তার পায়ের কাছে। তারপর বোনের মাথার কোঁকড়া চুলের ঝুঁটি ধরে তুলে নিল। মায়ের চোখের সামনে তাকে ঝোলাতে লাগল। চিৎকার করছিল মেয়েটা। তুমি জানো তোমার একটা বাচ্চাকে দিয়েই শেষ করব না আমি, মহিলাকে বলল সে। মেয়েটার গলায় ড্যাগারের ডগা দিয়ে খোঁচা মারল। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল সে। ভেঙে পড়ল বেচারা মা। যা জানা ছিল সবই ওনকাকে বলে দিল। অনেক কিছুই জানা হয়ে গেল ওনকার।
বিলতো, তার স্ত্রী আর বেঁচে যাওয়া মেয়েসহ গ্রামবাসীদের ছাউনী দেওয়া গ্রাম্য পরিষদের কুঁড়েয় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল ওনকা। দরজা জানালা আটকে আগুন ধরিয়ে দিল ছাউনীতে। জ্বলন্ত ভবন থেকে আর্তচিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসার সময় অলিগার্কদের খবর দিতে ঘোড়ায় চেপে আগুনের মতো দুর্গের দিকে রওয়ানা হয়ে গেল ওনকা।
গ্রামবাসীদের দুজন পাহাড়ে শিকারে গিয়েছিল। ওখান থেকে হত্যালীলা প্রত্যক্ষ করল ওরা, ওদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার খবর তিনাত ও মেরেনকে দিতে চলল। প্রায় বিশ লীগ দূরে দলটা যেখানে আত্মগোপন করেছিল সেদিকে ছুটে গেল ওরা।
লোক দুজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল তিনাত, দ্বিধা করল না সে। আমাদের পক্ষে আর নবান্নের চাঁদের অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এখুনি রওয়ানা দিতে হবে।
তাইতা! চিৎকার করে উঠল ফেন, যন্ত্রণার সাথে। ওর জন্যে অপেক্ষা করবে বলে কথা দিয়েছিলে তুমি।
তুমি জানো, আমি পারব না, জবাব দিল তিনাত। এমনকি কর্নেল ক্যাম্বিসেসকেও একমত হতে হবে যে সেটা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
অনীহার সাথে মাথা দোলাল মেরেন। কর্নেল তিনাত ঠিক বলেছে। ওর পক্ষে অপেক্ষা করা সম্ভব না। লোকজন নিয়ে সটকে পড়তে হবে ওকে। খোদ তাইতাই এমনটা চাইতেন।
তোমাদের সাথে যাব না আমি, বলে উঠল ফেন। তাইতা না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করব।
আমিও থাকব, বলল মেরেন। কিন্তু বাকি সবাইকে এখুনি চলে যেতে হবে।
ফেনের হাতের দিকে হাত বাড়াল সিদুদু। তুমি আর মেরেন আমার বন্ধু। আমিও যাব না।
তুমি সাহসী মেয়ে, বলল তিনাত। কিন্তু তুমি আবার ভালোবাসার মন্দিরে গিয়ে মেয়েদের নিয়ে আসতে পারবে?
অবশ্যই! জোরে বলে উঠল ফেন।
তোমার সাথে কয়জন পুরুষ দিতে হবে? তিনাত জিজ্ঞেস করল।
দশজন হলেই চলবে, ওকে বলল মেরেন। মন্দিরের মেয়েদের জন্যে কয়েকটা ঘোড়াও লাগবে আমাদের। ওদের কিতানগালে যাবার পথে প্রথম খেয়া ঘাটে তোমাদের হাতে তুলে দেব। তারপর তাইতার জন্যে অপেক্ষা করতে আবার ফিরে আসব।
*
প্রায় রাতভর চলল ওরা। ফেন ও সিদুদু রয়েছে সামনে, কিন্তু উইন্ডস্পোকের পিঠে মেরেন পেছন থেকে অনুসরণ করছে। ভোরের প্রথম আলোয়, সূর্যোদয়ের আগে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে এলো ওরা, ভালোবাসার মন্দিরের দিকে তাকাল। নিচের উপত্যকতায় দাঁড়িয়ে আছে ওটা।
