বনের ভেতর দিয়ে উপর দিকে উঠতে লাগল ওরা, অবশেষে একটা উঁচু জমিনের চূড়ায় পৌঁছাল; এখান থেকে নিচের উপত্যকায় নজর চালানো যায়। শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটা। হলদে স্যান্ডস্টোনের বিশাল, আঁকাল দালান, চারপাশে আঙিনা ও পুকুর, সেখানে দানবীয় শাপলার পাতা ভাসছে। ক্ষীণ ফুর্তির আওয়াজ আসছে, সবচেয়ে বড় পুকুরটার ধারে মেয়েদের বেশ বড়সড় জটলা দেখল ওরা। কেউ কেউ গোল হয়ে বসে গান গাইছে, হাত তালি দিচ্ছে; অন্যদিকে বাকিরা বাজনার সাথে তাল মিলিয়ে নাচছে।
এই সময় রোজই এমন করতাম আমরা, ফিসফিস করে বলল সিদুদু। ওরা পুরুষদের অপেক্ষা করছে।
কাউকে চিনতে পারছ? জানতে চাইল ফেন।
বুঝতে পারছি না। আমরা অনেক দূরে তো, বলা মুশকিল, হাত দিয়ে চোখ আড়াল করল সিদুদু। দাঁড়াও! পুকুর ধারের একাকী মেয়েটা দেখতে পাচ্ছ? ওই আমার বন্ধু জিঙগা।
ছিপছিপে গড়নের প্রফুল্ল মেয়েটাকে দেখতে পেল ফেন, পুকুরের কিনারা বরাবর হাঁটাহাঁটি করছে। খাট চিতন পরেছে সে। হাত-পা নগ্ন, চুলে হলদে ফুল। ওকে কতটা বিশ্বাস করা যায়? জানতে চাইল ফেন।
অন্যদের চেয়ে বয়সে একটু বড় ও, ওদের ভেতর সবেচেয়ে বোদ্ধা। ওরা ওর কথা মানে।
ওর সাথে কথা বলতে যাব আমরা, বলল ফেন, কিন্তু ওর হাত চেপে ধরল সিদুদু।
দেখ! বলল ও, গলা কাঁপছে। ওরা যে রিজের চূড়ায় বসে আছে ঠিক তার নিচেই গাছ থেকে নেমে আসছে রোমশ কালো অবয়ব। বেঢপ ভঙ্গিতে শ্লথ পায়ে চার হাতপায়ে ভর দিয়ে আগে বাড়ছে ওরা, হাত দিয়ে মাটি কামড়ে ধরছে। ট্রগ!
মন্দিরের এলাকার সীমানা ঘিরে চক্কর দিচ্ছে দানবীয় শিম্পাঞ্জিগুলো, তবে প্রাঙ্গণের মেয়েদের চোখের আড়ালে থাকছে। কয়েক কদম পর পর নাক ফুলিয়ে জমিন শুঁকছে, আগন্তুক বা মন্দির থেকে পলাতকদের খোঁজ করছে।
তুমি গন্ধ আড়াল করতে পারবে? জিজ্ঞেস করল সিদুদু। ট্রিগদের ঘ্রাণ শক্তি কিন্তু খুব চড়া।
না, স্বীকার গেল ফেন। মেয়েদের দিকে এগোনোর আগে ওদের পাশ কাটিয়ে যেতে দিতে হবে। দ্রুত আগে বাড়ছে ট্রগরা। গাছপালার আড়ালে হারিয়ে গেল ওরা।
এগোও! বলল ফেন। জলদি! সিদুদুর হাতের দিকে হাত বাড়াল ও। মনে রেখ, কথা বলা যাবে না, দৌড়াবে না বা আমার হাত ছাড়বে না। সাবধানে, ধীরে ধীরে আগে বাড়বে।
নিজেদের উপর মন্ত্র পড়ল ফেন। তারপর সিদুদুকে নিয়ে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল। সিদুদুর বন্ধু জিঙগা এখনও একা একটা উইলো গাছের নিচে বসে ধুরা পিঠার টুকরো ছুঁড়ে ফেলছে পানির মাছের ঝাঁকের দিকে। ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসল ওরা, তারপর আস্তে সিদুদুর ওপর থেকে আড়াল করার মন্ত্র তুলে নিল ফেন। অচেনা চেহারা দেখে জিঙগা যাতে চমকে না ওঠে তাই নিজে আড়ালে রয়ে গেল। কিলবিল করতে থাকা মাছের দিকে গভীর মনোযোগের সাথে তাকিয়ে ছিল মেয়েটা, মুহূর্তের জন্যে সিদুদুর উপস্থিতি টেরই পেল না ও। সহসা চমকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গেল।
