ছয়দিনের দিন ব্যথা বিদায় নিল, কিন্তু সাথে সাথে সে জায়গা দখল করে নিল প্রচণ্ড চুলকানি, যন্ত্রণাকে প্রতিরোধ করার চেয়েও অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াল সেটা। ড্রেসিং ছিঁড়ে নখ দিয়ে মাংসে আঁচড় বসাতে ইচ্ছা করে ওর। কেবল হান্নাহ ব্যান্ডেজ বদলাতে আসার সময়টুকুতেই সামান্য নিস্তার পায়। প্যাঁচানো ব্যান্ডেজ খুলে উষ্ণ ভেষজ মলম লাগানোর সময় শান্তি আর আরাম লাগে।
এতদিনে ওর তলপেট ঢেকে রাখা চল্টাটা কঠিন ও কালো হয়ে অ্যাযুর হ্রদের কুমীরের চামড়ার চেহারা পেয়েছে। শান্তির সময়গুলো খুবই সংক্ষিপ্ত। ডাক্তার হান্নাহ টাটকা লিনেনে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়ামাত্রই ফের পূর্ণ শক্তিতে শুরু হয় চুলকানি। প্রায় পাগল করে তোলে ওকে। এর কোনও শেষ নেই যেন। দিনের হিসাব গুলিয়ে ফেলল ও।
এক পর্যায়ে ওর কাছে এলো রেই। নার্স ওর চোয়াল হ করে রাখলে মাঢ়ী থেকে সেলাই খুলে নিল সে। ক্ষতস্থানের প্রবল যন্ত্রণার কারণে এর কথা ভুলেই গিয়েছিল ও। অবশ্য, ওগুলোর প্রত্যাহারের ফলে পাওয়া সামান্য স্বস্তি ওর অটলতা জোরাল করে তোলার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক ধরনের স্বস্তির জোয়ার বোধ করল ও, গুঙিয়ে উঠল। ব্যথা ও চুলকানি চলে গেছে। এরপরের নেমে আসা শান্তি এতটাই আশীর্বাদময় যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল ও, পুরো এক রাত এক দিন স্থায়ী হলো এই উপশমের ঘুম। আবার জেগে উঠল যখন, দেখল ওর মাদুরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে হান্নাহ। ও ঘুমে থাকা অবস্থায় ব্যান্ডেজ খুলে নিয়েছে। এতই ক্লান্ত ছিল ও, মহিলা কী করছে, টেরটিও পায়নি। ও মাথা তুলে তাকাতেই কর্তৃত্বপরায়ণ হাসি দিল সে।
ভালো হয়ে ওঠার সময়টাই সব সময় সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়, তবে এখানে তার কোনও চিহ্ন নেই। আপনার গায়ে জ্বর নেই। রোপিত বীজ গোটা এলাকায় মিশে গেছে। যন্ত্রণার সাগর পার হয়ে তীরে পৌঁছে গেছেন আপনি। বলল সে। আপনার ক্ষতস্থানের গভীরতা ও বিস্তৃতির বিচারে আপনার সাহস ও শক্তি ছিল নজীরবিহীন, যদিও আপনার কাছ থেকে এরচেয়ে কম কিছু আশা করিনি। এখন ক্যাথেটার খুলে নিতে পারব আমি।
সহজেই পিছলে বের হয়ে এলো তামার টিউবটা, আবারও আনন্দদায়ক হয়ে উঠল স্বস্তিটুকু। বিপদটা ওকে কতটা দুর্বল, পরিশ্রান্ত করে দিয়েছে বুঝতে পেরে অবাক হলো ও। হান্নাহ আর নার্সকে বসতে সাহায্য করতে হলো ওকে। নিজের শরীরের দিকে তাকাল ও। আগে থেকেই ছিপছিপে ছিল, কিন্তু এখন কঙ্কালসার অবস্থা হয়েছে ওর। মাংস যেন মিলিয়ে গেছে, পাঁজরের প্রতিটি হাড় মুখ বের করে আছে।
দেখুন, চল্টাটা উঠে আসতে শুরু করেছে, ওকে বলল হান্নাহ। দেখুন, কেমন করে কিনারা থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসছে। দেখুন, নিচে কেমন সেরে উঠছে। পুরোনো ও নতুন চামড়ার মিলনস্থলে আঙুল বোলাল সে। নিখুঁতভাবে মিশে গেছে দুটো। পুরোনো ত্বক অনেকটা ক্রিপে কাপড়ের মতো কুঁকড়ে আছে। বেরিয়ে থাকা এক চিলতে নতুন ত্বক পলিশ করা আইভরির মতো মসৃণ, দৃঢ়। ওটার উপর জেগে ওঠা সূক্ষ্ম জমিন ক্রমশঃ গাঢ় হয়ে উঠছে। নিচে নাভী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। চল্টার মাঝখানে একটা ফোকর, যেখান থেকে কপারের ক্যাথেটার খুলে নিয়েছে হান্নাহ। জায়গাটা ডাক্তার আসেমের আরেকটা পুরু মলমে ঢেকে দিয়েছে হান্নাহ।
