তোমার সাথে আমি একমত, ডাক্তার রেই। জ্ঞান আর বিদ্যাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সারা দুনিয়ার সমস্ত সোনা-রূপার চেয়েও দামী, বলল ডাক্তার আসেম। আমাদের বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তি প্রয়োগ ও মনে করার ক্ষমতা আমাদের অন্যান্য পশুর চেয়ে উন্নত করে তুলেছে, যাদের এইসব গুণের ঘাটতি রয়েছে তাদের সবার চেয়ে উপরে তুলে দিয়েছে। আপনার কী মত, লর্ড তাই?
এখানে কোনও স্পষ্ট বা নিশ্চিত সমাধান নেই, সাবধানে জবাব দিল তাইতা। আমরা এনিয়ে অন্তহীনভাবে তর্ক করে যেতে পারি। তবে আমি বিশ্বাস করি, সবার জন্যে যা ভালো তাকে অবশ্যই টিকিয়ে রাখতে হবে। তাতে ঠাণ্ডা মাথায় বিসর্জনের প্রয়োজন হলেও। যুদ্ধে আমি লোকজনকে নেতৃত্ব দিয়েছি। আমি জানি ওদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতখানি তিক্ত হতে পারে। কিন্তু মুক্তি বা কল্যাণের প্রশ্নে ওদের নির্দেশ দিতে দ্বিধা করিনি। ও কি বিশ্বাস করে সেটা নয়, ওরা যা শুনতে চাইছে সেটাই বলছে ও। মনোযোগ দিয়ে শুনছিল ওরা, শিথিল হলো; ওর প্রতি ওদের দৃষ্টিভঙ্গি যেন আরও পরিষ্কার ও উন্মুক্ত হয়ে উঠল। যেন পরিচয় পত্র দেখানোয় ওরা বাধা সরিয়ে ওকে নিজেদের দলে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
ভালো খাবার ও মদ থাকা সত্ত্বেও বেশিক্ষণ বসল না ওরা। সবার আগে উঠে দাঁড়াল গিব্বা। কাল অনেক সকালে উঠতে হবে আমাদের, ওদের মনে করিয়ে দিল সে, হান্নাহকে ধন্যবাদ জানাতে উঠে দাঁড়াল সবাই। তারপর বিদায় নিল।
তাইতাকে বিদায় দেওয়ার আগে সে বলল, ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কারণ কাল সকালে ওরাই আমাকে সাহায্য করবে। আপনার উত্তরসুরির চেয়ে আপনার ক্ষত অনেক গভীর, ব্যাপক; সবচেয়ে বড় কথা, অনেক বছর কাজ করে ওরা সংহত হয়েছে। আমাদের হাতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কাজ থাকবে। বাড়তি লোক আর অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হবে আমাদের। তাছাড়া, কর্নেল ক্যাম্বিসেসের মতো এবার আপনার কোয়ার্টারে কাজ করতে পারব না। যেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা করেছি, সেখানেই অপারেশন করতে হবে। ওর হাত ধরে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল সে। কাল সকালে চূড়ান্ত পরীক্ষা ও আমাদের অপারেশনের কৌশল স্থির করতে অন্য সার্জনরা যোগ দেবে আমাদের সাথে। আপনার শন্তিময় রাত কামনা করছি, লর্ড তাইতা।
তাইতাকে আবার ওর শোবার ঘরে নিয়ে যেতে অপেক্ষা করছিল প্রধান পরিচারক। প্যাসেজ আর গ্যালারির জটিল গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া পথের দিকে তেমন একটা নজর না দিয়েই তাকে অনুসরণ করল তাইতা। সন্ধ্যার কথোপকথন নিয়ে ভাবছিল ও, এমন সময় কান্নার শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়ল। থমকে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনল। খুব বেশি দূর থেকে আসছে না। মেয়ের কান্না, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কান্নার আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে দারুণ মরিয়া অবস্থায় পড়েছে সে। প্রধান পরিচারক তাকে নিবিড়ভাবে অনুসরণ না করে তাইতা থেমে গেছে বুঝতে পেরে ফিরে এলো।
