জোর করে তরলটুকু খাওয়ার সময় সিদুদুর পাশে বসে রইল ওরা, একবারে এক ঢোক করে খাচ্ছে, তেতো স্বাদের কারণে মুখ বাঁকা করে ফেলছে। শেষ করার পর কিছুক্ষণ বসে রইল ও। হাঁপাচ্ছে, বমির বেগে বেঁকেচুরে যাচ্ছে। অবশেষে শান্ত হয়ে এলো ও। এবার ঠিক হয়ে যাব আমি, কর্কশ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল।
আজ রাতে তোমাকে আমাদের সাথে এখানেই ঘুমাতে হবে, দৃঢ় কণ্ঠে বলল ফেন। আমাদের সাহায্য লাগবে তোমার।
একেবারে মাঝরাতের অন্ধকারে সিদুদুর গোঙানির শব্দ ওদের জাগিয়ে তুলল। মাদুর থেকে লাফিয়ে উঠে বাতি জ্বালল ফেন। উঠে দাঁড়াতে সাহায়্য করল সিদুদুকে, আড়ষ্ট হয়ে উবু হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে পাশের ছোট ঘরের রাতের পাত্রের কাছে নিয়ে গেল। সিদুদু পেট উগড়ে দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই জায়গামতো পৌঁছুতে পারল ওরা। প্রবল বেগে তরল উগড়ে দিল ও। ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ওর আড়ষ্টভাব ও যন্ত্রণা আরও প্রবল হয়ে উঠতে লাগল। পটের উপর চেষ্টা চালিয়ে গেল ও। ওর পাশে রইল ফেন। আড়ষ্ট ভাব চরম হয়ে উঠলে ওর পেট মালিশ করে দিল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ওর ঘর্মাক্ত মুখ আর বুক ভেজা ন্যাকড়ায় মুছে দিচ্ছে। ঠিক চাঁদ অস্ত যাবার পর আগের সমস্ত খিচুনির চেয়েও মারাত্মক এক খিচুনিতে কেঁপে উঠল সিদুদুর পুরো শরীর। চরম অবস্থায় ভয়ঙ্কর আর্তনাদ করে উঠল ও। হে আইসিস মাতা, আমাকে বাঁচাও! আমার সব অপরাধ মাফ করো! লুটিয়ে পড়ল সে, পরিশ্রান্ত, পটের নিচে করুণ আকারের একটা রক্তাক্ত পিণ্ডের মতো পড়ে আছে। টাটকা পানি আর লিনেন কাপড়ে সিদুদুর শরীর পরিষ্কার করে দিল ফেন। ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে আবার মাদুরের কাছে নিয়ে এলো। পট থেকে জ্বণটাকে তুলে সাবধানে ধুয়ে নিল তাইতা, তারপর একটা টাটকা লিনেন কাপড়ে মুড়ে নিল। ছেলে না মেয়ে বোঝার মতো যথেষ্ট বড় হয়ে ওঠেনি ওটা। জ্বণটা আস্তাবল প্রাঙ্গণে নিয়ে এলো ও, মেরেনকে ডাকল সাহায্য করার জন্যে, তারপর আঙ্গিনার কোণের একটা পাথর তুলে জমিনে একটা গর্ত খুড়ল ওরা। বান্ডিলটা পুঁতে রাখল সেখানে।
মেরেন পাথরের টুকরোটা আবার জায়গামতো বসানোর পর শান্ত কণ্ঠে তাইতা বলল, মা আইসিস, এই আত্মার দিকে খেয়াল রেখো। বেদনা ও ঘৃণায় এর ধারণ হয়েছিল। গ্লানি ও ভোগান্তিতে অবসান ঘটেছে। এই জীবনের জন্যে ছিল না সে। পবিত্র মাতা, তোমার কাছে মিনতি করি, পরকালে ছোট্ট প্রাণটাকে আরও করুণার সাথে দেখো।
নিজের ঘরে ফেরার পর অনুসন্ধিৎসু চোখে ওর দিকে তাকাল ফেন। চলে গেছে, বলল তাইতা। রক্তক্ষরণ অচিরেই থেমে যাবে, কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে সিদুদু। চিন্তা বা ভয়ের কোনও কারণ নেই।
