একপাল কুকুরসহ শিকারীর মতো, সহসা সশব্দ হাসির সাথে মন্তব্য করলেন দিমিতার। সাবধান, তাইতা, আমরা যেন ষাঁড়ের খোঁজ করতে গিয়ে মানুষখেকো সিংহীকে চমকে না দিই।
আপনার স্মৃতি এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত যে ইয়োসের খোঁজ করার মানে বিশাল সাগরের বিস্তারে বিশেষ একটা হাঙর খোঁজার মতো। আমাদের হয়তো তার স্মৃতির খোঁজ পেতে আরেকটা জীবন কাটিয়ে দিতে হতে পারে।
আমাকে সরাসরি ওর কাছে নিয়ে যেতে হবে, বিনা দ্বিধায় বললেন দিমিতার।
আপনার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভয় পাচ্ছি আমি, এমনকি আপনার জীবনাশঙ্কাও দেখা দিতে পারে, মন্তব্য করল তাইতা।
কাল ফের কুকুরের পাল পাঠাব আমরা? এবার কিন্তু সিংহীর গন্ধ শুকিয়ে দিতে হবে ওদের।
রাতের বাকি সময়টুকু নীরব রইল ওরা। যার যার ভাবনা ও স্মৃতিতে বিভোর। ভোরের প্রথম আলো ফুটে উঠলে এক ছোট উপকূলে পৌঁছাল ওরা। খেজুর বাগানে। যাত্রা বিরতির ঘোষণা দিল তাইতা। পশুগুলোকে দানা-পানি খাওয়ানো হলো, এই অবসরে তাবু খাটানো হলো। তাইতা জানতে চাইল, দিমিতার, আবার চেষ্টা চালানোর আগে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিতে চান? নাকি এখনই শুরু করতে তৈরি আছেন?
সারা রাত বিশ্রাম নিয়েছি। আমি তৈরি।
ওর চেহারা পরখ করল তাইতা। ওকে দেখে শান্ত মনে হচ্ছে, স্লান চোখজোড়া প্রশান্ত। লস্ত্রিসের তাবিজ উঁচু করে ধরল তাইতা। চোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে। চোখ বন্ধ করুন। অনেক শান্তি ও নিরাপদ বোধ করছেন আপনি। আপনার শরীর ভারি হয়ে এসেছে। আরাম বোধ করছেন। আমার কথা শুনুন। ঘুমের ধেয়ে আসা টের পাচ্ছেন…আশীর্বাদের ঘুম…গভীর, উপশমকারী ঘুম…
প্রথম প্রয়াসের চেয়ে ঢের দ্রুত ঘুমে তলিয়ে গেলেন দিমিতার: তাইতার কোমল পরামর্শের কাছে ক্রমবর্ধমানহারে বশ মানছেন।
আগুন আর ধোঁয়া উগড়ানো একটা পাহাড় রয়েছে। দেখতে পাচ্ছেন?
মুহূর্তের জন্যে মড়ার মতো নীরব রইলেন দিমিতার। ঠোঁটজোড়া ফ্যাকাশে হয়ে গেল তার, কাঁপতে লাগল। তারপরই ভীষণভাবে মাথা নাড়লেন। কোনও পাহাড় নেই! পাহাড় বলে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না! চড়া হয়ে ভেঙে গেল ওর। কণ্ঠস্বর।
পাহাড়ের চূড়ায় এক মহিলা আছে, লেগে রইল তাইতা, সুন্দরী। দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরী নারী। দেখতে পাচ্ছেন, দিমিতার?
কুকুরের মতো হাঁপাতে শুরু করলেন দিমিতার, হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তাঁর বুক। তাইতার মনে হলো ওকে হারাতে বসেছে ও। ঘোরের বিরুদ্ধে লড়ছেন দিমিতার, বের হয়ে আসার চেষ্টা করছেন। ও জানে এটাই ওদের শেষ চেষ্টা, আবার চেষ্টা করতে গেলে বুড়ো মানুষটা আর নাও বাঁচতে পারেন।
ওর কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছেন, দিমিতার? মিষ্টি সুরেলা কথা শুনুন। কী বলছে সে আপনাকে?
