বনের ভেতর দিয়ে ফিরতি পথ ধরল ফেন ও সিদুদু। পাহাড়ের অর্ধেকটা দূরত্ব ওঠার পর পথ ছেড়ে অটল দাঁড়িয়ে রইল ফেন। কথা বলার সাহস হলো না ওর, তবে সিদুদুর হাতে চাপ দিয়ে জাদু অটুট রাখার ইশারা করল। দম ফেলতে ভুলে গেছে ওরা, দুটো বিশাল কালো ঐগকে গদাইলস্করি চালে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখল। গাছপালার চারপাশে ঝোপে তল্লাশি চালানোর সময় এপাশ ওপাশ মাথা দোলাচ্ছে ওরা, ঘন ভুরুর নিচে দ্রুত ঘুরে বেড়াচ্ছে ওদের চোখ। মদ্দাটা জোড়ার ভেতর বড় আকারের। মাদিটা তাকে অনুসরণ করছে, দেখে অনেক বেশি সতর্ক ও আগ্রাসী মনে হচ্ছে। মেয়েদের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল ওগুলো, মুহূর্তের জন্যে মনে হলো পাশ কাটিয়ে চলে যাবে, কিন্তু হঠাৎ থমকে দাঁড়াল মাদীটা। বাতাসে নাক ফুলিয়ে গন্ধ শুঁকতে লাগল। মদ্দাটাও অনুসরণ করল ওটাকে, সশব্দে বাতাসে গন্ধ শুঁকতে লাগল। এবার দুটোই বেশ আগ্রহের সাথে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে লাগল। ভীষণ দর্শন দাঁতের পাটি বের করতে মুখ হাঁ করল মদ্দাটা। পরক্ষণে সপাটে বন্ধ করল। ওরা এত কাছে যে নিঃশ্বাসের বদগন্ধ পাচ্ছে ফেন। ওর হাতে ধরা সিদুদুর হাতটা কাঁপছে থরথর করে। ওকে সাহস যোগাতে ফের আঙুলে চাপ দিল ও।
মেয়েরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঐগ দুটো সাবধানে লফিয়ে লাফিয়ে সেদিকে আসতে লাগল। এখনও বাতাসে গন্ধ শুঁকছে। মাথা নিচু করে মেয়েরা পথে এসেছে সেখানকার মাটির গন্ধ শুঁকছে মাদীটা। গন্ধ শুঁকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল ওদের দিকে। ত্রাসে থরথর কাঁপছে সিদুদু। নিজের মাঝে আতঙ্ক ক্রমে বেড়ে ওটা টের পাচ্ছে ফেন, একটা সময় সেটা টগবগিয়ে ফুটতে শুরু করবে। গভীর মনোযোগের সাথে দীক্ষার কথা ভেবে নিজেকে স্থির করতে মনস্তাত্ত্বিক শক্তির তরঙ্গ পাঠাতে লাগল। কিন্তু এতক্ষণে ঐগের নাকের ডগা সিদুদুর স্যান্ডেলের আঙুলের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে চলে এসেছে। ভয়ে পেশাব করে দিল সিদুদু। পা বেয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল তরল; গন্ধ পেয়ে ঘোঁৎ করে উঠল ঐগটা। লাফ দিবেতৈরি হলো শিম্পাঞ্জিটা, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা অ্যান্টিলোপ পালানোর সময় গাছের পাতা কাঁপিয়ে দিল। অমনি ভীষণ জোরে গর্জন করে উঠল মদ্দা ট্রগটা। দৌড়ে গেল ওটার পেছনে। মাদীটাও ছুটল ওটার পেছনে। সিদুদুর খুব কাছে দিয়ে গা ঘেঁষে গেল, ধরতে গেলে আরেকটু হলেই ছোঁয়া লেগে যেত। আগাছার ভেতর দিয়ে শিম্পাঞ্জিগুলো ছুটে যাবার সময় ফেনের উপর হেলে পড়ল সিদুদু। ফেন জড়িয়ে না ধরলে হয়তো পড়েই যেত। শক্ত করে ধরে পাহাড় চূড়ার দিকে টেনে নিয়ে চলল ওকে ফেন, মন্দির থেকে দূরে সরে যাবার আগেই যাতে আড়ালের মন্ত্র নষ্ট না হয়। সেজন্যে সতর্ক। অবশেষে মেরেন ও নাকোন্তো যেখানে ওদের জন্যে ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষায় ছিল সেদিকে ছুটে গেল ওরা।
