ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে সে। অশ্রু, ঘামে ভিজে সপসপ করছে মুখ। চোখে ভয়ের গাঢ় ছায়া পড়েছে। তুমি একটা শয়তান, ফিসফিস করে বলল সে। খোদ শয়তান।
হান্নাহ আর তোমার মতো অন্যরা আমাকে শয়তান বানিয়েছে।
অবশেষে তৈরি হলো মহিলা। মুখ দিয়ে চেপে ধরে হাঁ করতে বাধ্য করল তাকে। তারপর পিঠ বাঁকা করে মুক্তো শিকারীর মতো জলের গভীরে ডুব দেওয়ার আগে শেষবারের মতো লম্বা শ্বাস নিয়ে সবকিছু বের করে আনল: ওর জ্ঞান, শক্তি ও বিদ্যা। ওর বিজয় ও পরাজয়, ভীতি ও গভীরে প্রোথিত অপরাধবোধ। তার সবকিছু কেড়ে নিয়ে মাদুরে শূন্য ফেলে রাখল। এখন দ্রুত ও অগম্ভীর হয়ে পড়েছে তার শ্বাসপ্রশ্বাস; ত্বক মলিন, স্বচ্ছ মোমের মতো লাগছে। চোখের পাতা না ফেলে তাকিয়ে থাকলেও কিছুই দেখছে না। সে রাতের বাকি সময় তার পাশে বসে থাকল ও; ওর স্মৃতি জেনে নিল, শিখে নিল সব বিদ্যা, সব গোপন বিষয়, তাকে সত্যিকার অর্থে চিনে নিল।
যখন ভোরের আলো চুঁইয়ে ঘরে ঢুকল তখন অবশেষে নড়ে উঠে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়তে শুরু করল সে। কে আমি? দুর্বল কণ্ঠে জানতে চাইল। কোথায় আমি? আমার কী হয়েছে? কিছুই মনে করতে পারছি না।
তুমি লাসুলু নামে একজন মানুষ, কিন্তু তোমার জীবনে মহাশয়তানকে ধারণ করেছ। অপরাধে পীড়িত হয়েছ তুমি। তোমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়েছি। কিন্তু রাখার মতো কোনও কিছুই ছিল না তোমার। ফিরিয়ে দিচ্ছি তোমাকে, বিশেষ করে অপরাধবোধ। শেষ পর্যন্ত এটা তোমাকে হত্যা করবে, সেই মৃত্যুই তোমার খুব বেশি পাওনা।
ওকে আবার চিত করে শুইয়ে পাশে হাঁটু গেড়ে বসার পর যুদ্ধ করার প্রয়াস পেল লাসুলু। কিন্তু তার শরীরে আর শক্তি নেই। দ্বিতীয়বারের মতো তাই প্রবিষ্ট হলে আর্তনাদ করে উঠল সে। সেই আর্তনাদ কণ্ঠে বুদ্বুদ তুলল কেবল, ঠোঁট পর্যন্ত আসতে পারল না। সবকিছু আবার ফিরিয়ে দিল তাকে। তারপর নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ম্লান করতে চলে গেল।
আবার শোয়ার ঘরে ফিরে এসে দেখল টিউনিক পরছে সে। প্রবল আতঙ্কে ওর দিকে তাকাল সে। ওর আভা ছিন্নভিন্ন হতে দেখল তাইতা। টলমল পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে একটানে কবাট খুলে দ্রুত প্যাসেজে বের হয়ে গেল। মিলিয়ে গেল তার ছুটন্ত পায়ের শব্দ।
প্রথমবারের মতো করুণার একটা খোঁচা বোধ করল ও। কিন্তু তার জঘন্য অপরাধগুলোর কথা মনে হতেই উধাও হয়ে গেল তা। তারপর ভাবল: কিন্তু তার মালকিন, মহাডাইনীর সাথে কীভাবে লড়তে হবে তার কায়দা শিখিয়ে দিয়ে কিছুটা হলেও প্রায়শ্চিত্ত করেছে।
*
