আপনি পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত অলিগার্করা আপনাকে এখানে রাখতে বলেছে। তবে, আপনার দিনগুলো নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। সময় কাটাতে সাহায্য করার মতো একটা জিনিস দেখাচ্ছি আপনাকে। ওকে স্যানেটোরিয়ামের লাইব্রেরিতে নিয়ে গেল সে। মূল কমপ্লেক্স থেকে বেশ খানিকটা দূরে ওটা। বড়সড় একটা দালান, পরস্পর লাগোয়া অসংখ্য কামরার সমষ্টি। চার দেয়ালের প্রত্যেকটায় একটা করে শেল্ফ একেবারে ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। প্যাপিরাসের স্কুল ও মাটির ফলকে ঠাসা।
আমাদের শেল্ফে বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণার হাজারেরও বেশি লেখা রয়েছে, সগর্বে বলল হান্নাহ। বেশির ভাগই অনন্য, এগুলোর অন্যকোনও অনুলিপি নেই। অর্ধেক পড়ে শেষ করতেও স্বাভাবিক আয়ু লেগে যাবে। ধীর পায়ে কামরায় হেঁটে বেড়াতে লাগল তাইতা, চলার পথে হয়তো একটা স্কুল বা মটির ফলক তুলে নিচ্ছে, বিষয় বস্তুতে চোখ বোলাচ্ছে। মূল কামরার দরজা একটা ভারি ব্রোঞ্জের অর্গল দিয়ে আটকানো। তীর্যক দৃষ্টিতে হান্নাহর দিকে তাকাল ও।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মাই লর্ড, ওই বিশেষ কামরায় প্রবেশাধিকার ও ওখানে রাখা সমস্ত সংস্করণের অধিকার কেবল গিল্ডের সদস্যদের জন্যে তুলে রাখা, বলল সে।
বুঝতে পারছি, ওকে আশ্বস্ত করল তাইতা, তারপর যেসব ঘর পার হয়ে এসেছে পেছন ফিরে সেগুলোর দিকে তাকাল। এটাই নির্ঘাৎ সভ্য মানুষের সংগ্রহ করা জ্ঞানের সবচেয়ে মূল্যবান ভাণ্ডার।
আপনার ধারণার সাথে আমি একমত, মাই লর্ড। এখানে আপনাকে মুগ্ধ কার মতো অনেক কিছুই পাবেন। এসব আপনার মনকে চাঙা করে তুলবে, এমনকি হয়তো দার্শনিক চিন্তাভাবনার নতুন পথও খুলে দিতে পারে।
নিশ্চিতভাবেই সুযোগটা কাজে লাগাব আমি। পরে সপ্তাহগুলোয় ঘন্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে কাটাল তাই। কেবল উঁচু ছাদ গলে নেমে আসা আলো পড়ার পক্ষে বেশি ক্ষীণ হয়ে এলেই মূল ভবনের নিজের কোয়ার্টারের পথ ধরে।
একদিন সকালে নাশতা শেষ হলে দরজার বাইরে এক আগন্তুক ওর সাথে দেখা করতে অপেক্ষায় আছে জানতে পেরে যুগপৎ বিস্মিত ও বিরক্ত হলো ও।কে তুমি? অধৈর্য সুরে জানতে চাইল। লাইব্রেরিতে গিয়ে মহাজাগতিক ভ্রমণ ও যোগাযোগের উপর লেখা স্ক্রোলটা পড়তে অধীর হয়ে ছিল ও। গত কয়েক দিনে ওর পূর্ণ মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে ওটা।
ডাক্তার হান্নাহর হুকুমে এসেছি আমি, ক্রমাগত প্রণাম করে আর সেঁতো হেসে বলল বেটে লোকটা। আপনার নাপিত।
তোমার সন্দেহাতীত নিপূণ সেবার কোনওই প্রয়োজন নেই আমার, চট করে বলল তাইতা, ওকে ঠেলে বের হয়ে যেতে চাইল।
ওর পথ আটকে দাঁড়াল নাপিত। দয়া করে শুনুন, মাই লর্ড। ডাক্তার হান্নাহ খুব জোর করেছেন। আপনি ফিরিয়ে দিলে আমার খুব সমস্যা হবে।