এবার অদৃশ্য কোনও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলেন দিমিতার, তক্তপোষের উপর গড়াগড়ি যাচ্ছেন। পাগলের মতো বিড়বিড় করছেন তিনি। হাঁটু আর কনুই একসাথে করে বুকের কাছে এনে বলের মতো হয়ে গেছেন। পরক্ষণেই হাত-পা সোজা করে ফেললেন তিনি, বাঁকা হয়ে গেল পিঠটা। পাগলের মতো বকবক করছেন। প্রলাপ বকছেন, হাসছেন। দাতে দাঁত চেপে ধরলেন এবার, এক সময় মাঢ়ীর একটা দাঁত ভেঙে পড়ল। রক্ত আর লালার মিশেলের সাথে ওটা ছুঁড়ে ফেললেন।
শান্ত হোন, দিমিতার! ভয়ে ভয়ে উঠল তাইতার মন, যেন পাত্র ভরা পানি উতড়ানোর উপক্রম হয়েছে। স্থির হোন! নিরাপদে আছেন আপনি।
সহজ হয়ে এলো দিমিতারের শ্বাসপ্রশ্বাস, তারপরই তাইতাকে অবাক করে কুশলী সাধুর মতো প্রাচীন ভাষায় কথা বলে উঠলেন। কথাগুলো অচেনা, কিন্তু বলার ঢঙ আরও বেশি অচেনা। এখন আর বয়স্ক কারও মতো নয় ওর কণ্ঠস্বর, বরং তরুণীর মতো মিষ্টি, সুরেলা; এমন সুরেলা কণ্ঠ কখনও শোনেনি তাইতা।
আগুন, হাওয়া, জল ও মাটি, কিন্তু আগুনই এসবের প্রভু। প্রতিটি যন্ত্রণাদায়ী ওঠানামা তাইতার মনে খোদাই হয়ে যাচ্ছে। জানে এই শব্দ কোনওদিন মুছতে পারবে না ও।
আবার তক্তপোষের উপর লুটিয়ে পড়লেন দিমিতার। শরীরের আড়ষ্টতা বিদায় নিল। চোখজোড়া কেঁপে উঠে বন্ধ হয়ে গেল। স্থির হলো শ্বাসপ্রশ্বাস। সহজ হয়ে এলো বুকের প্রবল ওঠানামা। ওর হৃৎপিণ্ড বিস্ফোরিত হয়ে গেছে ভেবে ভয় হলো তাইতার। কিন্তু পাঁজরে কান পেতে চাপা অথচ ছন্দোময় কম্পনের শব্দ শুনে প্রবল স্বস্তির সাথে বুঝতে পারল এযাত্রা রক্ষা পেয়েছেন দিমিতার।
দিনের বাকি সময়টুকু ওকে ঘুমাতে দিল তাইতা। দিমিতার যখন জেগে উঠলেন, মনে হলো বিপদ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আসলেই কী ঘটেছে তার কোনও উল্লেখই করলেন না তিনি। মনে হলো যেন কোনও স্মৃতিই অবশিষ্ট নেই তার মনে।
ছাগলের দুধের স্যুপ খাওয়ার সময় কাফেলার দৈনন্দিন কাজকর্ম নিয়ে আলাপ করল ওরা। গালালা থেকে কতটা পথ দূরে এসেছে ও ফারাও নেফার সেতির অনন্য সাধারণ প্রাসাদে যেত আর কতটা পথ বাকি আছে আন্দাজ করার প্রয়াস পেল। আগেভাগেই ওদের আগমনের সংবাদ দিয়ে রাজার কাছে বার্তাবাহক পাঠিয়েছে তাইতা। তিনি কীভাবে ওদের অভ্যর্থনা জানাবেন বোঝার প্রয়াস পেল।
একমাত্র সত্যিকারের আলো আহুরা মাযদার কাছে প্রার্থনা করুন, হতভাগ্য আক্রান্ত এই দেশে যেন আর নতুন কোনও প্লেগ না আসে, বলে চুপ করে গেলেন দিমিতার।
আগুন, হাওয়া, জল ও মাটি… কথোপকথনের সুরে বলে উঠল তাইতা।
