লাইব্রেরির পরিবেশ নিরিবিলি, পড়ার উপযোগি। লাগোয়া কামরাগুলোয় গ্রাহকরা কাজের টেবিলে বসে থাকলেও এই কামরাটা একাকী ব্যবহারের জন্যে পেয়েছে ও। যেন বাকিদের ওর সাথে সম্মানসূচক দূরত্ব বজায় রাখতে বলে দেওয়া হয়েছে। মাঝেসাঝে লাইব্রেরিয়ানরা এই কামরা হয়ে ঝুড়িতে করে তাকে তুলে রাখতে স্ক্রোল নিয়ে যায়। ওদের দিকে তেমন একটা খেয়াল করছে না তাই। নিষিদ্ধ কামরা খোলার গ্রিল টানার আওয়াজ পেল ও, চোখ তুলে দেখল অনাকর্ষণীয় চেহারার মাঝবয়সী এক মহিলা ভোলা দরজা পথে ভেতরে ঢুকছে। কিছুই না ভেবে আবার পড়ায় মন দিল ও। কিছুক্ষণ বাদে সেই একই মহিলা বের হয়ে দরজায় তালা দিল। কামরা বরাবর নীরবে এগিয়ে যাবার সময় অপ্রত্যাশিতভাবে তাইতার টেবিলের পাশে থামল। জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ও। টেবিলের উপর একটা স্ক্রোল নামিয়ে রাখল সে। তোমার মনে হয় ভুল হয়েছে, তাকে বলল তাইতা। এটার কথা তোমাকে বলিনি আমি।
বলা উচিত ছিল, মহিলা এত কোমল কণ্ঠে কথাটা বলল যে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ও। ডান হাতের কানিষ্ঠা আঙুল বাড়িয়ে নিচের ঠোঁট স্পর্শ করল সে।
চমকে উঠল তাইতা। এটা তিনাতের দেখানো শনাক্তকরণ সঙ্কেত। এই মহিলা তার লোক। স্ক্রোলটা টেবিলে রেখে আর কোনও কথা না বলে হাঁটা শুরু করল মহিলা। ওকে ডাকতে চাইল তাইতা, কিন্তু নিজেকে বিরত রাখল। তাকিয়ে রইল ওর গমন পথের দিকে। একা আছে, কেউ লক্ষ করছে না নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিজের স্ক্রোলটা পড়ে চলল ও। তারপর ওটা গুটিয়ে এক পাশে ঠেলে তার জায়গায় লাইব্রেরিয়ানের রাখা স্ক্রোল খুলল। শিরোনামহীন, লেখকের নাম দেখা যাচ্ছে না। অস্বাভাবিক ছোট ও শৈল্পিক হিয়েরোগ্লাফিক হরফগুলো কার হাতের চিনতে পারল ও।
ডাক্তার রেই, ফিসফিস করে বলল ও। তারপর দ্রুত পড়তে শুরু করল। ওর পাঠ্য বিষয় বীজ বপন ও রোপন করে মানব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন। প্যাপিরাসের পাতার উপরে নিচে চোখ বুলিয়ে চলল ও। রেইর লেখা সমস্ত কিছুর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ও। বিষয়বস্তু সম্পর্কে তার বর্ণনা আকর্ষণীয়ভাবে বিশদ, সাবলীল; তবে স্ক্রোলের মাঝামাঝি যাওয়ার আগে বলতে গেলে নতুন কিছুই পেল না ও। তারপর ব্যাখ্যা করতে শুরু করল যে কীভাবে বীজ বোনার কাজটি সফল করে ক্ষতস্থানে সেটাকে রোপনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। অধ্যায়ের নাম রাখা হয়েছে: বীজ নির্বাচন ও চাষ। চোখ চালানোর সময় মহিলার এত ঠাণ্ডাভাবে এমন বিশাল বিষয় বর্ণনার ব্যাপারটা ওর উপর যেন হিমবাহের মতো নেমে এলো। প্রবল ধাক্কায় মন অসাড় হয়ে গেল ওর। অধ্যায়ের সূচনায় ফিরে আবার পড়ল; এইবার ধীরে ধীরে; যৌক্তিক বিশ্বাসের অতীত অংশগুলো বারবার পড়ল।
.