দ্বিধা করল তাইতা। যতদূর মনে করতে পারে নিজের চেহারা নিয়ে কখনওই তেমন একটা মাথা ঘামায়নি ও। বলতে গেলে প্রায় কোমর পর্যন্ত নেমে যাওয়া লম্বা চুল আর রূপালি দাড়িতে হাত চালাল ও। নিয়মিত ধুয়ে আঁচড়ালেও লাগামহীন অবিন্যস্তভাবে বেড়ে উঠতে দিয়েছে। সত্যি বলতে ডাক্তার রেইর কাছ থেকে গোপন উপহার হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত ওর কাছে একটা আয়নাও ছিল না। সন্দিহান চোখে নাপিতের দিকে তাকাল ও। আমার ধারণা, আলকেমিস্ট না হলে এই তুচ্ছ জিনিসকে কোনওভাবেই সোনায় পরিণত করতে পারবে না তুমি।
দয়া করে অন্তত চেষ্টা করে দেখতে দিন, মাই লর্ড। নইলে ডাক্তার হান্নাহ নাখোশ হবেন।
বেঁটে নাপিতের ভীতি হাস্যকর। নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর হান্নাহকে নিদারুণ ভয় পায়। ওর পক্ষে যতটা সম্ভব সৌজন্যের সাথে তাকে মেনে নিল তাইতা। বেশ, ঠিক আছে, কিন্তু জলদি।
ওকে টেরেসে নিয়ে গেল নাপিত। আগেই এখানে রোদে একটা টুল পেতে রেখেছিল সে। সরঞ্জাম হাতের কাছেই ছিল। প্রথম কয়েক মিনিট পেরুনোর পর তার কাজের কায়দা দারুণ আরামপ্রদ আবিষ্কার করল তাইতা। শিথিল হয়ে গেল ও। নাপিত চুল দাড়ি আঁচড়ে কাটার সময় লাইব্রেরিতে ওর অপেক্ষায় থাকা ফ্রোলের কথা ভাবতে লাগল তাইতা। আগের দিন পড়া বিভিন্ন অংশ মনে মনে উল্টেপাল্টে দেখল। আপনমনে সিদ্ধান্তে পৌঁছুল যে বিষয়বস্তু সম্পর্কে লেখকের জ্ঞান একেবারেই ভাসা ভাসা; সুযোগ পেলেই তাতে ওর নিজস্ব বাদ পড়া উপাদান যোগ করবে। তারপর ফেনের কথা ভাবতে শুরু করল ও। অনেক মনে পড়ছে ওকে। কেমন আছে ও, সিদুদুর কী হয়েছে, এসব ভাবল ও। রাস্তার পাথরে শরতের ঝরা পাতার মতো ঝরে চলা পাকা চুলদাড়ির দিকে নজরই নেই।
অবশেষে বেঁটে নাপিত মুখের সামনে একটা বিরাট আয়না ধরে চিন্তায় বাদ সাধল। আশা করি আমার কাজ আপনাকে খুশি করবে।
চোখ পিটপিট করল তাইতা। ধাতুর অমসৃণ সমতলের কারণে ওর প্রতিবিম্ব বিকৃত ও কাঁপতে লাগল; সহসা স্থির হয়ে এলো ওটা। যা দেখল তাতে রীতিমতো হতচকিত হয়ে গেল। ওর দিকে উদ্ধত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা চেহারাটা চিনতে রীতিমতো কষ্ট হলো। যতদূর মনে করতে পারে, তার চেয়ে ঢের বেশি তরুণ দেখাচ্ছে। নাপিত ওর চুল কাঁধ পর্যন্ত হেঁটে তারপর চামড়ার ফিতেয় মাথার পেছনে ঝুঁটি বেঁধে দিয়েছে। ওর দাড়ি হেঁটে চৌকো আকার দিয়েছে সে।
আপনার খুলির আকার খুবই ভালো, বলল নাপিত। ভুরু চওড়া আর ঘন। দার্শনিকের মাথা। যেভাবে পেছনে আপনার চুল আঁচড়ে দিয়েছি, সবচেয়ে ভালোভাবে আভিজাত্যটুকু ফুটে উঠেছে। আগে আপনার দাড়ি চোয়ালের শক্তি আড়াল করে রেখেছিল। ছোট করে ছাঁটায়, আমি যেভাবে করেছি, তাতে সেটা বেড়ে গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
