তার মানে? জিজ্ঞেস করল মেরেন।
এর একটাই মানে হতে পারে, বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল তিনাত। আমরা সন্দেহের আওতায় পড়ে গেছি। মনে ওনকা আমাকে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জাররিয় বিচারে আমি অবশ্য তাই। তুমি সিদুদুকে উদ্ধার করার সময় নিহত ট্ৰগদের লাশ খুঁজে পেয়েছে সে, ব্যাপারটা তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছে, কারণ এখন সে নিশ্চিত যে তুমিই ওকে লুকিয়ে রেখেছ।
কী প্রমাণ আছে তার কাছে?
প্রমাণ লাগে না তার। লর্ড আকেরের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। আমাদের সবাইকে শাস্তি দিতে তার মুখের কথাই যথেষ্ট। জবাব দিল তিনাত। অলিগার্কদের বিচার কী হবে সেটা নিশ্চিত। অত্যাচার চালিয়ে জেরা করা হবে আমাদের। সেটা থেকে বাঁচতে পারলে, খনি বা কুয়েরিতে পাঠানো হবে আমাদের…কিংবা আরও খারাপ।
তাহলে এখন আমরা সবাই ফেরারী, মেরেনকে তাতে উদ্বিগ্ন মনে হলো না। অন্তত ভণিতার আর প্রয়োজন রইল না।
হ্যাঁ, সায় দিল তিনাত। আমরা ফেরারী। মুতাঙ্গিতে ফিরে যেতে পারবে না তুমি।
অবশ্যই না, বলল মেরেন। ওখানে আমাদের প্রয়োজনীয় কিছুই নেই। সাথে ঘোড়া আর অস্ত্রশস্ত্র আছে। জঙ্গলের পথই বেছে নিতে হবে আমাদের। মেঘ বাগিচা থেকে তাইতার ফেরার অপেক্ষায় থাকার সময় এই অভিশপ্ত জায়গা থেকে প্রিয় মিশরে ফিরে যাবার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেব।
এখুনি সরে পড়তে হবে আমাদের, সায় দিয়ে বলল তিনাত। মুতাঙ্গির অনেক কাছে আছি আমরা। দূরের পাহাড়ে লুকোনোর মতো অনেক জায়গা মিলবে। চলার উপর থাকলে ওনকার পক্ষে আমাদের নাগাল পাওয়া কঠিন হবে। ঘোড়ায় চেপে পুব দিকে চলল ওরা। শেষ বিকেলের দিকে বিশ লীগ দূরত্ব অতিক্রম করে এলো। কিতানগালে গ্যাপের নিচে পাহাড়ের পাদদেশের ঢাল বেয়ে ওঠার সময় দীর্ঘ প্যাচানো শিং আর পেল্লায় কানঅলা অ্যান্টিলোপের একটা বিশাল পাল আড়াল থেকে বের হয়ে এসে ওদের সামনে দিয়ে ছুটে গেল। সাথে সাথে তীর ধনুক নামিয়ে ধাওয়া করল ওরা। ওয়ার্লউইভের পিঠে ফেন, সবার আগে ওদের নাগাল পেল সে, ওর তীর একটা মোটাসোটা শিৎবিহীন মাদী অ্যান্টিলোপকে শুইয়ে দিল।
যথেষ্ট! চিৎকার করে উঠল মেরেন। বেশ কয়েক দিন চলার মতো প্রচুর মাংস মিলবে ওটায়। পালের বাকি পশুদের যেতে দিয়ে মরা জানোয়ারটার ছাল খসিয়ে মাংস সংগ্রহ করতে জিন থেকে নামল ওরা। সূর্যাস্তের সময় ওদের পথ দেখিয়ে একটা পরিষ্কার মিঠা পানির ধারার কাছে নিয়ে এলো সিদুদু। ওটার কিনারে তাঁবু খাটাল ওরা, রাতের খাবারের জন্যে আগুনে অ্যান্টিলোপের বড় বড় মাংসের টুকরো ঝলসে নিল।
