পাহাড়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল ওরা, স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার থেকে বের হয়ে উষ্ণ সূর্যের আলোর কম্পিত রশ্মির মাঝে হাজির হলো। সুড়ঙের বাইরের ঐগদের পাশ কাটিয়ে এসে নিচের মেঘ–বাগিচার নজরকাড়া দৃশ্য বিছিয়ে থাকতে দেখল। ওই মোহনীয় জ্বালামুখে বরাবরের মতোই চেতনা উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠা টের পেল তাইতা। বনের ভেতর দিয়ে পরিচিত পথ ধরে এগোচ্ছে এখন, শেষ প্রান্তে ধোয়া ওঠা নীলাভ হ্রদের সৈকতে পৌঁছে গেল। বালুকাবেলায় শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে কুমীরগুলো। এই প্রথম ওদের জলের বাইরে দেখতে পেয়ে হতবাক হয়ে গেল তাইতা: যতটা ভেবেছিল তারচেয়েও অনেক বড়। ঘোড়ার এগিয়ে যাওয়ার আওয়াজে বাঁকা পায়ে ভর দিয়ে উঁচু হলো ওগুলো, তারপর পানির কিনারায় গিয়ে নেমে গেল হ্রদের জলে, শান্ত ভঙ্গিতে ডুব দিল পানির নিচে।
ওরা আস্তবলের আঙ্গিনায় পৌঁছলে ভৃত্য ও সহিসের দল ওদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিল। সহিসরা ঘোড়ার দায়িত্ব নিল। প্রধান পরিচারক তাইতাকে মেরেনের সাথে ও যে ঘরে ছিল সেখানেই নিয়ে গেল ওকে। আবারও তরতাজা পোশাক বিছিয়ে দেওয়া হলো ওর জন্যে। অগ্নিকুণ্ডে টাটকা আগুন জ্বলছে। গরম পানির বড় বড় জগ তৈরি।
আশা করি সবকিছুই তৈরি ও আপনার পছন্দ মোতাবেক পাবেন, সম্মানিত ম্যাগাস। অবশ্যই আপনার কিছু প্রয়োজন হলে খালি ঘণ্টা বাজাবেন। ইশারায় দরজার পাশে ঝুলন্ত ঘণ্টার দড়িটা দেখাল সে। সন্ধ্যায় ডাক্তার হান্নাহ আপনাকে তার খাস কামরায় রাতের খাবার খাওয়ার দাওয়াত করেছেন। পেছন ফিরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল প্রধান পরিচারক, এক কদম পর পরই গভীর শ্রদ্ধায় নত হচ্ছে। সূর্যাস্তের পর আপনাকে নিয়ে যেতে আসব।
গোসল সেরে বিশ্রাম নিতে শুয়ে পড়ল তাইতা, কিন্তু ঘুমাতে পারল না। ফের অস্থির উত্তেজনা ও অজানা এক ধরনের প্রত্যাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। আগের মতোই, বুঝতে পারছে ও, এই শিহরণ ওর নিজের ভেতর থেকে আসছে না, বরং বাইরের উৎস থেকে আসছে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল ও, কিন্তু তেমন একটা সফল হলো না। প্রধান পরিচারক ওকে নিতে এলো যখন, টাটকা টিউনিক পরে অপেক্ষা করছিল তাইতা।
ওকে স্বাগত জানাতে দারজায় হাজির হলো ডাক্তার হান্নাহ, যেন ওরা পুরোনো বন্ধু। ওর অভিজাত শ্রেণীতে উত্তরণের খবর পৌঁছে গেছে তার কাছে, তাইতাকে লর্ড তাইতা সম্বোধন করল সে। সবার আগে মেরেনের খবর জানতে চাইল; মেরেনের অব্যাহত চমৎকার উন্নতির খবর দিলে দারুণ খুশি হয়ে উঠল। আরও তিনজন মেহমান ছিল নিমন্ত্রণে। ডাক্তার গিব্বা তাদের একজন। হান্নাহর মতোই আন্তরিকভাবে তাইতাকে সম্বোধন করল সে। বাকি দুজন অপরিচিত।
এ হচ্ছে ডাক্তার আসেম, বলল হান্নাহ। গিল্ডের একজন সম্মানিত সদস্য। অপারেশন ও ওষুধের বেলায় গুল্ম ও সজি ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ।
