অবশেষে আগুন ছেড়ে যার যার ঘরে চলে গেল ওরা। মেরেনকে নিয়ে ওকে ছেড়ে চলে যাবার পর প্রথমবারের মতো আবার এক হলো ফেন ও তাই।
ওহ, তাইতা, কী যে ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম আমাকে আহ্বান জানাবে তুমি। সেকারণে তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে রাতে ঠিক মতো ঘুমাতেও পারছিলাম না।
আমি দুঃখিত। ছোট্ট সোনা, তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। এক অদ্ভুত জায়গায় গিয়েছিলাম আমি, অদ্ভুত সব ব্যাপার স্যাপার ঘটছিল ওখানে। আমার নীরব থাকার কারণটা ভালো করেই জানা আছে তোমার।
ভালো কারণগুলোও খারাপ কারণের মতোই সহ্য করে যাওয়া কঠিন, মূল্যবান মেয়েলি যুক্তির সাথে বলল ফেন। হাসল তাইতা, ফেন টিউনিক খুলে গা ধোয়ার সময় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল, তারপর একটা মাটির জগ থেকে পানি নিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে দেখল। মেয়েটা এত দ্রুত পরিপক্ক হয়ে উঠছে দেখে আবারও একটা খোঁচা বোধ করল ও।
উঠে টিউনিকে গা মুছল ফেন, তারপর শুকোনোর জন্যে লিন্টেলের উপর মেলে দিল। মাদুরের ওর পাশে এসে শুয়ে ওর বুকে একটা হাত তুলে দিয়ে নড়েচড়ে কাছে সরে এলো। তুমি যখন ছিলে না তখন খুব শীত আর একাকী লেগেছে, বিড়বিড় করে বলল।
এবার মনে হয় ওকে অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে না আমাকে, ভাবল ও। হান্নাহ হয়তো আমাকে পূর্ণাঙ্গ পুরুষে পরিণত করতে পারবে। হয়তো একদিন ফেন আর আমি স্বামী-স্ত্রী হতে পারব যারা একে কেবল মন নয়, বরং শরীর দিয়েও অন্যকে চেনে, ভালোবাসে। ফেনকে অসাধারণ নারী আর নিজেকে সুদর্শন, সক্ষম পুরুষ হিসাবে কল্পনা করল ও। পুকুরের জলে ইম্প ওর যেমন চেহারা ফুটিয়ে তুলেছিল। দেবতার দয়ায় আমরা সেই সুখের দেখা পেলে কি দারুণ একটা জুটিই না গড়ে তুলতে পারতাম। ফেনের চুলে হাত বোলাতে লাগল তাইতা, উঁচু গলায় বলল, তোমাকে এবার এতদিন যা যা জেনেছি সব বলছি। আমার কথা শুনছ তো, নাকি এখুনি ঘুমে ঢলে পড়ার অবস্থা হয়েছে?
উঠে কঠিন চোখে তাইতার দিকে তাকাল ফেন। অবশ্যই শুনছি। কী নিষ্ঠুর তুমি! তোমার কথা সব সময়ই মনোযোগ দিয়ে শুনি।
তাহলে আবার শোও, মন দিয়ে শুনে যাও। একটু বিরতি দিল তাইতা। তারপর আবার যখন কথা বলল, তখন আর হালকা থাকল না ওর কণ্ঠস্বর।
ডাইনীর আস্তানার খোঁজ পেয়েছি আমি।
আমাকে বলল ওটার কথা-সব-কিছুই লুকোবে না।
তো ওকে মেঘ-বাগিচার কথা বলল তাইতা, বলল জাদুময় গুহার কথা। স্যানেটোরিয়াম আর ওখানে হান্নাহ কী কাজ করে সে কথা বলল। মেরেনের চোখের অপারেশন সম্পর্কে বিস্তারিত জানাল। তারপর একটু দ্বিধায় ভুগলেও শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে হান্নাহর পরিকল্পিত অপারেশনের কথাও বলল।
দীর্ঘসময় চুপ করে রইল ফেন, এক সময় তাই ভাবল মেয়েটা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু তারপরই আবার উঠে গম্ভীর চোখে তাকাল তাইতার দিকে। তার মানে তোমাকে ইম্বালির বলা সেই জিনিসটা দেবে?