হাত ধরে ওকে ঠেকাল সিদুদু। জিঙগা, ভয় পেয়ো না।
ওর দিকে চেয়ে রইল মেয়েটা, তারপর হাসল। তোমাকে দেখতে পাইনি, সিদুদু। ছিলে কোথায়? তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। আরও সুন্দর হয়ে গেছ তুমি।
তুমিও, জিঙগা, ওকে চুমু খেয়ে বলল সিদুদু। কিন্তু কথা বলার মতো বেশি সময় নেই হাতে। অনেক কথা বলতে হবে। মেয়েটার চেহারা জরিপ করল ও, সভয়ে লক্ষ করল ওর চোখের তারা আরকের কারণে বিস্ফারিত হয়ে আছে। খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনতে হবে তোমাকে। ধীরে ধীরে কথা বলছে সিদুদু, যেন একেবারে কচি খুকীর সাথে কথা বলছে।
সিদুদুর কথার ব্যাপকতা বুঝতে পেরে জিঙগার চোখজোড়া আরও পরিষ্কারভাবে স্থির হলো। শেষে ফিসফিস করে বলল, ওরা আমাদের বোনদের খুন করছে। এ হতে পারে না।
কিন্তু তাই ঠিক, জিঙগা, আমার কথা তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। তবে ব্যাপারটা ঠেকানোর জন্যে একটা কাজ করতে পারো। চট করে গুল্ম আর সেটা দিয়ে ওষুধ বানানোর কায়দা শিখিয়ে দিল ও। যাদের বাচ্চা আছে শুধু তাদেরই পাহাড়ে নিয়ে যায় ওরা। এই ওষুধ আমার বাচ্চা নষ্ট করে দিয়েছে। বিপদাপন্ন যেকোনও মেয়েকেই এটা দিতে হবে তোমাকে। স্কার্ট উঁচু করে কোমরে বাঁধা গুল্মের ব্যাগ আলগা করল সিদুদু। ভালো করে লুকিয়ে রাখ। পুরোহিতিনীরা যেন দেখতে না পায়। ডাক্তার হান্নাহ কোনও মেয়েকে দেবীর কাছে সম্মানের জন্যে নিয়ে যেতে বাছাই করামাত্র এই আরক খেতে দেবে। কেবল এটাই ওদের বাঁচাতে পারে।
আমাকে এরই মধ্যে বেছে নেওয়া হয়েছে, ফিসফিস করে বলল জিঙগা। চারদিন আগে এসেছিল ডাক্তার, বলেছে শিগগিরই দেবীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি আমি।
আহা, বেচারা জিঙগা! তাহলে আজ রাতেই এটা খেতে হবে তোমাকে, একা হলেই। বলল সিদুদু। আবার ওর হাত জড়িয়ে ধরল ও। তোমার সাথে আর বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না, তবে শিগগিরই তোমাকে উদ্ধার করতে একদল ভালো মানুষ নিয়ে ফিরে আসব। তোমাকে ও অন্যদের নতুন এক দেশে নিয়ে যাব আমরা, যেখানে নিরাপদে থাকব আমরা। ওদের বিদায় নিতে তৈরি থাকতে বলে দিয়ো। জিঙগার হাত ছেড়ে দিল ও। গুল্ম ভালো করে লুকিয়ে রাখ। এবার যাও। পেছনে তাকিয়ো না।
জিঙগা ওর দিকে পেছন ফেরামাত্র সিদুদুর উপর আড়ালের আলখেল্লাহ ছড়িয়ে দিল ফেন। বিশ কদম যাওয়ার আগেই আবার পেছনে তাকাল জিঙগা। সিদুদু অদৃশ্য হয়ে গেছে দেখে ওর চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। স্পষ্ট প্রয়াসে নিজেকে সামলে নিয়ে আঙিনা পেরিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল সে।
