যুগের পর যুগ তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আমি, বলল ইয়োস, সে মহা মিথ্যার ধারক জানা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাস না করে পারল না ও।
*
Done page 404
কাপ্টেন ওনকা তাইতাকে মেঘ-বাগিচায় নিয়ে যাবার পরেও বেশ কয়েক মাস VIসিদুদুকে লুকিয়ে রাখল ফেন ও মেরেন। গোড়ার দিকে বিপর্যয়ে ভেঙে পড়ে রীতিমতো বিভ্রান্ত ও মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছিল সে। মেরেন ও ফেন ওর সাথে খুবই কোমল আচরণ করায় অচিরেই ওদের উপর যারপরনাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সে। সারাক্ষণই ওদের কাউকে ওর সাথে থাকতে হচ্ছিল। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল ও, ওর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতে শুরু করল। অবশেষে নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে পারল, ভালোবাসার মন্দিরের কাহিনী জানাল ওদের।
ওটা একমাত্র সত্য দেবীর নামে উৎসর্গ করা, ব্যাখ্যা করল ও। নবাগতদের ভেতর থেকে মন্দিরের কুমারীদের বাছাই করা হয়, কখনওই অভিজাত মহল থেকে নয়। নবাগত প্রত্যেকটা পরিবারকে তাদের একটা মেয়েকে ওদের হাতে তুলে দিতেই হবে। যেসব পরিবারের মেয়ে বেছে নেওয়া হয়েছে তাদের পক্ষে বিরাট সম্মান ও সুযোগ সুবিধার অধিকারী হওয়া যায়। আমাদের গ্রামের সবাই দেবীর আরাধনায় একটা উৎসবের আয়োজন করে। সেখানে সবচেয়ে জাঁকাল পোশাক। পরায় আমাকে, ফুলের মুকুট মাথায় পরিয়ে মন্দিরে নিয়ে যায়। বাবা-মা আমার সাথে গিয়েছিল। খুশিতে হাসছিল ওরা, কাঁদছিল। আমাকে ওরা প্রধান পুরোহিতিনীর হাতে তুলে দিয়ে চলে আসে। ওদের আর কোনওদিন দেখিনি।
তোমাকে দেবীর সেবিকা বাছাই করেছিল কে? জিজ্ঞেস করল ফেন।
কোন এক অলিগার্কের কথা বলেছে ওরা, জবাব দিল সিদুদু।
ভালোবাসার মন্দির সম্পর্কে বলো, বলল মেরেন। ভাবতে গিয়ে এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল সে। তারপর মৃদু অথচ দ্রুত কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করল। খুবই সুন্দর জায়গা। প্রথম যখন যাই, আরও অনেক মেয়ে ছিল। মহিলা পুরোহিতরা আমাদের সাথে অনেক ভালো ব্যবহার করেছে। সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় আর ভালো খাবার দেওয়া হতো আমাদের। ওরা বলত আমরা আমাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিলেই দেবীর পাহাড়ে যেতে পারব, দেবী আমাদের সম্মান দেবেন।
তোমরা সুখে ছিলে? জানতে চাইল ফেন।
প্রথম প্রথম ছিলাম আমি। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ত বটে, কিন্তু রোজ সকালে আমাদের মজাদার শরবত খাওয়াত ওরা, তাতে খুশি আর উদ্যমী হয়ে উঠতাম আমরা, হাসতাম, নাচতাম।
তারপর কী হলো? জিজ্ঞেস করল মেরেন।
মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিচু কণ্ঠে কথা বলতে লাগল সে, ঠিকমতো শুনতে কষ্ট হলো মেরেনের। কিছু লোক আমাদের দেখতে এলো। ওদের আমরা আমাদের বন্ধু ভেবেছিলাম। ওদের সাথে নাচলাম আমরা। নীরবে কাঁদতে শুরু করল সিদুদু।
