তীক্ষ্ণ গন্ধঅলা তরলে তাইতার শরীরের নিমাংশ মুছে দিল দুই পুরুষ নার্স। সার্জনরাও একই তরলে কনুই অবধি হাত ধুলে নিল। তাইতার পাশে এসে দাঁড়াল ডাক্তার রেই। আগের দিন আঁকা তার নকশাগুলো মিলিয়ে গিয়ে কেবল আবছাভাবে ফুটে আছে। সেগুলো নতুন করে আঁকল সে। তারপর হান্নাহকে পথ করে দিতে সরে দাঁড়াল।
কাটাছেঁড়া শুরু করতে যাচ্ছি। লর্ড তাইতা, এবার দয়া করে ব্যথা সহ্য করার জন্যে নিজেকে স্থির করে নেবেন?
লস্ত্রিসের মাদুলি আঁকড়ে ধরল তাইতা, ওর নগ্ন বুকে পড়েছিল ওটা। এক ধরনের কোমল কুয়াশায় নিজের মন আচ্ছন্ন করে ফেলল ও, ওর উপর ঝুঁকে থাকা চেহারাগুলো মুছে গিয়ে এক সময় স্রেফ আবছা রেখায় পরিণত হলো।
অদ্ভুতভাবে ওর কানে অনুরণিত হয়ে চলল হান্নাহর কণ্ঠস্বর। মনে হচ্ছে যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে আপনি প্রস্তুত?
হ্যাঁ, প্রস্তুত। শুরু করতে পারো। হান্নাহ প্রথম ছুরি চালানোর সাথে সাথে এক ধরনের টানের অনভূতি বোধ করল ও। তবে অসহনীয় নয়। নিজেকে এমন একটা পর্যায়ে নামিয়ে আনল ও, যখন হান্নাহর স্পর্শ আর স্ক্যালপেলের কামড়ের কেবল আবছা অনুভূতি টের পেলো। সময় গড়িয়ে চলল। স্পর্শকাতর কোনও জায়গায় হান্নাহ কাজ করার সময় দুএকবার প্রবল হয়ে উঠল যন্ত্রণা। কিন্তু আরও গভীরে নেমে গেল তাইতা। ব্যথা কমলেই নিজেকে আবার ঠিক তলের নিচে তুলে আনছে, ওদের আলোচনা শুনছে, ফলে ওদের কাজের ধারা সম্পর্কে ধারণা করতে পারছে।
খুব ভালো, স্পষ্ট সন্তুষ্টির সাথে বলল হান্নাহ। ক্ষতিগ্রস্ত সব টিস্যু সরিয়ে ফেলেছি। এবার ক্যাথেটার ঢোকাব। শুনতে পাচ্ছেন, লর্ড তাইতা?
হ্যাঁ, ফিসফিস করে বলল তাইতা, কানে প্রতিধ্বনি তুলল ওর নিজেরই কণ্ঠস্বর।
যেমন আশা করেছিলাম তারচেয়ে ঢের ভালোই এগোচ্ছে সবকিছু। এবার নল বসাচ্ছি আমি।
ওটার শরীরে প্রবেশ টের পেল তাইতা, কিঞ্চিত অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি, গোপন করার দরকার মনে করল না ও।
এরই মধ্যে আপনার ব্লাডার থেকে টাটকা প্রস্রাব বের হতে শুরু করেছে, বলল হান্নাহ। সবকিছু তৈরি আছে। আপনি আরাম করতে পারেন। ল্যাবেরেটরি থেকে বীজ আসার অপেক্ষা করছি আমরা।
তারপর অনেকক্ষণ নীরবতা বজায় থাকল। নিজেকে আরও গভীর স্তরে নিয়ে গেল তাইতা, এখন কেবল পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন ও। নীরবতা অব্যাহত রইল। কিন্তু নিজের মাঝে কোনওরকম সতর্কতা বা তাগিদ টের পাচ্ছে না। তারপর ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর একটা অচেনা উপস্থিতি সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠল ও। একটা কণ্ঠস্বর কানে এলো, হান্নাহর কণ্ঠস্বর, জানা থাকলেও এখন ভিন্ন রকম শোনাচ্ছে: কোমল, ভয় বা অন্য কোনও জোরাল অনুভূতিতে কাঁপছে। এটাই আসল সত্তা, বলল সে।