ওরা হাড় চিবোনোর সময়ে মেরেনকে বিদ্রোহী আদর্শের প্রতি অনুগত রাজকীয় বাহিনীর সাম্প্রতিক অবস্থানের ব্যাপারে খুলে বলল তিনাত। আমার নিজের রেজিমেন্ট হচ্ছে লাল পতাকা, আমি অস্ত্র তুলে নিতে বললেই সব অফিসার ও লোকজন ছুটে আসবে আমাদের কাছে। হলদে পতাকার দুটি ডিভিশনের উপরও নির্ভর করতে পারি আমি, আমার সহকর্মী কর্নেল সানগাত রয়েছে ওটার নেতৃত্বে। আমাদের পক্ষের লোক সে। তারপর আছে খনির স্টোপে কাজ করা কয়েদি ও বন্দিদের পাহারায় থাকা তিনটা ডিভিশন। বন্দিদের উপর চালানো নিষ্ঠুরতা ও অমানুষিকতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে ওদের। আমার নির্দেশের অপেক্ষা করছে। ওরা। আমরা যুদ্ধ শুরু করামাত্র বন্দিদের ছেড়ে দিয়ে অস্ত্র দিয়ে জোর করে আমাদের সাথে যোগ দিতে নিয়ে আসবে। সেনা সমাবেশের বিভিন্ন জায়গা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গেল ওরা, শেষ পর্যন্ত স্থির হলো যে প্রত্যেকটা ইউনিটকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে কিতানগালে গ্যাপের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, ওখানে মিলিত হবে ওরা।
আমাদের বিরুদ্ধে জাররিয়রা কী ধরনের শক্তি মোতায়েন করতে পারে? জানতে চাইল। মেরেন।
সংখ্যায় আমাদের দশজনে একজনে হারিয়ে দিলেও সৈন্য সমাবেশ করে আমাদের পেছনে লেলিয়ে দিতে অনেক দিন লাগবে অলিগার্কদের। যতক্ষণ ওদের ভড়কে দিতে পারছি, ওদের আগে আমাদের বাহিনীকে সমবেত করতে পারছি ততক্ষণ আমাদের বাহিনী কিতানগালে নদীর মুখ পর্যন্ত পেছন থেকে আসা আক্রমণের মোকাবিলা করতে পারবে। ওখানে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় নৌকা ছিনতাই করব আমরা। একবার নদীতে নেমে গেলে ভাটি বরাবর বিশাল নালুবালে হ্রদের দিকে চলে যাওয়া অনেক সহজ হবে। থেমে ধূর্ত দৃষ্টিতে মেরেনের দিকে তাকাল সে। দিন দশেকের মধ্যেই তৈরি হতে পারব আমরা।
ম্যাগাস তাইতা ছাড়া যেতে পারব না আমরা, চট করে বলল মেরেন।
তাইতা একজন মানুষ মাত্র, যুক্তি দেখাল তিনাত। আমাদের শত শত লোক বিপদে আছে।
ওকে ছাড়া সফল হতে পারবে না, বলল মেরেন। ওর ক্ষমতা ছাড়া তুমি আর তোমার সব লোক শেষ হয়ে যাবে।
খোঁচা খোঁচা দাড়ি টানতে টানতে চেহারায় পরিহাস তরল চিন্তার ভাব ফুটিয়ে তুলে ভাবল তিনাত। তারপর যেন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, এমন একটা ভাব করল। ওর জন্যে সারা জীবন অপেক্ষা করতে পারব না আমরা। এরই মধ্যে মারা গিয়ে থাকে যদি? এই ঝুঁকি নিতে পারব না আমি।
কর্নেল তিনাত! ফেটে পড়ল ফেন। তুমি কি নবান্নের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত তাইতার জন্যে অপেক্ষা করবে?
ওর দিকে তাকিয়ে রইল তিনাত, তারপর সংক্ষেপে মাথা দোলাল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। ম্যাগাস তার আগেই পাহাড় থেকে না নামলে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি আর কোনওদিনই ফিরবেন না।