দাতাকে তরুণ ও স্বাস্থ্যবান হতে হবে। তাকে অবশ্যই পাঁচটি ঋতুকাল পার করতে হবে। তার কিংবা তার পরিবারের কারও মারাত্মক কোনও অসুখের ইতিহাস থাকতে পারবে না। তার চেহারা হতে হবে প্রীতিকর। পরিচালনার সুবিধার জন্যে তাকে অনুগত ও বাধ্য হতে হবে। এই দিক দিয়ে কোনও সমস্যার মুখোমুখি হলে শান্ত করার ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। খুবই যত্নের সাথে তার প্রয়োগ করতে হবে যাতে মুল লক্ষ্য বিচ্যুত না হয়ে পড়ে। এই অভিসন্দর্ভের শেষাংশে নির্ঘণ্ট অংশে সুপারিশকৃত কিছু ওষুধের তালিকা দেওয়া হয়েছে। খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। লাল মাংস ও দুধের তৈরি খাবার হতে হবে ন্যূনতম, কারণ তাতে রক্ত তেতে ওঠে।
.
এই ধারায় আরও লেখা রয়েছে। এবার পরের অধ্যায় চলে এলো ও, স্রেফ প্রজনন শিরোনাম দেওয়া।
.
দাতার মতো গ্রহীতাকেও তরুণ ও স্বাস্থ্যবান হতে হবে। কোনও রকম খুঁত বা ত্রুটি থাকতে পারবে না। বর্তমান ব্যবস্থায় তাদের সাধারণভাবে রাষ্ট্রের প্রতি কোনও ধরনের সেবার বিনিময়ে পুরস্কার হিসাবে নির্বাচন করা হয়। অনেক সময় সামরিক ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্যে। দাতার সাথে কোনও রকম আবেগজাত সম্পর্ক স্থাপন এড়াতে বিশেষ যত্নবান থাকতে হবে। সংক্ষিপ্ত বিরতিতে তাদের পরিবর্তন করতে হবে। দাতার অন্তসত্তা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ামাত্র তার সাথে নিষিক্তকারীর পরবর্তী সব যোগোযোগ নিষিদ্ধ করতে হবে।
.
ফাঁকা দৃষ্টিতে ওর ঠিক সামনে রাখা ফলকের তাকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল ও। ছোট সিদুদুর ভীষণ আতঙ্কের কথা মনে পড়ে গেল। করুণ আবেদনের কথা হুবহু মনে আছে ওর: দয়া করুন, ম্যাগাস! আপনাকে মিনতি করছি! দয়া করুন! আমাকে বাঁচান! বাচ্চাটাকে নষ্ট না করলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। ওনকার জারজ সন্তানের জন্যে আমি মরতে চাই না!
পলাতক সিদুদু দাতাদের একজন। স্ত্রী বা মা নয়, বরং দাতা। ওনকা ছিল তার একজন নিষিক্তকারী। স্বামী, বন্ধু বা সঙ্গী নয়। নিষিক্তকারী। ক্রমে বেড়ে উঠল তাইতার আতঙ্ক। কিন্তু নিজের উপর জোর খাঁটিয়ে পড়ে চলল ও। পরের অধ্যায়ের নাম দেওয়া হয়েছে ফসল তোলা। কয়েকটা বিষয় যেন পাতা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে এলো ওর কাছে।
.
অন্তসত্তাকালীন সময়ের বার থেকে চব্বিশতম সপ্তাহের ভেতর অবশ্যই ফসল তুলতে হবে।
জরায়ু থেকে জ্বণকে অবশ্যই অক্ষত ও পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে আনতে হবে। বীজের মানের জন্যে ক্ষতিকর প্রমাণিত হওয়ায় অবশ্যই স্বাভাবিক জন্ম প্রতিরোধ করতে হবে।
