বাচ্চাদের পেটে ধরেছিল যারা সেই মেয়েদের কী হয়েছে?
অদৃশ্য হয়ে গেছে, সহজ কণ্ঠে বলল সিদুদু। আবার ফুঁপিয়ে কাঁদল। চলে যাওয়া মেয়েদের কয়েকজনকে পছন্দ করতাম। মন্দিরের অন্য মেয়েরাও ছিল যাদের ভালো লাগত। পেটে বাচ্চা আসার পর ওদেরও পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
শান্ত হও, সিদুদু, ফিসফিস করে বলল ফেন। এসব বলা আসলেই ভীতিকর।
না, ফেন, বেচারাকে কথা বলতে দাও, বাধা দিয়ে বলল মেরেন। ওর কথা আমার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। জাররিয়রা দানব। আমার ক্রোধ ওদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী করে তুলছে আমাকে।
তাহলে আমার বন্ধুদের উদ্ধারে সাহায্য করবে, মেরেন? ডাগর ডাগর চোখে আশার চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে মেরেনের দিকে তাকাল সিদুদু।
তুমি যা বলবে তাই করব, সাথে সাথে জবাব দিল মেরেন। কিন্তু তার আগে ওনকা সম্পর্কে আরও কিছু বলল। সবার আগে সে-ই আমার বদলার রূপ দেখবে।
ভেবেছিলাম আমাকে বাঁচাবে সে। ভেবেছিলাম তার সাথে থাকলে আমাকে আর পাহাড়ে পাঠানো হবে না। কিন্তু তারপর অল্প কিছু দিন আগে একদিন ডাক্তার হান্নাহ আমাকে পরীক্ষা করতে আসে। তাকে আশা না করলেও তার আসার মানে জানতাম। আমাকে পরীক্ষা করার সময় কিছু না বললেও ওনকার দিকে তাকাতে দেখলাম তাকে, ওনকার মাথা দোলানোও দেখলাম। বুঝে গেলাম আমার পেটের বাচ্চা বেড়ে উঠলেই আমাকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হবে। কয়েক দিন পর আরও একজন দেখতে এলো আমাকে। ওনকা তামাফুপায় কর্নেল তিনাতের সাথে থাকতে গোপনে আমার কাছে এসেছিল সে। আমাকে জররি থেকে পালানোর পরিকল্পনাকারী নবাগতদের সাথে কাজ করার প্রস্তাব দিল। অবশ্যই রাজি হয়ে গেলাম। ওদের কথা মতো একটা আরক খেতে দিলাম, অমনি অসুস্থ হয়ে পড়ল সে। এরপর আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করে ওনকা। আমার সাথে আরও নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করে সে। বুঝে গেলাম অচিরেই আমাকে ফের মন্দিরে ফেরত পাঠাবে। তখনই শুনলাম ম্যাগাস নাকি মুতাঙ্গিতে আছেন। ভাবলাম তিনি ওনকার বাচ্চাকে সরিয়ে দিতে পারবেন হয়তো। তো তার খোঁজ পেতে সবরকম ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পালালাম, কিন্তু ট্রগরা আমার পিছু নিল। তখনই আমাকে উদ্ধার করেছ তোমরা।
ভয়ঙ্কর কহিনী, বলল ফেন। অনেক ভুগেছ।
হ্যাঁ, কিন্তু এখনও মন্দিরের রয়ে যাওয়া মেয়েদের মতো নয়। ওদের মনে করিয়ে দিল সিদুদু।
ওদের উদ্ধার করব আমরা, ঝোঁকের বশে বলে ফেলল মেরেন। জাররি থেকে পালানোর সময় আমাদের সাথে থাকবে ওরা, কসম।
ওহ, মেরেন, তুমি কত সাহসী আর ভালো।
*
