প্রথম শিম্পাঞ্জিটা মারাত্মকভাবে আহত হলেও মেরেন ও মেয়েটাকে অবশিষ্ট সমস্ত শক্তিতে অনুসরণ করছে। মেয়েটাকে ধরে রাখতে হওয়ায় ধনুকে তীর পরাতে পারছে না ও। দূরত্ব কমিয়ে আনছে জানোয়ারটা। কী করতে যাচ্ছে, তাইতা টের পাবার আগেই ওয়ার্লউইন্ডকে ঘুরিয়ে নিল ফেন, সাহায্য করতে ধেয়ে গেল।
ফিরে এসো! সাবধান! ওর পেছনে চিৎকার করল তাইতা। খামোকা। বুকে ভাঙা বর্শার দণ্ড আর ক্ষতস্থানের রক্তক্ষরণ নিয়ে লাফিয়ে শূন্যে উঠে গেল শিম্পাঞ্জিটা, নেমে এলো মেরেনের ঘোড়ার পেছনে। চোয়াল বিশাল হাঁ করে রেখেছে, মেরেনের ঘাড়ের পেছনে কামড় বসাতে মাথা সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে। হামলা মোকাবিলা করতে পিছন ফিরল ও। বাম হাতের ভাঁজে মেয়েটাকে ধরে শিম্পাঞ্জির খোলা মুখে ডান হাত দিয়ে বর্শার বাটটা ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেলো, জোর করে পেছনে ঠেলে দিল ওটার মাথা। কাঠের গায়ে চোয়াল বসাল শিম্পাঞ্জিটা, চিবিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল।
সাবধান! আবার চিৎকার করল তাইতা। মেরেনের পাশে এসে ছোট তীরটাকে টানটান করে টেনে ধরল। মেরেনের গায়ে না লাগে যেন! ফেন শুনেছে বলে মনে হলো না। ঠিক কোণটা পাওয়ামাত্রই তীর ছুঁড়ে মারল ও। দুই হাতেরও কম ছিল দূরত্ব। কাঁধের একপাশে গিয়ে বিধে আরেক পাশ দিয়ে অর্ধেকটা বের হয়ে এলো ওটা। ক্রোধে চিৎকার ছেড়ে দুই হাতে ধরে তীরটা বের করার সময় বনের আগাছায় গাড়াগড়ি খেতে লাগল। ধই করে এগিয়ে গেল ইম্বালি, কুড়োলটা মাথার উপর তুলে সপাটে নামিয়ে আনল। খুলির পুরু হাড় ফাটিয়ে দিল, যেন ওটা ডিমের খোসা। প্যাক-হর্স ছেড়ে এলো নাকোন্তো, নিজেদের মতো করে ছুটে গেল ওগুলো। হিলতো যেখানে অন্য শিম্পাঞ্জিটাকে বর্শার ডগায় গেঁথে রেখেছে ইম্বালিকে পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল সেখানে। খাট আসেগেই দিয়ে পর পর দুবার গলায় ঘাই মারল ও, মরার আগে অন্তিম গর্জন ছাড়ল শিম্পাঞ্জিটা। মেরেনের বে-র সাথে তাল মিলিয়ে ছুটছিল ফেন, কিন্তু এখন গতি কমাল ওরা। মেয়েটাকে কোমলভাবে বুকের সাথে সেঁটে রেখেছে মেরেন। ওর কাঁধে মুখ গুঁজে প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙে পড়েছে সে। পিঠে হাত বুলিয়ে ওকে আশ্বাসের কথা বলতে লাগল মেরেন। সব ঠিক আছে, সুরী। কান্নার কোনও কারণ নেই। এখন তুমি নিরাপদ। আমি তোমাকে দেখব। ওর আত্মতুষ্ট হাসির কারণে উদ্বেগ আর সহানুভূতি প্রকাশের প্রয়াস কিছুটা মার খেল।
পাঁই করে ঘুরে ওর এক পাশে চলে এলো ফেন। আরেক পাশে এসে পৌঁছাল তাইতা। এই যে মেয়ে, বুঝতে পারছি না, তোমার কাছে বড় বিপদ কোনটা, বুনো শিম্পাঞ্জি নাকি তোমাকে ওদের হাত থেকে উদ্ধারকারী লোকটা, মন্তব্য করল তাইতা। শেষবারের মতো ফুঁপিয়ে উঠে চোখ তুলে তাকাল মেয়েটা, কিন্তু মেরেনের গলা ছাড়ল না। ওকে ছাড়ানোর চেষ্টাও করল না মেরেন। নাক বেয়ে জল গড়াচ্ছে মেয়েটার, চোখজোড়া অশ্রুভেজা। কৌতূহলের সাথে ওকে জরিপ করতে লাগল সবাই।
কাঁদলেও মেয়েটা সুন্দরী, ভাবল তাইতা। তারপর কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ওই জানোয়ারগুলোর পাল্লায় পড়ার সময় একা একা বনের ভেতর কী করছিলে?