নিচের নতুন টিস্যু নষ্ট না করেই চল্টা উঠে আসায় কাজ দেবে এই মলম, ব্যাখ্যা করল সে। আবার ব্যান্ডেজ করে দিতে লাগল।
তার কাজ শেষ হওয়ার আগেই ডাক্তার রেই এলো কামরায়, তাইতার মাথার কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর মুখে আঙুল ঢুকিয়ে দিল। কিছু ঘটছে এখানে? জিজ্ঞেস করল সে। আগের গুরুগম্ভীর, পেশাদারী হাবভাবের তুলনায় মেয়েটার আচরণ শিথিল, বন্ধুত্বসুলভ।
তার আঙুলের কারণে তাইতার কণ্ঠ চাপা পড়ে গেল। একটা কিছু বেড়ে ওঠা টের পাচ্ছি। মাঢ়ীর নিচে কঠিন কিছু রয়েছে। স্পর্শ করলে ব্যথা লাগছে।
দাঁত ওঠার ব্যথা, হেসে উঠল রেই। এখন দ্বিতীয় শৈশব পার করছেন আপনি, মাই লর্ড তাইতা। তাইতার মুখের ভেতর দিকে হাত চালিয়ে হেসে উঠল আবার। হ্যাঁ, আক্কেল দাঁতসহ পুরো সেট। কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা দেবে। তখন রস আর ব্রথ ছাড়াও শক্ত জিনিস চিবিয়ে খেতে পারবেন।
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ফিরে এলো রেই। পলিশ করা রূপার একটা আয়না নিয়ে এসেছে সাথে। ওটার তলটা এত মসৃণ যে তাইতার মুখের ফুটিয়ে তোলা প্রতিবিম্ব কিঞ্চিত বিকৃত দেখাল। যেন আরব সাগর থেকে আসা মুক্তোর মালা, তাই প্রথমবারের মতো সদ্য গজানো দাঁতের দিকে তাকালে বলল সে। সম্ভবত অনেক বছর আগে গজানো সেই প্রথম সারি দাঁতের চেয়ে অনেক বেশি সমান ও সুন্দর। যাওয়ার আগে সে বলল, আয়নাটা আমার তরফ থেকে উপহার হিসাবে গ্রহণ করুন। আমি নিশ্চিত অল্প দিনের মধ্যেই ওটা দিয়ে আরও অনেক কিছু দেখতে পাবেন।
তাইতার তলপেটের চল্টার শেষ টুকরোগুলো সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাওয়ার আগে আরও একবার চাঁদ পূর্ণতা পেল, ক্ষয়ে গেল। এখন স্বাভাবিক খাবার খাচ্ছে ও, হারিয়ে যাওয়া মাংস ফিরে পাচ্ছে। রোজ দীর্ঘ ছড়ির সাহায্যে নৈপূণ্য ও শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে গড়ে তোলা অনেকগুলো ব্যায়াম করে ও। একটা খাবারের ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে ডাক্তার আসেম যাতে প্রচুর পরিমাণ গুল্ম ও সজি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সবকিছুই বেশ উপকারী প্রমাণিত হচ্ছে। গালের চেপে যাওয়া অংশ ভরাট হয়ে উঠেছে, গায়ের রঙ এখন অনেক স্বাস্থ্যকর। ওর কাছে মনে হচ্ছে হারানো মাংসপেশীর জায়গায় নতুন জন্মানো পেশী অনেক বেশি দৃঢ় ও শক্তিশালী। অচিরেই ক্রাচ ছেড়ে থেমে বিশ্রাম ছাড়াই হ্রদের কিনারে হাঁটতে সক্ষম হয়ে উঠল ও। তবে ওকে একাকী স্যানিটোরিয়ামের বাইরে যেতে দেয় না হান্নাহ। পুরুষ নার্সদের একজন থাকে সাথে। শক্তি ফিরে পাওয়ার সাথে সাথে লাগাতার নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়া দারুণ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। ক্রমবর্ধমানহারে একঘেয়েমীতে ভুগতে শুরু করল ও, অস্থির বোধ করছে। হান্নাহকে জিজ্ঞেস করছে, কবে আমাকে সেল ছেড়ে বাইরে যেতে দেবে?
