ঠিক এই সময় টেবিলের পায়ের কাছে গিয়ে ওর দৃষ্টি রুদ্ধ করে দিল হান্নাহ। চিৎকার করে তাকে সরে যেতে বলতে চাইল ও, কিন্তু এখন ইয়োস সরাসরি চোখের সামনে না থাকায় ওর নিয়ন্ত্রণ ফিরে এলো। মূল্যবান আবিষ্কার এটা। ও জানতে পেরেছে, ইয়োসের দিকে তাকিয়ে থাকলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে সে। চোখ সরিয়ে নিলে আকর্ষণ, শক্তিশালী হলেও, অগ্রাহ্য করা যায়। চুপ করে ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল ও, ব্যথাটাকে এমন একটা পর্যায়ে উঠে আসতে দিল যাতে ওর মাঝে ইয়োসের জাগিয়ে তোলা পাশবিক লালসা প্রতিরোধ করা যায়। এখন উন্মুক্ত ক্ষতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে হান্নাহ, হাতের স্পর্শের দিকে মনোযোগ দিল ও, গায়ে লিনেনের টুকরো বিছানো টের পেল। কাজ শেষে ওর পাশে এসে দাঁড়াল হান্নাহ। দূর দেয়ালের দিকে তাকাল ও। কিন্তু ইয়োস চলে গেছে। কেবল তার মানসিক সত্তার ক্ষীণ আভাস রয়ে গেছে, মূল্যবান সুগন্ধির মতো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে যেন এক ধরনের ধাওয়াকারী মিষ্টিভাব।
টেবিলের মাথার কাছে হান্নাহর জায়গা দখল করল ডাক্তার রেই। ওর মুখ খুলে চোয়ালের মাঝখানে কাঠের গেঁজ বসিয়ে দিল। ওর প্রথম দাঁতের উপর ফোরসেপ বসানো টের পেয়ে উপড়ানোর চেষ্টার আগেই ব্যথা আড়াল করল ও। দ্রুততার সাথে দাঁতগুলো তুলে ফেলল দক্ষ রেই। তারপর উন্মুক্ত ক্ষতস্থানে বীজ বসানোর পর সেলাই করে মুখ বন্ধ করাও টের পেল।
*
তাইতাকে পাথরের টেবিল থেকে তুলে আস্তে করে হালকা খাটিয়ায় তুলে দিল দুই পুরুষ নার্স। ওকে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে যাবার সময় পাশে পাশে এগোল হান্নাহ। ওর ঘরে পৌঁছালে ওকে নিরাপদে খাটিয়া থেকে আবার মাদুরে নামানো তদারক করল। ওর আরাম ও যত্নের ব্যবস্থা করল।
অবশেষে ওর পাশে মেঝেয় হাঁটু গেড়ে বসল। দিনরাত সারাক্ষণ একজন নার্স থাকবে আপনার পাশে। আপনার অবস্থার সামান্য অবনতি টের পাওয়ামাত্র আমাকে খবর দিতে ছুটে যাবে ওরা। আপনার কিছু লাগলে ওদের জানালেই চলবে। রোজ সকাল-সন্ধ্যা ব্যান্ডেজ পাল্টে কত দূর অগ্রগতি হলো দেখতে আসব। ওকে বলল সে। সামনে কী অপেক্ষা করছে সেটা আপনাকে বলার কোনও প্রয়োজন দেখছি না। আপনার উত্তরসুবির চোখে বীজ বপনের সময় আপনি উপস্থিত ছিলেন। আপনিও ঘটনার ধারা জানেন-তিনদিন মোটামুটি যন্ত্রণাহীন কাটবে, ছয়দিনের যন্ত্রণা, অবশেষে দশম দিনে স্বস্তি। তবে কর্নেল ক্যাম্বিসেসের চেয়ে আপনার ক্ষত ঢের বড় বলে যন্ত্রণাও বেশি হবে। সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আপনার সব দক্ষতার দরকার হবে।
