তা সত্ত্বেও ঝোঁপ থেকে একটা মোটাসোটা মাদি শুয়োর ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ হেঁড়ে বেরিয়ে আসতেই পিছিয়ে এসে চিৎকার ছাড়ল হিলতো ও মেরেন, ওটা তোমার জন্যে, ফেন!
শিকারটাকে চট করে একনজর দেখেই ওকে এগোতে দিল তাইতা। জানোয়ারের পেছন থেকে কোণাকুণিভাবে এগোেনোর সবক দিয়েছে ওকে, স্যাডল থেকে সামনে ঝুঁকে ছোট বাঁকানো ক্যাভালরি তীরের ছিলা টেনে ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসাও শিখিয়েছে। প্রথম তীরটাই আসল, বলেছিল ও। সামনে বেড়ে সোজা হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দেবে।
মাদিটা আঘাত টেরে পেতেই নিমেষে ঘুরে দাঁড়াল ওটা, দৌড় শুরু করতে মাথা নোয়াল। চোয়ালের পাশ থেকে তীক্ষ্ণ শাদা দাঁত বেরিয়ে এসেছে। ওয়ার্লউইন্ডকে পরিষ্কার ঘুরিয়ে নিল ফেন, দৌড়াতে দিল মাদিটাকে। বাইরে নিয়ে আসছে ওটাকে যাতে তীরের ফলা বুকের আরও গভীরে বাসানো যায়। ধমনী, ফুসফুস আর হৃৎপিণ্ড ভেদ করে যাবে ওটার ধারাল প্রান্তগুলো। সোৎসাহে চিৎকার করে ওকে উৎসাহ যোগাল তাইতা ও অন্যরা।
এবার পারস্য কায়দায় আঘাত! চিৎকার করে উঠল তাইতা। একবাতানার বিস্তৃর্ণ সমতলের ঘোড়সওয়ারদের কাছে কায়দাটা শিখেছিল ও, ওকে শিখিয়েছে। নিপূণভাবে তীরের দণ্ডের উপর মুঠি পাল্টে ফেলল ও, ডান হাতে ওটা ধরে বাম হাতে টেনে কাছে নিয়ে এলো যাতে কাঁধের উপর দিয়ে তীরটা তাক করা যায়। এবার হাঁটু দিয়ে ওয়ার্লউইন্ডকে সামলে রেখে মাদিটাকে নির্দিষ্ট দূরত্বে আসার সুযোগ করে দিতে গতি কমাল। স্যাডলের উপর না ঘুরেই মাদি শুয়োরের বুক ও গলা লক্ষ্য করে একের পর এক তীর পাঠাতে লাগল ও। হাল ছাড়ল না জানোয়ারটা। দৌড়ের উপর লুটিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত লড়াই করে গেল। পাঁই করে ওয়ার্লউইন্ড ঘুরিয়ে নিল ফেন, উত্তেজনায় চকচক করছে ওর চেহারা, হাসছে। শিকারের লেজ আর কান কেটে নিতে ফিরে এলো ও।
সূর্যটা তখনও দিগন্ত ছাড়িয়ে বেশি উপরে উঠে আসেনি, এমন সময় তাই ডাকল। আজকের মতো অনেক হয়েছে! কাহিল হয়ে পড়েছে ঘোড়াগুলো, তোমাদেরও অবস্থাও একইরকম হওয়ার কথা। মুতাঙ্গিতে ফেরা যাক। গ্রাম থেকে দুই লীগেরও বেশি দূরে ছিল ওরা, নিবিড় বনের ভেতর দিয়ে গেছে রাস্তাটা। গাছের ছায়া পড়েছে রাস্তায় উপর, আলোছায়াময় পরিবেশ। একটা মাত্র সারিতে এগোচ্ছে ওরা। সবার সামনে তাইতা ও ফেন। নাকোন্তা ও ইম্বালি সবার পেছনে। ওদের হাতে নিহত পাঁচটা বুনো শুয়োরের মৃতদেহ পিঠে বেঁধে প্যাকহর্সগুলোকে টেনে আনছে।
আচমকা পথের ডান পাশে বনের ভেতর থেকে তীক্ষ্ণ টানা আর্তচিৎকারে চমকে উঠল ওরা। লাগাম টেনে যার যার অস্ত্র বাগিয়ে ধরল। ঠিক ওদের সামনে ছুটে বেরিয়ে এলো একটা মেয়ে। ওর পরনের টিউনিক কাদামাখা, শতচ্ছিন্ন। হাঁটুর চামড়া ছড়ে গেছে, পাজোড়া নগ্ন, কাটা গাছের আঘাতে আর পাথরে লেগে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মাথায় ঘন কালো চুল, পাতা আর সরু ডালপালা লেগে আছে। চোখজোড়া গভীর, বিরাট, আতঙ্কে বিস্ফারিত। কিন্তু এমনি আতঙ্কিত অবস্থায়ও সুন্দর লাগছে ওকে। গায়ের রঙ চাঁদের আলোর মতো ফিকে, ছিপছিপে, সুগঠিত শরীর। ঘোড়াগুলো দেখে ঘুরে দাঁড়াল সে। উড়ন্ত চড়ুই পাখির মতো দৌড়ে এলো ওদের দিকে। আমাকে বাঁচাও! আর্তচিৎকার করে উঠল.মেয়েটা। ওদের হাতে তুলে দিয়ো না! স্পর দাবিয়ে ওর দিকে ধেয়ে গেল মেরেন।
