আমি কি তা পারব? ভাবল তাই।
তারপর দিমিতারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সতর্কবাণী প্রতিধ্বনি তুলল ওর কানে: তাইতা, আপনি বলেছিলেন আসল ইয়োস এক অতৃপ্ত নিম্ফোম্যানিয়াক। কথাটা ঠিক। কিন্তু অন্য এই ইয়োস ক্ষুধার দিক থেকে তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সে যখন চুমু খায়, প্রেমিকের শরীর থেকে সমস্ত প্রয়োজনীয় রস কেড়ে নেয়। যেভাবে আমরা পাকা আমের রস চুষে খাব। পুরুষকে আলিঙ্গন করে পায়ের মাঝে আটকে রেখে তার সত্তা বের করে নেয়। শিকারের সত্তাই তার জীবনীশক্তি। মানুষের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকা এক দানবীয় ভ্যাম্পায়ার। কেবল উন্নত সত্তাকেই শিকার হিসাবে বেছে নেয়। সৎ মনের নারী-পুরুষ, সত্যির সাধক, বিশেষ খ্যাতিসম্পন্ন ম্যাগাস, প্রতিভাবান ভবিষ্যদ্বক্তা। শিকারের সন্ধান পাওয়ার পর পিছু নেয়, ঠিক নেকড়ে যেভাবে হরিণের পিছু ধাওয়া করে।
আমার বেলায় যেমন করেছে, ভাবল তাই।
সে মহাবুভুক্ষু। এসব দিমিতারের কথা, তার মতো আর কোনও জীবিত মানুষ চেনেনি তাকে। বয়স বা চেহারা কোনও ব্যাপার না, শারীরিক খুঁত বা বিকৃতিও না। মাংস দিয়ে ক্ষুধা মেটায় না সে। বরং আত্মা দিয়ে। তরুণ-প্রবীন, নারী-পুরুষ সবাইকে গ্রাস করে। একবার আয়ত্ত করতে পারলে, রূপালি জালে আটকানোর পর ওদের পুঞ্জীভূত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা শুষে নেয়। অভিশপ্ত চুমু খেয়ে সব কেড়ে নেয় সে। ঘৃণিত আলিঙ্গনের সময় টেনে বের করে নেয়। কেবল শূন্য খোসাটা ফেলে রাখে।
ডাইনীর চ্যালা হান্নাহ, রেই ও আসেম কেবল একটা কারণেই তাইতার পুরুষাঙ্গকে নতুন করে গড়ে তুলেছে। যাতে ইয়োস ওকে ধ্বংস করতে পারে-দেহ, মনে, আত্মায়। জলোচ্ছ্বসের মতো ফুঁসে উঠে ওকে ধ্বংস করার হুমকী অনেক কষ্টে সহ্য করল ও।
আমি তার জন্যে তৈরি, যতটা সম্ভব। কিন্তু সেটা কি যথেষ্ট হবে?
বাগানের গেট হাঁ করে খোলা ছিল। কিন্তু ও সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই গোটা জ্বালামুখ জুড়ে এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো। মৃদু হাওয়া পড়ে গেল। একজোড়া বুলবুল পরস্পরের উদ্দেশে দ্বৈত সঙ্গীত গাইছিল, চুপ করে গেল ওরা। গাছের উঁচু ডালপালা স্তব্ধ হয়ে গেল, আকাশের নীল ক্যানভাসের পটভূমিতে অনড় হয়ে রইল। এক মুহূর্ত বেশি সময় নীরবতায় কান পেতে শুনল, তারপর গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল ও।
ওর পায়ের নিচে জমি নড়ছে। কাঁপছে। সহানুভূতিতে তিরতির করে দুলছে গাছের পাতা। কাঁপুনিটা প্রবল ঝাঁকুনিতে পরিণত হলো। পায়ের নিচে পাথরের গোঙানি শুনতে পেল ও। জ্বালামুখের একটা অংশ ভেঙে সগর্জনে নিচের বনে লুটিয়ে পড়ল। ঝড়ে আক্রান্ত জাহাজের পাটাতনের মতো দুলছে গোটা পৃথিবী। তাল হারানোর দশা হলো ওর। নিচে ছিটকে পড়া থেকে বাঁচতে গেটের একটা গরাদ ধরতে হাত বাড়িয়ে দিল। আবার বেড়ে উঠল হাওয়া। তবে এবার সেটা এলো শয়তানের গুহার দিকে থেকে। গাছপালার ডালের উপর দিয়ে বয়ে গেল সবেগে, মরা পাতার ঘূর্ণী তুলল চারপাশে। লাশের দেশের মতোই শীতল।
ওকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে ইয়োস। আগ্নেয়গিরি মালকিন সে। ভূমিকম্প ও নরকে প্রবাহিত লাভা নদীর চালক। তার শক্তির কাছে আমি কত নগণ্য সেটাই বুঝিয়ে দিতে চাইছে, ভাবল ও। তারপর জোরে চিৎকার করে উঠল। আমি এখানে, ইয়োস! তোমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম।
পৃথিবীর কম্পন থেমে গেল, জ্বালামুখে আবার রহস্যময় নীরবতা নেমে এলো। এখন ওর সামনের পথ পরিষ্কার, আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। অবশেষে বড় বড় পাথরের চাইয়ের মাঝখান দিয়ে আগে বেড়ে গুহা থেকে বের হয়ে আসা জলধারার কুলকুল ধ্বনি শুনতে পেল। সবুজের পর্দা ভেদ করে এগিয়ে গেল ও, পুকুরের পাশের খালি জায়গায় পা রাখল। যেমন দেখে গিয়েছিল তেমনই আছে সব। উপড়ে পড়া গাছের কাণ্ডের দিকে পেছন ফিরে ঘাসের উপর পুরোনো জায়গায় বসে অপেক্ষা করতে লাগল ও।
তার আসার প্রথম যে সঙ্কেত পেল ও, সেটা হচ্ছে বরফ শীতল হাওয়া, ঘাড়ের পেছনের চুলে শিহরণ তুলল। বাহুর পশমগুলো কেঁপে উঠল। গুহার মুখের দিকে খেয়াল রাখল ও, দেখতে পেল সূক্ষ্ম একটা রূপালি কুয়াশা বের হয়ে আসছে ওখান থেকে। তারপর একটা গাঢ় অবয়ব বের হয়ে এলো কুয়াশার ভেতর থেকে, শ্যাওলায় ঢাকা পথ ধরে রাজকীয় ঢঙে এগিয়ে আসছে। হান্নাহর ঘরে দেখা সেই পর্দা পরা মহিলাই, সেই একই বিশাল আধাস্বচ্ছ কালো রেশমী পোশাক পরেছে।
রূপালি কুয়াশার ভেতর থেকে বের হয়ে এলো ইয়োস। ওর নগ্ন পাজোড়া দেখতে পেল তাইতা। আলখেল্লার নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে। কেবল অংশ বিশেষই নজরে আসছে। পায়ের উপর দিয়ে বয়ে চলা ঝর্নার পানিতে ভিজে চকচক করছে। ছোট, নিখুঁত। যেন ক্রিম রঙা আইভরি থেকে কোনও দক্ষ শিল্পী কুঁদে বের করেছে। ওর পায়ের নখ মুক্তোর মতো উজ্জ্বল। কেবল শরীরের ওই অংশটুকুই দেখতে পেয়েছে এ পর্যন্ত। মারাত্মক উত্তেজক ওগুলো। চোখ সরাতে পারছে না ও। টের পেল উত্তেজিত হয়ে উঠছেও, অনেক চেষ্টায় নিজেকে দমন করল।
কেবল পায়ের আঙুল দেখিয়ে এভাবে প্রভাবিত করতে পারলে শরীরের বাকি অংশ উন্মুক্ত করলে কীকরে তাকে রোধ করার আশা করতে পারি?
অবশেষে চোখ তুলতে পারল ও। পর্দার আড়াল ভেদ করে দেখার প্রয়াস পেল। কিন্তু সেটা দুর্ভেদ্য। এবার তার দৃষ্টির পরশ পেল ও, যেন প্রজাপতি এসে বসেছে ওর গায়ে। কথা বলল সে, দম বন্ধ হয়ে এলো তাইতার। তার কণ্ঠের গানের সাথে তুলনা করার মতো কোনও শব্দ জীবনেও শোনেনি ও। ফটিকের ঘণ্টার মতো রূপালি। ওর আত্মার ভিত্তি টলে উঠল।