মেয়েটা কে? জানতে চাইল তাইতা।
ওগুলো অন্দরের দাসদের ঘর। সম্ভবত কাউকে অপরাধের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। নির্বিকারভাবে কাঁধ ঝাঁকাল লোকটা। দয়া করে এসব নিয়ে মাথা ঘমাতে যাবেন না, লর্ড তাই। আপনার সামনে বাড়া উচিত।
ব্যাপারটা নিয়ে কথা বাড়ানোয় কোনও যুক্তি পেলো না তাই। লোকটার আভা বলে দিচ্ছে সে দুর্ধর্ষ, স্রেফ ঊর্ধ্বতনদের হুকুমই তামিল করছে।
পথ দেখাও, সায় দিল তাইতা, কিন্তু এবার চলার পথ ভালো করে খেয়াল করে চলল। আমাকে ছেড়ে যাবার পর তল্লাশি চালাতে ফিরে আসব, সিদ্ধান্ত নিল ও। কিন্তু দ্রুত কাঁদতে থাকা মেয়ের ব্যাপারে ক্ষীণ হয়ে এলো ওর আগ্রহ। কোয়ার্টারে পৌঁছানোর আগেই মনে থেকে সম্পূর্ণ মিলিয়ে গেল ভাবনাটা। মাদুরে শুয়ে রইল ও, প্রায় সাথে সাথে সহজ, ঝামেলাহীন ঘুমে তলিয়ে গেল।
*
ও নাশতা সারার প্রায় সাথে সাথেই হাজির হলো প্রধান পরিচারক। হান্নাহর কামরায় নিয়ে এলো তাইতাকে। এখানে চারজন সার্জনই ওর অপেক্ষায় ছিল। সাথে সাথে কাজ শুরু করল ওরা। তাইতার পক্ষে ব্যাপারটা অদ্ভুত, ওর সাথে আলোচনা করার বদলে ওকে কসাইয়ের দোকানের মরা মাংসের টুকরোর মতো দেখা।
প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু করল ওরা, ওর পরিপাক ব্যবস্থার ফল, শ্বাসপ্রশ্বাসের গন্ধ, ত্বকের অবস্থা, পায়ের তলা তাচ্ছিল্য করছে না। ওর মুখ খুলে জিহ্বা, মাঢ়ী আর দাঁত পরখ করল ডাক্তার রেই। লর্ড তাইতার দাঁতগুলো ভালোই জীর্ণ ও ক্ষয়ে গেছে, ডাক্তার হান্নাহ। গোড়া ভালোভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে। এর জন্যে নির্ঘাৎ যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে তাকে। তাই না, মাই লর্ড? তাইতার গোঙানি থেকে স্পষ্ট কিছু বোঝা গেল না। আবার খেই ধরল রেই, শিগগিরই ওর স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে এগুলো, শেষ পর্যন্ত জীবনকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। যত জলদি সম্ভব এগুলো ফেলে দিতে হবে, নতুন করে মাঢ়ীতে দাঁত বুনতে হবে।
সাথে সাথে একমত প্রকাশ করল হান্নাহ। আমি এসব হিসাবে ধরেছি, সেজন্যে কুঁচকির ক্ষতিগ্রস্ত জায়গার পুনরুজ্জীবনের জন্যে প্রয়োজনীয় সত্তার চেয়ে বেশি পরিমাণ সংগ্রহ করে রেখেছি। ওর মাঢ়ীতে ব্যবহারের জন্যে যথেষ্ট পাবে।
অবশেষে ওর ক্ষতস্থানে পৌঁছল ওরা। ওর শরীরের নিম্নাংশের উপর ঝুঁকে পড়ল, নির্বীজ করা জায়গায় চাপ দিচ্ছে, স্পর্শ করছে। ক্যালিপার্স দিয়ে জায়গাটা মাপল রেই, ছোট ছোট সুন্দর করে আঁকা হিয়েরোেগ্লাফিক হরফে প্যাপিরাসের ক্কোলে টুকে রাখল। কাজ করার সময় বিক্ষত জায়গাটা নিয়ে নৈর্ব্যক্তিক ঢঙে বিস্তারিত আলোচনা চালিয়ে গেল ওরা।