কেবল ওর গায়ে হাত তোলা বদ লোকটা বাদে, ওকে মনে করিয়ে দিল ফেন।
ঠিক। তবে সে একা নয়, আমাদের সবাইকেই ক্যাপ্টেন ওনকাকে সমঝে চলতে হবে। মাদুরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে সিদুদুর পরিশ্রান্ত চেহারা পরখ করল ও। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ও। ওর কাছে থেকো, ফেন। তবে যতক্ষণ সম্ভব ঘুমাতে দাও ওকে। আরও কিছু ব্যাপার দেখতে হবে আমাকে।
ঘর থেকে বের হয়েই নাকোন্তো ও ইম্বালিকে ডেকে পাঠাল তাইতা। আমরা যেখানে শিম্পাঞ্জিগুলোকে মেরেছি সোজা সেখানে চলে যাও, বনে ছাড়িয়ে দাও লাশগুলো, তারপর প্যাকহর্স খুঁজে বের করে শুয়োরগুলোকে ফেলে দাও। ঘোড়া তীরগুলো খুঁজে বের করো, ওখানে আমাদের উপস্থিতির সব রকম চিহ্ন মুছে ফেল। শেষ করে ফিরে এসো। ওরা চলে গেলে মেরেন আর হিলতোকে বলল, কর্নেল তিনাত বলেছিল সর্দার বিলতো মুতাঙ্গিতে তার এজেন্ট। তিনাতের কাছে সব খবর পৌঁছে দেবে সে। গোপনে বিলতের কাছে চলে যাও। তিনাতকে খবর দিতে বলবে যে, সিদুদু এখন আমাদের সাথে আছে আরও কিছু বরতে যাচ্ছিল ও, এমন সময় ওদের বাড়ির সামনের রাস্তায় অনেকগুলো ছুটন্ত ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ কানে এলো। গ্রামের ভেতরে জোরাল চিৎকার শোনা যেতে লাগল। তারপর আঘাতের আওয়াজ, নারীকণ্ঠের কান্নার শব্দ আর বাচ্চাদের চিৎকার কানে এলো।
দেরি হয়ে গেছে, বলল তাইতা। সৈনিকরা এসে গেছে। সিদুদুর খোঁজ করছে ওরা, কোনও সন্দেহ নেই।
ওকে লুকিয়ে রাখতে হবে, লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল মেরেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আস্তাবলের আঙ্গিনার পাথরে পেরেক বসানো জুতোর আওয়াজ ও তারপর দরজার গায়ে ধাক্কার আওয়াজ কানে এলো। খাপ থেকে তলোয়ারটা আধাআধি বের করে আনল মেরেন।
সুপ্রিম কাউন্সিলের নামে বলছি, খোল! ওনকার ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর।
তলোয়ার তুলে রাখ, শান্ত কণ্ঠে মেরেনকে বলল তাইতা। দরজা খুলে ঢুকতে দাও ওদের।
কিন্তু সিদুদুর কী হবে? ভেতরের ঘরের দরজার দিকে তাকাল মেরেন। ওর চোখে মুখে হতাশা।
ফেনের বুদ্ধির উপর ভরসা রাখতে হবে, জবাব দিল তাইতা। ওনকা সত্যিকার অর্থে সন্দিহান হয়ে ওঠার আগেই দরজা খুলে দাও। কামরার ওপাশে গিয়ে অর্গল খুলে দিল মেরেন। হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল ওনকা।
আরে, ক্যাপ্টেন ওনকা যে! ওকে স্বাগত জানাল তাইতা। কী সৌভাগ্য, অপ্রত্যাশিতভাবে তোমার দেখা পেয়ে গেলাম!
অনেক কষ্টে চেহারা ঠিক রাখল ওনকা। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, ম্যাগাস, কিন্তু আমরা একটা নিখোঁজ মেয়ের খোঁজ করছি। মেয়েটার মাথায় গোলমাল আছে, সম্ভবত প্রলাপ বকছে।