সাবধান! চিৎকার করে উঠল মেয়েটা। একেবারে কাছে এসে পড়েছে ওরা! ঠিক সেই মুহূর্তে বন থেকে দুড়দাড় করে বেরিয়ে এলো দুটো বিশাল কুঁজো অবয়ব। চার হাত পায়ে দৌড়াচ্ছে। মুহূর্তের জন্যে মেরেন ভাবল হয়তো বুনো শুয়োর হবে, কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারল লম্বা হাতে ভর করে ধেয়ে আসছে ওগুলো, প্রতি পদক্ষেপে জমিনে মুঠি দিয়ে আঘাত হানছে।
শিম্পাঞ্জি! চিৎকার করে উঠল মেরেন, তুনে তীর জুততে জুততে বে-টাকে গতি বাড়ানোর তাগিদ দিল। মেয়েটার নাগাল পাওয়ার আগেই ওদের সর্দারটাকে বাধা দিতে দ্রুত ছুটছে। তীরটাকে শেষ সীমা পর্যন্ত পিছিয়ে এনে ছেড়ে দিল ও। জানোয়ারটার ঠিক বুকে গিয়ে বিধল ওটা। গর্জে উঠে তীরের ফলা ধরে টেনে বের করার চেষ্টা করল ওটা, যেন খড় ছিঁড়তে চায়। একই সময়ে বাটটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। বলা যায় চলার গতি কমল না ওটার, মেয়েটার মাত্র কয়েক গজ পেছনে থেকে ফের আগে বাড়তে শুরু করল। আরেকটা তীর ছুঁড়ল মেরেন। প্রথম তীরের গোড়াটা রোমশ ধড়ের যেখানে মাথা বের করে রেখেছে ঠিক সেখানে গিয়ে বিধল ওটা।
এখন সাহায্য করতে ধেয়ে আসছে হিলতো। সামনের জানোয়ারটাকে তীর ছুঁড়ে আবার আঘাত করল সে। মেয়েটার এত কাছে পৌঁছে গিয়েছিল ওটা, যে গর্জন ছাড়তেই পাজোড়া ভেঙে পড়ল। মেয়েটাকে ধরতে হাত বাড়াল জানোয়ারটা। কিন্তু ওদের দুজনের মাঝখানে বে-কে নিয়ে এলো মেরেন, সামনে ঝুঁকে মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরে তুলে নিল জিনের সামনে। পরক্ষণে স্পর দাবিয়ে বে-কে নিয়ে সরে এলো। ওর পিছু ধাওয়া করল শিম্পাঞ্জিটা, ক্ষতস্থানের। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। শিকার হাতছাড়া হয়ে যেতে দেখে হিংস্র হয়ে উঠেছে। সঙ্গীর বেশ কাছেই ছিল দ্বিতীয় শিম্পাঞ্জিটা, দ্রুত দূরত্ব কমিয়ে আনছে ওটা।
দীর্ঘ বর্মটা সামলে ধরে ওটাকে বাধা দিতে ছুটে এলো হিলতো। ওকে ছুটে আসতে দেখে মোকাবিলা করার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল শিম্পাঞ্জিটা। কাছাকাছি হতেই বর্শার ডগা নামাল হিলতো, ওর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল শিম্পাঞ্জিটা। শূন্যে উঠে গেল। বর্শায় ওটাকে বিধল হিলতো, বুকের ঠিক মাঝখান দিয়ে চালিয়ে দিল ব্রোঞ্জের ডগা। দণ্ডের একেবারে ক্রস আকৃতির গার্ড পর্যন্ত বিধে গেল। ফলে এক কিউবিটের চেয়ে বেশি গভীরে ঢোকা রহিত হলো। ভর আর গতিবেগ কাজে লাগাল হিলতো, আর্তচিৎকার করে উঠল শিম্পাঞ্জিটা। ওটাকে মাটিতে গেঁথে ফেলল ও।