আর বলতে পারব না, লজ্জা পাচ্ছি।
চুপ করে রইল ওরা, সিদুদুর হাত ধরল ফেন। আমরা তোমার সত্যিকারের বন্ধু, সিদুদু, বলল ও। আমাদের সব বলতে পারো। আমাদের সাথে কথা বলতে কোনও সমস্যা নেই।
হৃদয় মোচড়ানো শব্দে কেঁদে উঠল মেয়েটা, ফেনের গলা জড়িয়ে ধরল। প্রধান পুরোহিতিনী আমাদের দেখতে আসা লোকগুলোর সাথে বিছানায় যাওয়ার হুকুম দিলেন।
কারা ছিল ওরা? গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল মেরেন।
প্রথম জন লর্ড আকের। ভয়ঙ্কর লোক। অন্যরাও ছিল, অনেক লোক। ওনকাও ছিল।
আর বলতে হবে না, ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল ফেন।
না! বলতেই হবে! সেই দুঃসহ স্মৃতি আমার মনে আগুনের মতো জ্বলেছ। তোমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারব না। দীর্ঘ, শরীর কাঁপানো শ্বাস নিল সিদুদু। মাসে একবার হান্নাহ নামে এক মহিলা ডাক্তার আমাদের পরীক্ষা করতে আসত। প্রতিবার একজন বা তার বেশি মেয়েকে বাছাই করত সে। পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হতো ওদের দেবীর হাতে মর্যাদা পাবার জন্যে। ওরা আর মন্দিরে ফিরে আসেনি। আবার থেমে গেল সে। নাক ঝাড়তে ওকে একটা টুকরো লিনেন এগিয়ে দিল ফেন। না ঝেড়ে কাপড়টা সযত্নে ভাঁজ করে আবার কথা বলতে শুরু করল সিদুদু মেয়েদের একজন আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। খুবই ভালো মেয়ে। ওর নাম লিতানি। দেখতেও সুন্দর। কিন্তু মায়ের কথা খুব মনে পড়ত ওর, লোকগুলোর সাথে আমরা যা করতাম তাকে ঘৃণা করত। একদিন রাতে মন্দির থেকে পালাল ও। চলে যাবার কথা আমাকে বলেছিল, ওকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল ও। পরদিন সকালে পুরোহিতিনী ওর লাশ এনে রাখল বেদীর উপর। সতর্ক করার জন্যে আমাদের সবাইকে ওর লাশের পাশ দিয়ে যেতে বাধ্য করে ওরা। ওরা বলে ট্রগরা বনের ভেতর পাকড়াও করেছে ওকে। বেদীতে শুয়ে থাকা লিতানের সৌন্দর্য বলতে কিছু ছিল না।
কিছুক্ষণ ওকে কাঁদতে দিল ওরা। তারপর মেরেন বলল, ওনকার কথা বলো আমাদের।
ওনকা অভিজাত গোষ্ঠীর লোক। লর্ড আকের তার চাচা। আকেরের প্রধান গোয়েন্দা। এইসব কারণে বিশেষ সুবিধা পায় সে। আমাকে বেছে নিয়েছিল সে। তার অবস্থানের কারণে একবারের বেশি আমার কাছে আসার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তাকে। তারপর তার বাড়িতে দাসীগিরি করতে আমাকে মন্দির থেকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল ওকে। রাষ্ট্রের জন্যে তার সেবার পুরস্কার ছিলাম আমি। মাতাল অবস্থায় আমাকে সে মারত। মেরে মজা পেত। ঝিলিক দিয়ে উঠত ওর চোখ। কাজটা করার সময় সে হাসত। একদিন ওনকা দূরে থাকবার সময় গোপনে এক মহিলা এলো। আমাকে জানাল মেঘ-বাগিচায় বিশাল লাইব্রেরিতে কাজ করে সে। তার কাছেই পাহাড় থেকে নিয়ে যাওয়া মেয়েদের ভাগ্যে কী পরিণতি ঘটেছে। জানতে পারি। দেবী তাদের মর্যাদা দেয়নি। জন্মের আগেই ওদের বাচ্চা জরায়ু থেকে কেটে বের করে দেবীর খাবার হিসাবে পরিবেশন করা হয়েছে। সেজন্যেই দেবীকে আড়ালে শিশু খাদক বলা হয়।