হ্যাঁ। কথা শুনে না হেসে পারল না ও। মুহূর্তের জন্যে পুলকিত মনে হলো ফেনকে। তারপর দেবদূতের মতো হসে ফেলল। কিন্তু ওর সবুজ চোখের বাইরের কোণ বিব্রত ভঙ্গিতে উপরের দিকে বেঁকে গেল। তাকলে খুশিই হবো। শুনতে এত দারুণ মনে হয়।
ফেনের কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলল তাইতা। কিন্তু ওর অপরাধবোধটুকু ক্ষুরের ফলার মতোই তীক্ষ্ণ। গুহার ইম্প ওর মনে শয়তানকে গেঁথে দিয়েছে। কিন্তু এমন কিছু ভাবছে বলে আবিষ্কার করল যা দূরে ঠেলে রাখাই ভালো, কখনও মুখে আনতে হয় না। ওর সাথে থাকার সময় সাধারণ বাচ্চাদের তুলনায় ঢের দ্রুত বেড়ে উঠেছে ফেন। কিন্তু স্বাভাবিক শিশু নয় ও, এক মহান রানির অবতার; এই জগতের স্বাভাবিক রীতিনীতিতে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না সে। ওর শরীর দ্রুত বেড়ে ওঠার সাথে সাথে ওদের সম্পর্কও বদলে যাচ্ছে। দিনদিন ফেনের প্রতি ওর ভালোবাসা জোরাল হয়ে উঠছে, কিন্তু সেটা মেয়ের প্রতি পিতার ভালোবাসার মতো নেই আর। ওর দিকে ওই নতুন দৃষ্টি নিয়ে তাকানোর সময় ওর পারস্যের বিড়ালের চোখের মতো বেঁকে যায় সবুজ চোখ। ছোট খুকিটি নেই ও, একটা মেয়ে; ওর নিষ্পাপ তলের ঠিক নিচেই রয়েছে একজন নারী, মুটকীটের ভেতর একটা প্রজাপতি। প্রথম খোলের গায়ে ফাটলগুলো দেখা দিচ্ছে, অচিরেই সেটা ফেটে প্রজাপতিটাকে ওড়ার সুযোগ করে দেবে। ওরা একসাথে হওয়ার পর প্রথমবারের মতো মেঘ-বাগিচার ডাইনীর কথা দুজনের মন থেকেই উধাও হয়ে গেল, সব কিছু বাদ দিয়ে পরস্পরের মাঝে মগ্ন হয়ে থাকল ওরা।
*
পরের দিনগুলোয় সুপ্রিম কাউন্সিলের তলবের অপেক্ষার অবসরে আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে গেল ওরা। ভোর থেকে শুরু করে রাতের খাবারের অনেক পরেও গবেষণা করে চলে ফেন ও তাইতা। বিকেলে তীর ছোঁড়ার অনুশীলন করে বা আশপাশের বনে বাদারে ঘুরে বেড়ানো অসংখ্য বুনো শুয়োর শিকার করতে মেরেন ও অন্যদের সাথে বেড়িয়ে পড়ে। নাকোন্তো ও ইস্থালি হাউন্ডের মতো কাজ করে, পশুর দলকে ফাঁকায় বের করে আনতে পায়ে হেঁটে কেবল বর্শা ও কুড়োল নিয়ে গভীরতম ঝোপে ঢুকে পড়ে ওরা। বর্শা হাতে ওদের পথ দেখায় হিলতো। তীর চালিয়ে নতুন চোখো তীক্ষ্ণতা পরখ করে মেরেন, তারপর তলোয়ারের সাহায্যে মৃত পশুর ব্যবস্থা করে। সবচেয়ে বড় বয়স্ক শুয়োর খুঁজে বের করে ওরা, যেগুলো ভয়ঙ্কর, ভীতিহীন; গুঁড় দিয়েই মানুষকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। মাদী শুয়োরগুলো আকারে ছোট হলেও তীক্ষ্ণ ড় তাদের, মদ্দাগুলোর মতোই সমান আগ্রাসী হতে পারে-খেতেও ভালো। ফেনকে সাথে রাখে তাইতা, ওয়ার্লউইন্ডের পিঠে চেপে ছোট তীর-ধনুক নিয়ে কোনও বিরাট শুয়োরের পিছু ধাওয়া করতে ছুটে যেতে চাইলে সামলে রাখে ওকে। শুয়োরগুলো খাট গলার, পিপের মতো বুক। গায়ের পুরু চামড়া ভারি তীর ছাড়া বাকি সব অস্ত্র হয় ঠিকরে দেয় বা পিছলে পড়ে সেগুলো। কালো কেশরে চকচকে কুঁজো পিঠ ওয়ার্লইউভের রেকাবের কাছাকাছি উঠে আসে। মাথার ধাক্কায় যেকারও উরুর হাড় বের করে ফেলতে পারে ওরা, ছিঁড়ে ফেলতে পারে ফেমোরাল ধমনী।