*
পর পর দুই রাত একই তাঁবুতে ঘুমায়নি ওরা। বনের সমস্ত গলিখুঁজি হাতের তালুর মতো চেনে তিনাত ও সিদুদু, তাই দ্রুত ও গোপনে আগে বাড়তে পারছে ওরা, লোক চলাচলের পথ এড়িয়ে যাচ্ছে, পর পর দুটো শিবিরের মাঝখানে অনেক বেশি দূরত্ব তৈরি করছে। সবাইই নবাগত, বেশির ভাগ গ্রামবাসীই ওদের অনুগত। পলাতকদের জন্যে খাবার ও নিরাপদ অবস্থানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।
গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে চলল ওরা: স্থানীয় সহমতের ম্যাজিস্ট্রেট ও গ্রাম্য সর্দারদের সাথে আলোচনা করছে। জাররিয় টহলদারদের উপর নজর রাখছে, ওদের আসতে দেখলেই সতর্ক করে দিচ্ছে।
প্রত্যেকটা গ্রামে যুদ্ধ-সভার আয়োজন করছে মেরেন ও তিনাত।
আমাদের প্রিয় মিশরে ফিরে যাচ্ছি আমরা! ম্যাজিস্ট্রেট ও সর্দারদের বলে ওরা। নবান্নের চাদে তোমাদের লোকজনকে আমাদের সাথে যেতে তৈরি করে রাখ।
আগুনের আলোয় বৃত্তের লোকদের চেহারার দিকে তাকিয়ে আনন্দ ও উত্তেজনার চিহ্ন দেখতে পায় তিনাত। ওদের সামনে মেলে ধরা মানচিত্র ব্যাখ্যা করে সে। তোমাদের এই পথ ধরেই যেতে হবে। তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে পুরুষদের সশস্ত্র করে তোল। পুরুষদের অবশ্যই তাদের পরিবারের জন্যে খাবার, গরম পোশাক ও কম্বল যোগাড় করতে হবে। তবে বহন করা যায় এমন সবকিছুই নিয়ো না। দীর্ঘ, কষ্টকর যাত্রা হবে এটা। তোমাদের প্রথম সমবেত হওয়ার জায়গা এটা। মানচিত্রের উপর একটা জায়গার দিকে ইঙ্গিত করল সে। দ্রুত ওখানে চলে যাবে। তোমাদের অপেক্ষায় স্কাউটরা থাকবে ওখানে। পুরুষদের জন্যে আরও ওয়্যাগন থাকবে ওদের কাছে, পথ দেখিয়ে কিতানগালে গ্যাপে নিয়ে যাবে তোমাদের। এটাই আমাদের সব লোকজনের মিলন স্থল হবে। গোপনীয়তা বজায় রাখবে, পরিণতির কথা মাথায় রাখবে। কেবল যাদের ব্যাপারে বিশ্বাস করা যায় তাদেরই আমাদের পরিকল্পনার কথা জানাবে। তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তোমরা জানো অলিগার্কদের গুপ্তচর সব জায়গায় আছে। সময় হওয়ার আগে কোনওমতেই রওয়ানা হবে না। যদি না কর্নেল ক্যাম্বিসেস বা আমার কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পাও। সূর্য ওঠার আগেই আবার পথে নামে ওরা। আশপাশের এলাকার সেনা ছাউনী ও সামরিক দুর্গের অধিনায়করা বলতে গেলে সন্দেহাতীতভাবে তিনাতের পক্ষের লোক। ওরা তার নির্দেশ শুনল। কিছু পরামর্শ দিল, প্রশ্ন করল আরও কম। আমাদের রওয়ানা দেওয়ার বার্তা পাঠিও। আমরা তৈরি থাকব, ওকে বলল তারা।
