ধন্যবাদ, কর্নেল। তোমার সাহস আর বুদ্ধি আছে। ওর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল ফেন। বিব্রত ভঙ্গিতে আগুনের শিখার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করতে লাগল তিনাত। নির্বিকারভাবে কথা বলে চলল ফেন। ভালোবাসার মন্দিরের মেয়েদের কথা জানো, কর্নেল?
অবশ্যই মন্দিরের সেবাদাসীদের থাকার কথা জানি আমি, কিন্তু কি হয়েছে তাতে?
সিদুদুর দিকে ফিরল ফেন। আমাদের যা বলেছ ওকেও বলো।
ক্রমে বেড়ে ওঠা আতঙ্কের সাথে সিদুদুর বিবরণ শুনে গেল তিনাত। ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই চেহারা ফাঁকা হয়ে গেল তার। আমাদের অল্প বয়সী মেয়েদের উপর এমন জঘন্য অত্যাচারের কোনও ধারণাই ছিল না। অবশ্যই, এটা জানতাম যে মেয়েদের কাউকে কাউকে মেঘ-বাগিচায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে আমি নিজে নিয়ে গেছি। তবে ওরা স্বেচ্ছায় গিয়েছে। ওদের দেবীর কাছে বিসর্জন দেওয়ার বা পাহাড়ে মানুষখেকো আচারের কথা জানা ছিল না।
কর্নেল, ওদের আমাদের সাথে নিয়ে যেতে হবে। ওদের জাররিয়দের হাতে ফেলে যেতে পারব না, বাধা দিয়ে বলল মেরেন। ওদের মুক্ত করে জাররি থেকে যাবার সময় সাধ্যে যতটুকু কুলোয় তার সবটুকুই করার শপথ আগেই নিয়েছি আমি।
এখন আমিও একই শপথ করছি, গর্জে উঠল তিনাত। সব দেবতার নামে কসম খেয়ে বলছি, ওই মেয়েদের মুক্ত না করা পর্যন্ত এখান থেকে একপাও নড়ব না।
আমাদেরকে নবান্নের চাঁদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হলে তার আগ পর্যন্ত আর কয়জন মেয়েকে পাহাড়ে পাঠানো হতে পারে? জানতে চাইল ফেন।
ওর প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল ওরা।
আমরা বেশি আগে কাজে নামলে ওদের চমকে দেওয়ার সুযোগ হারাব। সাথে সাথে আমাদের বিরুদ্ধে ওদের শক্তি লেলিয়ে দেবে জাররিয়রা। তোমার কি প্রস্তাব, ফেন? তিনাতই কথা বলল।
কেবল পেটে বাচ্চা আছে এমন মেয়েদেরই পাহাড়ে পাঠানো হয়, জানাল ফেন।
আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কথাটা ঠিক, সায় দিল তিনাত। কিন্তু তাতে আমাদের কী উপকার হবে? অসংখ্য লোকের খেলার সামগ্রীর মতো ব্যবহার করা হলে আমরা তো আর ওদের অন্তসত্তা হওয়া ঠেকাতে পারব না।
তা হয়তো পারব না, তবে বাচ্চার বৃদ্ধি তো ঠেকাতে পারি।
কীভাবে? জানতে চাইল মেরেন।
সিদুদুর বেলায় তাই যেভাবে করেছে, গর্ভপাতের একটা আরক আছে। ফেনের কথাগুলো ভাবল ওরা। তারপর আবার কথা বলল মেরেন।
তাইতার ডাক্তারি ব্যাগটা রয়েছে মুতাঙ্গির বাড়িতে। ওটা আনতে ফিরে যেতে পারব না আমরা।
আরকটা বানাতে ও কী গুল্ম ব্যবহার করেছে, জানি আমি। ওকে ওগুলো সংগ্রহ করতে সাহায্য করেছিলাম।
ওষুধটা মেয়েদের কাছে পৌঁছাবে কীকরে? জানতে চাইল তিনাত। ঐগরা ওদের পাহারা দিয়ে রাখে।
আমি ও সিদুদু মন্দিরে নিয়ে যাব ওষুধটা, ব্যবহারের নিয়ম শিখিয়ে দেব মেয়েদের।
কিন্তু ট্রগ আর পুরোহিতিনীরা-ওদের এড়াবে কেমন করে?
