হ্যাঁ, সায় দিলেন দিমিতার। এসব কথা শুনেছি। আপনারও এই বিদ্যা জানা আছে সে, তাইতা?
আমার উপর আপনার আস্থা আছে? নিজেকে আমার হাতে তুলে দেবেন?
নিতান্ত অসহায়ের মতো চোখ বুজলেন দিমিতার। আমার ভেতর আর কিছুই বাকি নেই। আমি একটা শুকনো খোসামাত্র, যার ভেতর থেকে খোদ সেই ডাইনীর মতোই ক্ষুধার্তের মতো প্রতিটি ফোঁটা শুষে নিয়েছেন আপনি। থাবার মতো একটা হাত তুলে মুখ মুছলেন তিনি, বন্ধ করে রাখা চোখ ডললেন। চোখ মেলে তাকালেন তারপর। নিজেকে আপনার হাতে সঁপে দিচ্ছি। পারলে আমার উপর ওই জাদু প্রয়োগ করুন।
সোনার মাদুলিটা চোখের সামনে ধরে চেইনের উপর দোলাতে শুরু করল তাইতা। সোনালি তারার উপর মনোযোগ স্থির করুন। মন থেকে অন্য সব চিন্তা দূর করে দিন। নিজের আত্মার গভীর ছাড়া আর কিছু দেখবেন না, দিমিতার। আপন আত্মার অন্তস্তলকে আপনি ভয় পান। আপনাকে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। ঘুমের কোলে ছেড়ে দিন নিজেকে। ঘুম যেন আপনার মাথার উপর পৌঁছে যায়, অনেকটা কোমল পশমী কম্বলের মতো। ঘুমান, দিমিতার, ঘুমান…
আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এলেন বুড়ো মানুষটা। চোখের পাতা কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল। খাটিয়ার উপর রাখা মড়ার মতো পড়ে রইলেন তিনি। মৃদু নাক। ডাকছে। আস্তে করে খুলে গেল একটা চোখের পাতা, উল্টে গেল ওটার পেছনে চোখটা, ফলে কেবল শাদা অংশটুকু দেখা গেল, অন্ধ, ঝাপসা। মনে হচ্ছে গভীর ঘোরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ওকে একটা প্রশ্ন করল তাইতা, উত্তর দিলেন তিনি। কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট, দুর্বল, স্বর তীক্ষ্ণ।
সময়ের নদী বেয়ে উল্টো দিকে এগিয়ে যান, দিমিতার।
হ্যাঁ, সায় দিলেন দিমিতার। অনেক বছর পেছনে চলে যাচ্ছি…পেছনে, পেছনে, পেছনে… শক্তিশালী হয়ে উঠল ওর কণ্ঠস্বর। আরও জোরাল।
এখন কোথায় আপনি?
আমি এখন ই-তেমেন-আন-কাই, মানে আকাশ ও পৃথিবীর ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে আছি, শক্তিশালী তরুণ কণ্ঠে জবাব দিলেন তিনি।
তাইতা জানে বাবিলনের কেন্দ্রের এক বিশাল কাঠামো ওটা। ওটার দেয়াল চকমকে ইটে তৈরি, আকাশ-মাটির যত রঙ আছে সব রঙের মিশেল। বিশাল পিরামিডের আকৃতির। কী দেখতে পাচ্ছেন, দিমিতার?
খোলা জায়গা, খোদ মহাবিশ্ব, আকাশ ও স্বর্গের অক্ষ।
দেওয়াল ও উঁচু টেরেস দেখতে পাচ্ছেন?
