…কিন্তু আগুনই হচ্ছে এসবের প্রভু, নোট বইয়ের লেখা মুখস্থ করার মতো পুনরাবৃত্তি করল দিমিতার। নিমেষে হাত উঠে এসে মুখ চেপে ধরল তার, বুড়ো চোখে বিস্ময় নিয়ে তাইতার দিকে তাকালেন তিনি। আগুন, হাওয়া, জল ও মাটি সৃষ্টির চারটি মৌল উপাদান। এখন ওগুলোর নাম বললেন না, তাইতা?
আগে বলুন আগুনকে কেন সবগুলোর প্রভু বলেছেন আপনি।
প্রার্থনা মন্ত্র, বললেন দিমিতার।
কার প্রার্থনা? কীসের মন্ত্র?
মনে করার প্রয়াসে ম্লান হয়ে গেল দিমিতারের চেহারা। জানি না। বেদনাদায়ক স্মৃতি খুঁড়ে আনতে গিয়ে কণ্ঠস্বর কেঁপে যাচ্ছে তার। এর আগে কখনও শুনিনি।
শুনেছেন, এবার অনুসন্ধানী কণ্ঠে বলল তাইতা। ভাবুন, দিমিতার! কোথায়? কে? তারপর আচমকা আবার সুর পাল্টাল। নিখুঁতভাবে অন্যের কণ্ঠ নকল করতে পারে ও। ঘোরে থাকার সময় দিমিতারের উচ্চারণ করা সুরেলা মেয়েলী কণ্ঠে কথা বলল। কিন্তু এসবের প্রভু হচ্ছে আগুন।
ঢোক গিললেন দিমিতার, দুহাত কান ঢাকলেন। না! চিৎকার করে উঠলেন।
ওই সুরে কথা বলে ধর্মের অবমাননা করছেন আপনি। জঘন্য অপবিত্রতার কাজ করছেন। এটা মিথ্যার স্বর, ডাইনী ইয়োসের কণ্ঠস্বর! হেলান দিয়ে বসে ভাঙা কণ্ঠে কাঁদতে লাগলেন তিনি।
নীরবে ওর সামলে নেওয়ার অপেক্ষা করল তাইতা।
অবশেষে মাথা তুলে দিমিতার বললেন আহুরা মাযদা দয়া করুন, আমার দুর্বলতা ক্ষমা করুন। কেমন করে এই মারাত্মক কথাগুলো ভুলে গেলাম?
দিমিতার, আপনি ভোলেননি। স্মৃতি আপনার কাছে ধরা দিতে চায়নি, আস্তে করে বলল তাইতা। এখন সব মনে করতে হবে-দ্রুত, ইয়োস অনুপ্রবেশ করে আটকানোর আগেই।
কিন্তু এসবের প্রভু হচ্ছে আগুন। এই মন্ত্র দিয়েই সবচেয়ে অপবিত্র আচার শুরু করেছিল সে, ফিসফিস করে বললেন দিমিতার।
এরনায়?
