ভ্রূণ অপসারণের পর দাতার বেঁচে থাকার সম্বাবনা যেহেতু ক্ষীণ, তাই তাকে সাথে সাথে মেরে ফেলতে হবে। চিকিৎসককে অবশ্যই নাহক ভোগান্তি এড়াতে হবে। সবচেয়ে পছন্দনীয় পদ্ধতি দাতাকে বেঁধে রাখা। হাত পা বেঁধে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে রাখতে হবে যাতে সে অন্যদের আতঙ্কিত করে তুলতে না পারে। তারপর সামনের দিকে পেট চিরে অতিদ্রুত জ্বণ অপসারণ করতে হবে। কাজটা শেষ হওয়ামাত্র দাতাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলতে হবে। যতক্ষণ হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ না হচ্ছে ও শরীর শীতল না হচ্ছে ততক্ষণ দড়ি পেঁচিয়ে রাখতে হবে।
.
দ্রুত ভ্রূণ শিরোনামের পরের অধ্যায়ে চলে এলো তাই। এত দ্রুত হৃৎস্পন্দন হচ্ছে যে নিজের কানে অনুরণন শুনতে পাচ্ছে ও।
.
ভ্রূণের লিঙ্গের বিষয়টি গুরুত্বহীন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যদিও তা গ্রহীতার মতো একই লিঙ্গের হওয়াটাই যৌক্তিক ও কাঙ্ক্ষিত। জ্বণ অবশ্যই স্বাস্থ্যবান ও সুগঠিত হতে হবে, তাতে কোনও লক্ষণীয় খুঁত বা বিকৃতি থাকতে পারবে না। এই মানদণ্ডের সাথে খাপ না খেলে ফেলে দিতে হবে। এইসব কারণে সব সময় একাধিক দাতাকে হাতের কাছে পাওয়ার ব্যবস্থা রাখাই কাক্ষিত। রোপনের এলাকা বিস্তৃত হলে অন্তত পক্ষে তিনজন দাতা প্রস্তুত রাখতে হবে। তবে সবেচেয়ে বেশি কাক্ষিত সংখ্যা পাঁচ।
.
পেছনে হেলান দিল তাইতা। তিনজন দাতা। ওদের প্রথম আগমনের দিন সকালে জলপ্রপাতের কাছে তিনজন মেয়ে দেখার কথা মনে পড়ে গেল ওর। মেরেনের জন্যে নতুন চোখের ব্যবস্থা করতে ওদের বলীর পাঁঠা হিসাবে নিয়ে আসা হয়েছে। পাঁচ জন দাতা। পথে ওনকার সাথে দেখা হলে তার কাছে পাঁচজন মেয়ে পাহাড়ে আনার কথা শুনেছে, মনে পড়ে গেল। ওদের সবাই কি অনুমোদিত কৌশলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে? রাতে কি তবে ওদেরই কারও কান্নার আওয়াজ শুনেছে। ও? নিজের আর পেটের বাচ্চার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে জেনে ফেলেছিল সে? সেজন্যেই কাঁদছিল? টেবিল থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল ও। ঝড়ের মতো দালান ছেড়ে বনে চলে এলো। গাছপালার আড়ালে এসে উবু হয়ে আপন গ্লানি আর অপরাধ বোধে বমি করে দিল। একটা গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে টিউনিকের নিচের স্ফীত অংশের দিকে তাকিয়ে রইল।
এটার জন্যেই কি নিষ্পাপ মানুষগুলোকে মরতে হয়েছে? কোমরের খাপ থেকে ছোট ছুরিটা বের করে আনল ও। কেটে হান্নাহর গলায় ঠেসে দেব। দম বন্ধ করে মারব তাকে! ক্রোধে ফুঁসে উঠল ও। বিষাক্ত উপহার এটা, আমার জন্যে কেবল অপরাধবোধ আর কষ্ট ডেকে এনেছে।