কোনও দেয়াল নেই, তবে শ্রমিক আর দাসদের দেখছি। জমিনে যত পিঁপড়া ও আকাশে যত পঙ্গপাল আছে তত। ওদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। এরপর নানা ভাষায় কথা বলে চললেন দিমিতার, মানুষের সব ভাষার মিশেল। কয়েকটা ভাষা বুঝতে পারল তাইতা, কিন্তু অন্যগুলো দুর্বোধ্য রয়ে গেল। সহসা প্রাচীন সুমেরিয় ভাষায় চিৎকার করে উঠলেন দিমিতার। একটা মিনার বানাব আমরা, ওটা স্বর্গে পৌঁছে যাবে।
বিস্ময়ের সাথে তাইতা বুঝতে পারল, টাওয়ার অভ বাবেলের ভিত্তি স্থাপনের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন তিনি। ফিরে গেছেন সময়ের সূচনায়।
এখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘুরে চলেছেন আপনি। ই-তেমেন-আন-কাই-এর পূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছানো দেখেছেন, রাজারা পূজা দিচ্ছেন, চূড়ায় রয়েছেন দেবতা বেল ও মারদুক। সময়ের আরও এধারে চলে আসুন! ওকে নির্দেশ দিল তাইতা, তারপর দিমিতারের চোখ দিয়ে বিশাল সব সাম্রাজ্যের উত্থান ও রাজাদের পতনের দৃশ্য দেখতে লাগল; ওদিকে দিমিতার সেই সব ঘটনার কথা বলে চললেন যার কথা প্রাচীন কালেই বিস্মৃত হয়েছে সবাই। অনেক শতাব্দী আগেই ধূলোয় রূপান্তরিত নারী-পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।
অবশেষে পরাস্ত হলেন দিমিতার, শক্তি হারিয়ে ফেললেন। ওর ভুরুর উপর একটা হাত রাখল তাইতা। সমাধি প্রস্তরের মতোই শীতল ঠেকল। শান্ত হন, দিমিতার, ফিসফিস করে বলল। এবার ঘুমান। অতীতের স্মৃতি ছেড়ে বর্তমানে ফিরে আসুন।
কেঁপে উঠলেন দিমিতার, শিথিল হলো ওর শরীর। সূর্যাস্ত অবধি ঘুমালেন তিনি। তারপর জেগে উঠলেন স্বাভাবিকভাবেই, যেন অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। তরতাজা, শক্তিশালী মনে হলো নিজেকে। তাইতার আনা ফল আর ছাগলের টক দুধ ক্ষুধার্তের মতো খেলেন। এই সময় কাজের লোকেরা তাঁবুর কাছে এসে উটের পিঠে রসদপত্র চাপাল। কাফেলা ফের রওয়ানা দেওয়ার সময় তাইতার পাশাপাশি খানিকটা পথ হাঁটার মতো শক্তি ফিরে পেলেন তিনি।
আমি ঘুমে থাকার সময় কি কি স্মৃতি খুঁড়ে এনেছেন? হাসিমুখে জানতে চাইলেন। কিছুই মনে করতে পারছি না, তার মানে আসলে কিছুই পাননি।
ই-তেমেন-আন-কাইয়ের ভিত্তি স্থাপনের সময় হাজির ছিলেন আপনি, ওকে জানাল তাইতা।
থমকে দাঁড়ালেন দিমিতার, সবিস্ময়ে তাইতার দিকে ফিরলেন। এ কথা বলেছি আমি?
জবাবে ঘোরে থাকার সময় দিমিতারের উচ্চারিত কয়েকটা ভাষা অনুকরণ করে শোনাল তাইতা। সাথে সাথে সেগুলো শনাক্ত করলেন দিমিতার। অচিরেই অবসন্ন হয়ে এল তার পাজোড়া, কিন্তু উৎসাহে ভাটা পড়ল না এতটুকু। নিজের পালকিতে উঠে শুয়ে পড়লেন গালিচার উপর। ওর পাশাপাশি এগোল তাইতা। দীর্ঘ রাত জুড়ে অব্যাহত রইল ওদের আলাপ। অবশেষে দুজনের জন্যেই বিশেষ গুরুত্ববহ একটা প্রশ্ন করলেন দিমিতার। ইয়োসের কথা বলেছি? গোপন কোনও স্মৃতি উদ্ধার করতে পেরেছেন?
মাথা নাড়ল তাইতা। আপনাকে ভয় পাইয়ে দিতে চাইনি। সরাসরি ওদিকে যাইনি। বরং আপনার স্মৃতিকে স্বাধীনভাবে চলে বেড়াতে দিয়েছি।