আমি পালিয়েছি, ট্রগগুলো আমার পিছু নিয়েছে। হেঁচকি তুলে বলল মেয়েটা।
ট্রগ? জানতে চাইল মেরেন।
গভীর চোখে ওর চোখের দিকে তাকাল মেয়েটা। এটাই ওদের নাম। ভয়ঙ্কর প্রাণী। আমরা সবাই ভয় পাই ওদের।
তোমার জবাব অনেকগুলো প্রশ্নের পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু তার আগে এসো প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। কোথায় যাচ্ছিলে তুমি? বাধা দিয়ে বলল তাইতা। মেরেনের দিক থেকে জোর করে চোখ সরিয়ে এনে তাইতার দিকে তাকাল মেয়েটা। আপনার খোঁজে আসছিলাম আমি, ম্যাগাস। আপনার সাহায্য লাগবে। আমার। একমাত্র আপনিই আমাকে বাঁচাতে পারবেন।
এবার আরেক দফা প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে। সহজ একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে পারি? তোমার নাম কী, বাছা?
আমার নাম সিদুদু, ম্যাগাস, বলল মেয়েটা, প্রবলভাবে কেঁপে উঠল।
তোমার শীত করছে, সিদুদু, বলল তাইতা। তোমাকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার আগে আর কোনও প্রশ্ন নয়। মেরেনের দিকে তাকাল তাইতা, চেহারা গম্ভীর রেখেই জিজ্ঞেস করল, মেয়েটা তোমার জন্যে কোনও অসুবিধা বা অস্বস্তির কারণ সৃষ্টি করছে না তো? গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে ওকে? নাকি মাটিতে নামিয়ে হটিয়ে নিয়ে যাব?
ওর কারণে অসুবিধা হলেও মেনে নিতে পারব, সমান আন্তরিকতার সাথে বলল মেরেন।
তাহলে এখানে আমাদের কাজ শেষ হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। চলো, এগোই।
ওরা যখন গ্রামে পৌঁছুল তখন অন্ধকার মিলিয়েছে। বেশিরভাগ বাড়িঘরই অন্ধকারে ডুবে আছে, ওদের এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কেউ খেয়াল করেছে বলে মনে হলো না। আস্তাবলে পৌঁছুতে পৌঁছুতে ভালোই সামলে নিল সিদুদু। কিন্তু কোনও ঝুঁকি নিতে গেল না মেরেন, কোলে করে বৈঠকখানায় নিয়ে এলো ওকে। ফেন ও ইম্বালি বাতি জ্বেলে চুলোয় শিকারের মাংসের স্টু গরম করার সময় সিদুদুর ক্ষতস্থান পরখ করল তাইতা। সবই অস্ত্রপচারের দাগ, চামড়া খসিয়ে কাঁটা বসানো হয়েছে। ওর সুডৌল থোড়মাংস থেকে শেষ কাটাটা বের করে ক্ষতস্থানে মলম মেখে দিয়ে হেলান দিয়ে বসে জরিপ করল ওকে। বিভ্রান্ত, অসুখী একটা মেয়ে। কিন্তু কষ্টে উত্তাল পরিস্থিতির নিচে ওর আভা পরিষ্কার, খাঁটি। সত্যিকারের মিষ্টি, নিষ্পাপ মানুষ, জগতের অশুভ ও নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হতে বাধ্য করা হয়েছে ওকে।
