আমাকে প্রতিরক্ষা দাও, প্রিয়া আমার, প্রার্থনা করল ও। শক্তি দাও। চুলের শক্তি এসে ওর আত্মাকে শক্তিশালী করে তুলছে, টের পেল। ওটা আবার লকেটে ঢুকিয়ে রাখল ও। তারপর মেরেনের চোখ থেকে বের করা লাল পাথরের কণাগুলো বের করে হাতের তালুতে রেখে ওগুলোয় মনোসংযোগ করল।
ঠাণ্ডা, কঠিন, আপনমনে বলল ও। ইয়োসের প্রতি আমার ঘৃণার মতোই।
ভালোবাসাই বর্ম, ঘৃণা হচ্ছে তলোয়ার। দুটোই নিশ্চিত করল ও। তারপর চুলের সাথে পাথর লকেটে রেখে গলায় ঝোলাল। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ও। কিন্তু ঘুম এলো না।
ফেনের বিচ্ছিন্ন সব স্মৃতি তাড়া করে ফিরতে লাগল ওকে। ওকে কাঁদতে ও হাসতে দেখার কথা ভাবল। ওর হাসি-ঠাট্টার কথা মনে পড়ল। ওকে সমাধান করতে দেওয়া কোনও সমস্যা নিয়ে সিরিয়াস অভিব্যক্তির কথা মনে পড়ে গেল। রাতে ওর পাশে উষ্ণ ও কোমল পড়ে থাকা ওর দেহের কথা মনে পড়ল। ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের মৃদূ আওয়াজ, ওর বুকের সাথে তার বুকের স্পন্দনের শব্দ।
ওকে আবারও দেখতেই হবে। এটা হয়তো শেষবার হবে। মাদুরে উঠে বসল ও। ওকে আহ্বান জানানোর সাহস করা ঠিক হবে না, কিন্তু ওকে দেখে তো আসতে পারি। এদুটো নাক্ষত্রিক মহড়া প্রায় একই রকম হলেও মূলত পার্থক্য আছে। আহ্বান জানানোর মানে ইথারে ওর উদ্দেশে চিৎকার করা, তখন কোনও অপ্রত্যাশিত শ্রোতা ইথারের স্পন্দন টের পেয়ে যেতে পারে। নজর দেওয়ার মানে গোপনে কাউকে দেখে আসা, অনেকটা পিপহোলের নজরদারের মতো। কেবল ইয়োসের মতো একজন মোহন্ত ও গণকই তা টের পেতে পারে। ঠিক যেমন নজরদারকে ধরতে পেরেছে ও। তবে দীর্ঘদিন ধরে যেকোনও ধরনের নাক্ষত্রিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকায় এখন হয়তো ডাইনী তেমন একটা সতর্ক নাও থাকতে পারে।
ফেনকে দেখতেই হবে। ঝুঁকি নিতেই হবে।
ডান হাতে মাদুলিটা ধরল ও। চুলের গোছা ফেনেরই অংশ, ওর কাছে পৌঁছে দেবে ওকে। মাদুলিটা কপালে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে এপাশ ওপাশ দুলতে শুরু করল। হাতে ধরা লকারটা যেন অদ্ভুতভাবে নিজস্ব জীবন লাভ করেছে। ওর হৃৎস্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে ওটার ছন্দময় স্পন্দিত হওয়া টের পেল তাই। মন উন্মুক্ত করে অস্তিত্বের প্রবাহকে স্বাধীনভাবে প্রবশে করতে দিল। সবুজ নদীর মতো ওকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। দেহ ছেড়ে সোজা শূন্যে উঠে গেল ওর আত্মা, যেন বিশাল দানবীয় পাখির ডানায় ভর করে উড়ছে। অনেক নিচে বন আর সমভূমির পলায়নপর বিভ্রান্তিকর দৃশ্য দেখতে পেল ও। মনে হলো এক সেনাদল কুচকাওয়াজ করে যাচ্ছে। কিন্তু নিচে নামতেই দেখতে পেল ওটা শরণার্থীদের মিছিল: শত শত নারী-পুরুষ-শিশু ধূলিধূসরিত পথে কষ্টেসৃষ্টে এগোচ্ছে, কিংবা লক্কড়মার্কা আঁড়ে টানা ঠেলাগাড়িতে ঠাসাঠাসি করে বসেছে। ওদের সাথে সৈনিক আর ঘোড়সওয়াররা রয়েছে। কিন্তু ওই ভীড়ে ফেন নেই।