ওকে অন্য কোথাও দেখিনি।
আগুনের জায়গায় আগুনকে মহিমান্বিত করেছে, চিন্তিত কণ্ঠে বলল তাইতা। আগ্নেয়গিরির বুকের ভেতর ক্ষমতা করায়ত্ত করেছে সে। আগুন তার শক্তির অংশ, কিন্তু ক্ষমতার উৎস থেকে চলে গেছে সে। তবু আমরা জানি তা আবার সজীব হয়ে উঠেছে। আপনি যে আমাদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন খেয়াল করেছেন সেটা? এখন আমরা জানি ঠিক কোথায় তার খোঁজ করতে হবে।
স্পষ্টই বিস্মিত দেখাল দিমিতারকে।
আগ্নেয়গিরির আগুনেই খুঁজতে হবে ওকে, ব্যাখ্যা করল তাইতা।
দিমিতারকে যেন ভাবনা গুছিয়ে নিচ্ছেন। হ্যাঁ, বুঝতে পারছি, বললেন তিনি।
চলুন, ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু এগোনো যাক! বলল তাইতা। তিনটি উপাদানের অধিকারী আগ্নেয়গিরি: আগুন, মাটি ও হাওয়া। কেবল জলের অভাব রয়েছে। সাগরের পাশে এরনার অবস্থান। আস্তানার হিসাবে আরেকটা আগ্নেয়গিরি সন্ধান পেয়ে থাকলে কাছেই বিরাট জলের উৎস থাকতে বাধ্য।
সাগর? জিজ্ঞেস করলেন দিমিতার।
কিংবা বড় কোনও নদী, আন্দাজ করল তাইতা। সাগরের পাশে কোনও আগ্নেয়গিরি, দ্বীপের উপরও হতে পারে, কিংবা বিরাট কোনও হ্রদের ধারে। এমন জায়গাতেই ওর খোঁজ করতে হবে। দিমিতারের কাঁধ দুহাতে জড়িয়ে ধরল ও। আন্তরিক হাসল। তো, দিমিতার, অস্বীকার করলেও সে কোথায় লুকিয়ে আছে আপনার জানা ছিল।
এখানে আমার কোনও কৃতিত্ব নেই। আমার অপসৃয়মান স্মৃতি থেকে আপনার বুদ্ধির জোরেই সেটা বের করে এনেছেন আপনি, বললেন দিমিতার। তবে একটা কথা বলুন তো, তাইতা, আমাদের অনুসন্ধানের এলাকা কতখানি কমাতে পেরেছি? বর্ণনার সাথে মেলে এমন আগ্নেয়গিরির সংখ্যা কত? একটু থামলেন তিনি, তারপর নিজেই জবাব দিলেন। কয়েক হাজার হবে। নিশ্চয়ই বিস্তৃত জমিন আর সাগরের কারণে দূরে দূরে থাকবে সেগুলো। সবগুলোয় পৌঁছতে অনেক বছর লাগবে। মনে হয় না, এখন আর এমন কাজ করার শক্তি আছে।
গত কয়েক শো বছর ধরে থেবসের হাথরের মন্দিরের পুরোহিতরা পৃথিবীপৃষ্ঠের নিখুঁত গবেষণা করেছে। সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-নদীর বিস্তারিত মানচিত্র আছে ওদের কাছে। চলার পথে আমার জানা তথ্য ওদের কাছে চালান করেছি। ওদের সাথে ভালো জানাশোনা আছে। পানির কাছাকাছি সমস্ত আগ্নেয়গিরির তালিকা দিয়ে সাহায্য করবে ওরা। মনে হয় না সবগুলোর কাছে। যেতে হবে। আমরা দুজন আমাদের শক্তি এক করে দূর থেকে অশুভের উৎসারণ জানতে প্রত্যেকটা পাহাড়ের দিকে শব্দ পাঠাতে পারি।
তাহলে হাথরের মন্দিরে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে, শক্তি সামলে রাখতে হবে। ইয়োসের বিরুদ্ধে এই সংঘাত আপনার শক্তি ও প্রতিরক্ষার শেষ বিন্দুটুকুও শুষে নিচ্ছে। আপনাকেও বিশ্রাম নিতে হবে, তাইতা। পরামর্শ দিলেন দিমিতার। দুদিন ধরে ঘুমাননি, অথচ ওকে বের করে আনার দীর্ঘ পথে এরইমধ্যে প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছি আমরা।
এই পর্যায়ে ওদের তাঁবুতে এক বান্ডিল সুরভিত মরু ঘাস একে, বিছানা বানাতে লেগে গেল মেরেন। তার উপর বাঘের ছাল বিছিয়ে দিল। হাঁটু গেড়ে বসে মনিবের পায়ের জুতো খুলল, টিউনিকের ঢিতে ফিলে করে দিল। কিন্তু ওকে ধমকে উঠল তাইতা। আমি কচি খোেকা নই, মেরেন। নিজের পোশাক খুলতে পারি।
তাকে বিছানার উপর শুইয়ে দেওয়ার সময় আমোদিত হাসল মেরেন। আপনি কচি খোকা নন, সেটা আমাদের জানা আছে, ম্যাগাস। অবাক কাণ্ড, সাধারণত তো এমন আচরণ করেন না আপনি? প্রতিবাদ করবে বলে মুখ খুলল তাইতা, কিন্তু তার বদলে মৃদু নাক সিঁটকাল এবং পরক্ষণেই ঢলে পড়ল গভীর ঘুমে।