দিনের পর দিন সপ্তাহর পর সপ্তাহ ইয়োসের আমন্ত্রণের অপেক্ষায় রইল ও, জানে তা আসবেই। তারপর একদিন সকালে ফুরফুরে প্রত্যাশার পরিচিত অনুভূতি নিয়ে জেগে উঠল ও। ডাইনী আমাকে তার আস্তানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, আপন মনে বলল ও। হ্রদের দিকে খোলা টেরেসে বসে খেজুর ও ডুমুড় দিয়ে হালকা নাশতা সারল। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে সুর্যের আলোয় জ্বালামুখের দেয়াল সোনালি আলোয় ভরে উঠতে দেখল। ভৃত্যদের ছাড়া আর কাউকে দেখছে না। হান্নাহ, রেই বা আসেম, কাউকে না। স্বস্তি বোধ করল ও। গোপন কামরার ক্রোলের গুপ্ত বিষয় জানার পরপরই ওদের কারও সাথে মুখোমুখি হতে চাইছিল না। যখন দালান থেকে বের হয়ে উপরের বাগানের তোরণের উদ্দেশে পা বাড়াল, কেউ যেচে কথা বলতে এলো না বা বাধা দিতে গেল না।
ধীর পায়ে হাঁটছে ও, নিজের শক্তি জড়ো ও খতিয়ে দেখার সময় নিচ্ছে। কেবল দিমিতারের দেওয়া বর্ণনাতেই ইয়োসের একমাত্র নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে। হাঁটার সময় প্রতিটি শব্দ বারবার উল্টেপাল্টে পাল্টে দেখল। ওর স্মৃতিশক্তির প্রখরতার কারণে মনে হলো বুড়ো মানুষটা ওর সামনে বসে কথা বলছে।
হুমকি মনে করলে চেহারা পাল্টে ফেলতে পারে সে, ঠিক গিরগিটির মতো, দিমিতারের কণ্ঠ বাজতে লাগল ওর কানে। গুহায় দেখা বিভিন্ন প্রতিমূর্তির কথা ভবাবল তাইতা: ইম্প, ফারাও, দেবতা ও দেবী এবং ওর নিজের প্রতিমূর্তি।
কিন্তু অহঙ্কার হচ্ছে তার নানা দোষের ভেতর সবচেয়ে খারাপ। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না কত সুন্দর রূপ ধরতে পারে সে। এই রূপ যখন ধরে কোনও পুরুষের পক্ষে তাকে ঠেকানো অসম্ভব। তার রূপ যেকোনও আদর্শ পুরুষকেও স্রেফ পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনে। স্যানেটোরিয়ামের অপারেশন রুমে ইয়োসকে দেখার কথা মনে করল ও। কালো পর্দার ওপাশে চেহারা দেখতে না পেলেও তার সৌন্দর্য এমন ছিল যে পর্দার আড়ালেও গোটা কামরা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
মোহন্ত হিসাবে প্রশিক্ষণ সত্ত্বেও নিজের কুপ্রবৃত্তি দমন করতে পারিনি। আবার কথা বলে উঠলেন দিমিতার। মন দিয়ে শুনতে লাগল তাইতা। পরিণাম বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেই মুহূর্তে আমার কাছে সে ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। কামনার কাছে হেরে গিয়েছিলাম। আমাকে নিয়ে খেলেছে সে, ঠিক পাহাড়ী হাওয়া ঝরা পাতাকে নিয়ে যেমন করে খেলে। আমার মনে হয়েছিল সে আমাকে সব দিয়েছে, এই জগতের সব আনন্দ। নিজের শরীর তুলে দিয়েছিল সে। কথা বলার সময় তার কণ্ঠে আবার সেই যন্ত্রণার গোঙানি শুনতে পেল তাইতা: প্রতিটি উত্থান পতন, প্রতিটি খাঁজ, সুবাসিত ভাঁজ…ওকে ঠেকানোর চেষ্টাই করিনি, কারণ কোনও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে তাকে ঠেকানো সম্ভব না।