আরও একবার হান্নাহর পূর্বাভাস নির্ভুল প্রমাণিত হলো। প্রথম তিনটা দিন কেবল ছোটখাট অস্বস্তি নিয়ে কেটে গেল, পেটের গভীরে এক ধরনের ভেঁতা ব্যথা, জলত্যাগের সময় জ্বলন্ত অনুভূতি; মুখের ব্যথাটা আরও বেশি। মাটীতে রেইয়ের সেলাইগুলো জিভ দিয়ে স্পর্শ না করে থাকা কঠিন হয়ে উঠল। কঠিন খাবার খেতে পারছে না ও, স্রেফ হালকা ভর্তা করা সজির ব্রোথ খাচ্ছে। অনেক কষ্টে কোনওমতে হাঁটতে পারছে। একজোড়া ক্রাচের ব্যবস্থা করে দিয়েছে ওরা, কিন্তু রাতে নাইটসয়েল পট ব্যবহার করার প্রয়োজন হলে নার্সের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
হান্নাহ ড্রেসিং বদলাতে এলে তার কাজের সময় নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল একটা কোমল আঠাল একটা চল্টা ঢেকে রেখেছে ক্ষতস্থানটা। গাম-অ্যারাবিক গাছের বাকল কাটলে বা পুড়ে গেলে যেমন রস বের হয়ে আসে অনেকটা সেরকম লাগছে। ওটাকে না নাড়ানোর ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করছে হান্নাহ, লিনেনের ব্যান্ডেজের সাথে যাতে না লাগে তাই ডাক্তার অসেমের দেওয়া একটা পিচ্ছিল মলমে ঢেকে দিল ওটা।
চতুর্থ দিন সকালে এমন প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে জেগে উঠল যে ব্যথা দমন করতে মানসিক শক্তি কাজে লাগানোর আগেই নিজের অজান্তে যন্ত্রণায় তীব্র আর্তনাদ করে উঠল ও। নার্সরা ছুটে এলো, সাথে সাথে ডাক্তার হান্নাহকে খবর দিল। সে আসার আগেই সমস্ত শক্তি এক করে যন্ত্রণাকে এমন মাত্রায় নামিয়ে আনল ও, যার ফলে বুদ্ধি ঠিক রেখে কথা বলতে পারল।
এটা খারাপ, বলল হান্নাহ। কিন্তু এমনটা হবে জানতেন আপনি।
এমন অভিজ্ঞতা জীবনেও হয়নি। মনে হচ্ছিল যেন গলন্ত সীসা পেটে ঢেলে দেওয়া হয়েছে, ফিসিফিস করে বলল তাইতা।
ডাক্তার আসেমকে মলম লাগিয়ে দিতে ডেকে পাঠাতে পারি।
না, জবাব দিল তাইতা। একাই মানিয়ে নেব।
আরও ছয় দিন, ওকে সতর্ক করল সে। বেশিও হতে পারে।
বেঁচে থাকব। যন্ত্রণাটা ভয়াবহ, অবিরাম। ওর সমস্ত অস্তিত্ব ভরে তুলেছে। ব্যথাটা। ইয়োস বা ফেনের কথা ভাবতে পারছে না। কেবলই যন্ত্রণা। জেগে থাকার সময়টুকুতে সর্বাত্মক প্রয়াসে যন্ত্রণা চেপে রাখতে পারছে ও। কিন্তু যখনই ঘুম হারিয়ে দিচ্ছে, ওর প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ছে, পূর্ণ শক্তিতে ফিরে আসছে আবার। ফুঁপিয়ে জেগে উঠছে ও, ব্যথার তীব্রতায় গোঙাচ্ছে। ডাক্তার আসেমকে তলব করার প্রলোভনের কাছে পরাস্ত হতে ইচ্ছে করে ওর, যাতে মাদক নিয়ে আসে সে, কিন্তু সম্পূর্ণ মানসিক ও শারীরিক শক্তি দিয়ে সেটা ঠেকায়। ঘোরের ভেতর নিজেকে ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি বেদনার চেয়ে অনেক বেশি। ইয়োস আর মিথ্যার বিরুদ্ধে ওর দৃঢ় মনের জোরই একমাত্র অবলম্বন।