নিজেকে ব্যথা সহ্য করার মতো একটা স্তরে তুলে আনল তাইতা। চোখের পাতা সামান্য খুলে চোখের পাতার ফাঁক দিয়ে দেখতে লাগল। নিজের শরীরের উপর হান্নাহর হাত দেখতে পাচ্ছে। একটা অ্যালাবাস্টার পট ধরে রেখেছে ওগুলো, মেরনের চোখের জন্যে বীজসহ ঠিক এই রকমই একটা পট দেখেছিল ও, তবে এটা তুলনামূলকভাবে বড়। ওর দৃষ্টিপথ থেকে নিচে নামিয়ে নিল ওটা হান্নাহ। অ্যালাবাস্টার পট থেকে হান্নাহ উপকরণ তোলার সময় চামচের সাথে কর্কশ সংঘর্ষের আওয়াজ পেল তাই। খানিক পরে কুঁচকির কাছে উন্মুক্ত জায়গায় শীতল অনুভূতি বোধ করল, বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার সময় হালকা ছোঁয়া পেল। তারপরই ভিন্ন কিছু ধরা পড়ল ওর আধখোলা চোখে।
প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল দূর দেয়ালের কাছে একটা অচেনা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশব্দে উপস্থিত হয়েছে ওটা, দীর্ঘ তবে মূর্তির মতো কাঠামো, আপাদমস্তক কোমল মসৃণ রেশমী পোশাকের আড়ালে রয়েছে সে। শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে মানুষটার বুকের ক্ষীণ ওঠানামাই একমাত্র নড়াচড়া। পর্দার নিচের দেহ উদ্ধতভাবে নারীসুলভ, নিখুঁত আকার ও গঠন।
এক ধরনের বিস্ময় আর ভয়ের অপ্রতিরোধ্য বোধে আক্রান্ত হলো তাই। অন্তর্চক্ষু খুলে দেখতে পেল পর্দার আড়ালের অবয়বের কোনও আভা নেই। ওটা ইয়োস, নিশ্চিত হয়ে গেল ও, কোনও ছায়াময় প্রকাশ নয়, বরং খোদ ইয়োস, যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছে ও।
উঠে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে ইচ্ছা হলেও ঘোর থেকে পূর্ণ সজাগ হয়ে ওঠার চেষ্টা করার পরপরই ব্যথা প্রবল হয়ে উঠে ওকে ফেরত পাঠাল। কথা বলতে চাইল ও, কিন্তু জিভ দিয়ে কোনও আওয়াজই বের হলো না। কেবল তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছে ও। তারপর কপালের পাশে একেবারে কোমল একটা অনুভূতি হলো, আঙুল বোলানোর মতো। ওটা হান্নাহর হাত নয়, জানে। মনের ভেতর প্রবেশ করে ওর ভাবনা জানার চেষ্টা করছে ইয়োস। চট করে মানসিক বাধা তুলে তাকে হতাশ করল ও। কোমল স্পর্শ মিলিয়ে গেল। ওর বাধা টের পেয়েছে ইয়োস, দক্ষ তলোয়ারবিদের মতো জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। বদলা নিতে সে তৈরি, কল্পনা করল ও। ওর প্রতিরক্ষার প্রথম জটিল স্বাদ পেয়েছে সে। বুঝতে পারছে ইয়োসের উপস্থিতিতে ভীত ও শঙ্কিত হওয়া উচিত, তার শয়তানি, অশুভের বিরাট ওজনের কারণে বিতৃষ্ণা বোধ করা উচিত। কিন্তু তার বদলে জোরাল অস্বাভাবিক আকর্ষণ বোধ করছে। দিমিতার ওকে এই সৌন্দর্য আর তার দিকে চোখ ফেরানো সকল পুরুষের উপর তার প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিল। নিজের প্রতিরক্ষা শক্ত রাখার চেষ্টা করল ও। কিন্তু তারপরও বুঝতে পারল তার সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করতে চাইছে ও।