এরপর দ্রুত সেরে উঠল সিদুদু। রোজ ক্রমশঃ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল ফেন আর ও। অন্যরাও ওকে পছন্দ করে ফেলল: হিলতো, নাকোন্তা ও ইম্বালি, কিন্তু বাকি সবার চেয়ে বেশি পছন্দ মেরেনের। হিলতো ও মুতাঙ্গি গ্রামের অন্যদের সাহয়তায় দিনের বেলায় ঘর থেকে পালিয়ে বনে গিয়ে সময় কাটায়। মেরেন ও হিলতো ফেনকে তীর ছোঁড়ার কায়দা শেখানো চালিয়ে যাচ্ছে; অচিরেই সিদুদুকে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাল ওরা। ওকে একটা ধনুক বানিয়ে দিল মেরেন, ওর শক্তি ও বাহুর আওতার সাথে খাপ খাইয়ে দিল ওটা ৷ সিদুদু মেয়েটা ছোটখাট, ছিপছিপে গড়নের হলেও বিস্ময়করভাবে শক্তিশালী, তীর ছোঁড়ায় স্বাভাবিক এক ধরনের ঝোঁক দেখা গেল তার ভেতর। বনের ভেতর একচিলতে ফাঁকা জায়গায় ওদের লক্ষ্য বস্তু ঠিক করে দিল মেরেন, মেয়েরা বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে তীর ছুঁড়তে লাগল।
মনে করো নিশানাটা ওনকার মাথা, ওকে বলেছিল ফেন। এরপর আর তেমন একটা ফস্কাল না সিদুদুর তীর। ওর বাহু দ্রুত শক্তিশালী বেড়ে উঠল; ফলে মেরেনকে অপেক্ষাকৃত ভারি টানঅলা আরেকটা ধনুক বানিয়ে দিতে হলো। অনেক আন্তরিক অনুশীলনের পর দুইশো কদম দূরের নিশানা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে সফল হলো ও।
মেরেন, হিলতো ও নাকোন্তো অভ্যাসবশতঃ জুয়াড়ি। মেয়েরা প্রতিযোগিতায় নামলেই বাজি ধরে ওরা। যার যার প্রিয়জনকে তাগিদ দেয়, সিদুদুকে দেওয়া বাড়তি সুবিধা নিয়ে ঝামেলা করে। ফেন সিদুদুর চেয়ে অনেক বেশি তীর ধনুক ব্যবহার করায় ওকে অনেক বেশি দূর থেকে তীর ছুঁড়তে দেয় ওরা। প্রথমে পঞ্চাশ কদম দূরত্ব মেনে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সিদুদুর দক্ষতা বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আস্তে আস্তে সেটা কমে এলো।
একদিন ফাঁকা জায়গায় আরেকটা টুর্নামেন্ট করছিল ওরা। ফেন আর হিলতোর বিরুদ্ধে মেরেন ও সিদুদু দল বেঁধেছে। তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল, হল্লা প্রবল হয়ে উঠেছে, এমন সময় গাছপালার ভেতর থেকে একটা অচেনা খোঁড়ায় চেপে হাজির। হলো এক আগন্তুক। ক্ষেতের কৃষকের পোশাক তার পরনে, কিন্তু ঘোড়া হাঁকাচ্ছে যোদ্ধার ঢঙে। মেরেনের কাছ থেকে সঙ্কেত পেয়ে ধনুকে টাটকা তীর এঁটে আত্মরক্ষার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেল ওরা। আগম্ভক ওদের উদ্দেশ্য টের পেয়ে লাগাম টানল, মুখ ঢেকে রাখা নেকাব সরিয়ে ফেলল।
সেথের গোবর লেপা পাছার দোহাই! বলে উঠল মেরেন। এ যে দেখছি তিনাত। ওকে স্বাগত জানাতে ছুটে গেল সে। কর্নেল, একটা কিছু ভজঘট হয়েছে। কী সেটা? এখুনি বলো।
তোমাদের খোঁজ পেয়ে খুশি হয়েছি, বলল তিনাত। মহাবিপদে আছি। আমরা, সেটা জানাতেই আসা। অলিগার্করা আমাদের সবাইকে ওদের সামনে হাজির হওয়ার সমন জারি করেছে। ওনকা ও তার লোকজন সব জায়গায় আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে মুতাঙ্গির ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে ওরা।