আরও আগে বাড়ল ও। ওর আত্মা অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে পড়েছে। আরেকটু সামনে মুতাঙ্গির ছোট দালানকোঠার জটলাটা উদয় না হওয়া পর্যন্ত মাদুলিটাকে দিক নির্দেশক হিসাবে ব্যবহার করে খোঁজ করে চলল ও। কাছে যাওয়ার পর ক্রমবর্ধমান সতর্কতার সাথে বুঝতে পারল ধ্বংস হয়ে গেছে গ্রাম, পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। গণহত্যার নাক্ষত্রিক ছবি কুয়াশার মতো গ্রামের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন চিহ্নের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল ও। তবে বেড়ে ওঠা স্বস্তির সাথে লক্ষ করল মৃতদের ভেতর ফেন বা ওর দলের কেউ নেই। ধ্বংসের আগ নিশ্চয়ই মুতাঙ্গি থেকে পালিয়েছে ওরা।
গ্রামের অনেক পুবে চাঁদের পাহাড়ের পাদদেশে ওর অস্তিত্বের একটা ক্ষীণ আভাস না পাওয়া পর্যন্ত আত্মাকে উড়ে যেতে দিল ও। আভা অনুসরণ করে আগে বাড়ল ও, অবশেষে পাহাড়ের নিচের দিকের ঢাল আড়াল করে রাখা বনে লুকানো একটা সংকীর্ণ উপত্যকার উপর ভাসতে লাগল।
ওখানেই আছে ও। আরও কাছে অনুসন্ধান চালিয়ে ঘোড়া বেঁধে রাখার অলামত পেল। উইন্ডস্মোক রয়েছে ওদের সাথে, আছে ওয়ার্লউইন্ডও। ঘোড়াগুলোর ঠিক ওপাশে একটা গুহার সংকীর্ণ মুখ থেকে আগুনের আভা বের হচ্ছে। ইম্বালিকে পাশে নিয়ে প্রবেশপথে বসে আছে নাকোঁন্তো। আত্মাকে ভেতরে ভেসে যেতে দিল তাইতা।
ওই তো সে। একটা ছোট আগুনের পাশে মাদুরে শোয়া ফেনের অবয়ব খুঁজে বের করল ও। ওর এক পাশে শুয়ে আছে সিদুদু। সিদুদুর পাশে মেরেন, তারপর হিলতো। ফেনের এত কাছে রয়েছে তাইতা যে ওর নিঃশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছে। দেখল, হাতের কাছেই অস্ত্র ফেলে রেখেছে ও। দলের অন্য সদস্যরাও পুরোপুরি সশস্ত্র। চিত হয়ে শুয়েছে ফেন। পরনে কেবল একটা নেংটি, কোমর পর্যন্ত উন্মুক্ত। কোমল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল ও। শেষবার দেখার পর ওর শরীর আরও বেশি নারীসুলভ হয়ে উঠেছে। বাচ্চাদের চর্বির অবশেষ পেট থেকে মিলিয়ে গেছে। আগুনের নিচু শিখায় ওর শরীরের বাকও গহ্বরগুলো ছায়াময়, উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বিশ্রামরত অবস্থায় ওর চেহারা সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতির চেয়েও কমণীয়। বিস্ময়ের সাথে তাইতা বুঝতে পারল ওর বয়স এখন ষোল বছরের কম নয়। ওর সাথে বছরগুলো দ্রুত কেটে গেছে।
ওর নিঃশ্বাসের ধরণ পাল্টে গেল, ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল ও। অগ্নিকুণ্ডের আগুনের আলোয় সবুজ দেখাচ্ছে, তবে ওর উপস্থিতি টের পেতেই গাঢ় হয়ে উঠল। কনুইয়ের ভর দিয়ে উঠে বসল ও। তাইতা বুঝতে পারল ওকে আহ্বান জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে সে। মেঘ-বাগিচার অনেক কাছে রয়েছে ওরা। ফের পাহাড়ের বৈরী জিনিসের কাছে উপস্থিতি ফাঁস করে দেওয়ার আগেই ঠেকাতে হবে ওকে। ওর চোখের সামনে নিজের আত্মার প্রতীক ফুটে উঠতে দিল ও। তাই ওকে লক্ষ করছে বুঝতে পারতেই চমকে সোজা হয়ে বসল ও। প্রতাঁকের দিকে তাকিয়ে রইল সে। ওকে চুপ থাকার নির্দেশ দিল তাইতা। হেসে মাথা দোলাল ফেন।