এত জোরে ওর হাত কাঁপতে শুরু লাগল যে আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে গেল ছুরিটা। দুই হাতে মুখ ঢাকল ও। ওটাকে ঘৃণা করি নিজেকে ঘৃণা করি! ফিসফিস করে বলল ও। ভীষণ সহিংস ও বিভ্রান্তিকর সব ছবি ফুটে উঠছে মনের পর্দায়। সেই একই হ্রদে কুমীরদের উন্মত্ত ভোজ উৎসব দেখার কথা মনে পড়ছে। মেয়েদের বিলাপ, শিশুদের কান্নার আওয়াজ শুনেছে ও। দুঃখ ও হতাশার শব্দ।
অবশেষে বিভ্রান্তি কেটে গেল, আবার মোহন্ত দিমিতারের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল ও। ইয়োস মিথ্যার স্যাঙ্গাৎ। প্রতারণা, ক্ষমতা দখলকারী, ধোঁকাবাজ, চোর ও শিশুখাদকের অন্য নাম।
শিশু খাদক, পুনরাবৃত্তি করল ও। সেই এইসব নৃশংসতার হুকুম দেয়। অবশ্যই তার দিকেই আমার ঘৃণাকে চালিত করতে হবে। কেবল তাকেই সত্যিকার অর্থে ঘৃণা করি আমি। তাকে ধ্বংস করতেই এখানে এসেছি। হয়তো এই জিনিসটা রোপনের ভেতর দিয়ে নিজের অজান্তেই আমার হাতে নিজের ধ্বংসের হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। চোখ থেকে হাত নামাল ও। তাকিয়ে রইল ওগুলোর দিকে। এখন কাঁপছে না।
তোমার সাহস এক করে মনস্থির করো, গালালার তাইতা, ফিসফিস করে বলল ও।খোঁচাখুঁচির পর্ব শেষ। আসল যুদ্ধ শুরু হলো বলে।
ডাক্তার রেই-এর স্ক্রোলটা নিতে বন থেকে বের হয়ে আবার লাইব্রেরিতে ফিরে এলো ও; জানে ওটা পড়ে প্রত্যেকটা বিষয় বিস্তারিত মনে রাখতে হবে। জানতেই হবে কীভাবে ওরা বিষাক্ত বীজ সৃষ্টি করতে ছোট ছোট বাচ্চাদের কাটাছেঁড়া করে। শিশুদের আত্মাহুতি যেন নিষ্ফল না হয়, নিশ্চিত করতে হবে। স্ক্রোলটা যেখানে রেখে গিয়েছিল সেই টেবিলে ফিরে এলো ও, কিন্তু ওটা উধাও হয়ে গেছে।
*
ও যখন স্যানেটোরিয়ামে নিজের কামরায় পৌঁছাল ততক্ষণে সূর্য জ্বালামুখের দেয়ালের ওপাশে বিদায় নিয়েছে। ভৃত্যরা তেলের কুপি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। তামার অগ্নিকুণ্ডে উত্তপ্ত অঙ্গারের উপর গরম হচ্ছে ওর সন্ধ্যার খাবার। কোনওমতে খাওয়া শেষ করে ডাক্তার আসেমের উদ্ভাবিত এক বাটি কফি বানিয়ে খেল। তারপর মাদুরে আসন পেতে বসে ধ্যানের জন্যে তৈরি করে নিল নিজেকে। এটা ওর রাতের নিয়মিত রুটিন। পিপহোলের চোখ রাখা পাহারাদার এতে তাই সন্দেহজনক কিছু পেল না। শেষে তেলের কুপি নিভিয়ে দিল ও। অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল কামরাটা। অল্পক্ষণ বাদেই পিপহোলের পেছনের লোকটা রাতের মতো তার অবস্থান থেকে বিদায় নিলে আভা মিলিয়ে গেল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল তাইতা, তারপর সলতে এমনভাবে কমাল যাতে সামান্য আভা অবশিষ্ট থাকে। মাদুলিটা হাতের মুঠোয় ধরে ফেনে পরিণত হওয়া লক্ট্রিসের মানসিক প্রতিমূর্তির কথা ভাবতে লাগল। লকেট খুলে ওর নতুন আর পুরোনো চুলের গোছা বের করল। লস্ত্রিসের প্রতি ভালোবাসাই ওর মূল প্রতিরক্ষা, এর উপরই নির্ভর করছে ইয়োসের বিরুদ্ধে ওর শক্তি। কোঁকড়া চুল মুখের কাছে ধরে নিজের ভালোবাসা নিশ্চিত করল ও।