আসেম ছোটখাট মানুষ, প্রাণবন্ত বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। তার আভা থেকে তাইতা বুঝতে পারল লোকটা বিশাল জ্ঞানের অধিকারী একজন দীর্ঘায়ু, তবে মোহন্ত নয়।
ডাক্তার রেইয়ের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিই? ক্ষতিগ্রস্ত বা ছিঁড়ে যাওয়া স্নায়ু ও পেশী জোড়া লাগানোর বিশেষজ্ঞ। মানুষের শরীরের হাড়ের গঠন সম্পর্কে যেকারও চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে। বিশেষ করে খুলি আর দাঁত, মেরুদণ্ডের কশেরুকা ও হাত পায়ের হাড়। ডাক্তার আসেম আর ডাক্তার রেই আপনার অপারেশনে আমাকে সাহায্য করবে।
রেই দেখতে রুক্ষ, প্রায় পুরুষালী চেহারা। তার হাতজোড়া শক্তিশালী। তাইতা বুঝতে পারল মহিলা পেশাগত দিক থেকে চতুর, একগুঁয়ে মানসিকতার।
ওরা বোর্ড ঘিরে স্থির হয়ে বসার পর উল্লাসমুখর হয়ে উঠল পরিবেশ, আকর্ষণীয় হয়ে উঠল কথোপকথন। ওদের উন্নত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হলো তাই। ভৃত্যরা বাটিগুলো সব সময় ভরে রাখলেও সংযম বজায় রাখল ওরা, কেউই মদে চুমুক দেওয়া ছাড়া আর কোনও খাবার স্পর্শ করল না।
এক পর্যায়ে ওদের কথোপকথন পেশার নৈতিকতার প্রসঙ্গে বাঁক নিল। দূর প্রাচ্যের এক দেশ থেকে এসেছে রেই। কিন সম্রাট কীভাবে যুদ্ধে আটক বন্দিদের সার্জনদের হাতে তুলে দিতেন তার বর্ণনা দিল সে। বন্দিদের জীবন্ত ব্যবচ্ছেদ ও পরীক্ষা করার উৎসাহ দিতেন তিনি। সমাবেশের প্রত্যেকেই স্বীকার গেল, সম্রাট নিশ্চয়ই দূরদৃষ্টির ও সমঝদার লোক ছিলেন।
মানুষের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সাধারণ গৃহপালিত পশুর চেয়ে মাত্র এক ধাপ উপরে, যোগ করল হান্নাহ। প্রত্যেকেই জীবনের সব প্রয়োজনীয় উপকরণ পাচ্ছে নিশ্চিত করাই একজন ভালো শাসকের দায়িত্ব। আর বেশির ভাগ আরাম আয়েসই নির্ভর করে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা উপকরণের উপর। তবে ব্যক্তির জীবন পবিত্র মূল্যের বলে তাকে যেকোনও মূল্যে রক্ষা করতে হবে, এটা ভাবলে চলবে না তার। একজন জেনারেলের যেমন যুদ্ধে জেতার স্বার্থে সেনাদলকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে দ্বিধায় ভুগলে চলে না, তেমনি ম্রাটকেও রাষ্ট্রের প্রয়োজনের নিরীখেই জীবন বা মৃত্যু সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তথাকথিত মানবতার কৃত্রিম মানদণ্ডের ভিত্তিতে নয়।
আমি সম্পূর্ণ একমত, তবে আরেকটু যোগ করতে বলতে চাই, বলল রেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ব্যক্তির মূল্যকে হিসাবে নিতে হবে। কোনও দাস বা নিষ্ঠুর সৈনিককে কোনওভাবেই একজন সাধক বা বিজ্ঞানীর সাথে এক পাল্লায় মাপলে চলবে না, যার জ্ঞানের পেছনে হয়তো শত শত বছর লেগে গেছে। দাস, সৈনিক ও নির্বোধদের জন্মই হয়েছে মরার জন্যে। সেটা যদি তারা ভালো উদ্দেশ্যে করতে পারে, তাহলেই ভালো। অবশ্য সমাজে সাধক ও বিজ্ঞানীদের মূল্য অনেক বেশি, তাদের সম্মান দেখাতে হবে।