সিদুদুকে যেভাবে ওনকার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম, জবাব দিল ফেন।
আড়াল করার মন্ত্র! বলে উঠল মেরেন।
বুঝতে পারছি না, বলল তিনাত। কীসের কথা বলছ?
ফেন ম্যাগাসের শিষ্যা, বুঝিয়ে বলল মেরেন। ওকে বেশ কিছু গোপন বিদ্যা শিখিয়েছেন তিনি। এইসব কায়দা বেশ ভালোই রপ্ত করেছে ও। নিজেকে ও অন্যদের অদৃশ্য পর্দায় আড়াল করতে পারে।
এটা সম্ভব, বিশ্বাস করি না, ঘোষণা করল তিনাত।
তাহলে তোমাকে দেখাচ্ছি, বলল ফেন। দয়া করে মেরেন আবার না ডাকা পর্যন্ত আগুনের কাছ থেকে সরে ওই গাছপালার ঝোঁপের আড়ালে অপেক্ষা করো। ভুরু কুঁচকে, বিড়বিড় করতে করতে উঠে দাঁড়াল তিনাত, অন্ধকারে গটগট করে চলে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফের ওকে ডাকল মেরেন। ফিরে এসে ওকে একা আবিষ্কার করল তিনাত।
বেশ ভালো, কর্নেল মেরেন ক্যাম্বিসেস। ওরা কোথায়? গজগজ করে জিজ্ঞেস করল তিনাত।
তোমার দশ কদমের ভেতর, বলল মেরেন। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে করতে আগুনের চারপাশে একটা চক্কর দিল তিনাত, ডান বামে তাকাচ্ছে। শেষে যেখানে শুরু করেছিল সেখানেই ফিরে এলো।
কিছু নেই, বলল সে। এবার বলো ওরা কোথায় গাঢাকা দিয়েছে।
ঠিক তোমার সামনে, ইঙ্গিতে দেখাল মেরেন।
সামনে তাকাল তিনাত, তারপর মাথা নাড়ল। কিছুই দেখছি না, শুরু করল সে। তারপর পিছিয়ে গিয়ে বিস্ময়ের একটা ধ্বনি করে উঠল। হায়, অসিরিস আর হোরাস, এযে ডাকিনী বিদ্যা! শেষবার যেখানে দেখেছিল সেখানেই বসে আছে মেয়ে দুটি। হাতে হাত ধরে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
হ্যাঁ, কর্নেল, তবে এটা সামান্য একটা ব্যাপার। তোমার চেয়ে অনেক সহজে ট্রগদের ফাঁকি দেওয়া যাবে, বলল ফেন। কারণ ওরা সীমিত বুদ্ধির বর্বর, যেখানে তুমি প্রশিক্ষিত যোদ্ধা ও খুবই উন্নত বুদ্ধির। প্রশংসায় শিথিল হলো তিনাত।
মেয়েটা সত্যিই ডাইনী। তিনাত তার সাথে পেরে উঠবে না। মনে মনে হাসল মেরেন। চাইলে ওকে মাথার উপর উল্টো করে দাঁড় করিয়ে ওর পাছায় শিসও বাজাতে পারবে ও।
*
ঘোড়ায় চেপে পাশাপাশি ভালোবাসার মন্দিরের দিকে যেতে পারল না ওরা। ৰোতাইতার মতো ঘোড়া ও মানুষের বিশাল দল আড়াল করার ক্ষমতা ফেনের নেই। ঘোড়াগুলোকে নিবিড় গাছপালার একটা জটলায় মেরেন ও নাকোন্তোর হাওলায় লুকিয়ে রেখে একাকী পায়ে হেঁটে আগে বাড়ল দুজন। চারটে ছোট ছোট গুল্ম ভর্তি লিনেনের ব্যাগ বইছে সিদুদু, ওর স্কার্টের নিচে কোমরে বাঁধা আছে ওগুলো।
