ভালো একটা কারণ দিয়েছি আমি তাকে, স্বীকার গেল তিনাত। আবার আলাদা হতে না পারলে আমাদের দুজনের পক্ষে আর কথা বলা সম্ভব হবে না। অবশ্য, আপনি আমাকে কোনও খবর পাঠাতে চাইলে মুতাঙ্গির ম্যাজিস্ট্রাট বিলতোর মারফত পাঠাতে পারবেন। আমাদের লোক সে। কিন্তু এখন ক্যাপ্টেন ওনকা রয়েছে আমাদের সাথে।
ওদের ঠিক সামনে এসে লাগাম টানল ওনকা। থামতে বাধ্য করল ওদের। কর্নেল তিনাত, আমার দায়িত্বটুকু পালন করেছ বলে তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। উধ্বর্তনকে অভিবাদন জানাল না সে। কণ্ঠের পরিহাস প্রায় উপেক্ষা করার পর্যায়ে এসে ঠেকল।
দেখা যাচ্ছে অসুস্থতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছ তুমি, জবাব দিল তিনাত।
সুপ্রিম কাউন্সিল তোমার প্রতি আমার চেয়ে কম কৃতজ্ঞ। ম্যাগাসের এসকর্টের দায়িত্ব নিয়ে হুকুম অমান্য করেছ তুমি।
লর্ড আকেরের কাছে জবাবদিহি করতে পারলে খুশি হবো আমি।
তার দরকার হতে পারে তোমার। তার আগে ম্যাগাস গালালার তাইতাকে আমার হাতে তুলে দিতে বলেছেন তিনি। ডাক্তার হান্নাহর রিপোর্টও আমার হাতে তুলে দিতে হবে। আমি ওটা ওর কাছে নিয়ে যাব। দেরি না করে বাকি পর্যটকদের মেঘ-বাগিচায় নিয়ে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তোমাকে। ওকে অনুসরণ করে আসা দলটার দিকে ইঙ্গিত করল সে। ওদের ডাক্তার হান্নাহর হাতে তুলে দিয়েই ফিরে আসবে। পাউচ থেকে ডাক্তার হান্নাহর প্যাপিরাস রোল বের করে ওনাকে দিল তিনাত। আড়ষ্টভাবে পরস্পরকে অভিবাদন জানাল ওরা। তাইতা ও মেরেনকে শীতল বিদায় সম্ভাষণ জানাল তিনাত, তারপর দ্বিতীয় কলামের সামনে অবস্থান নিতে পথ বেয়ে নেমে গেল, আবার পাহাড়ের পথে ফিরে যাবে।
অবশেষে তাইতার দিকে ফিরল ওনকা। শুভেচ্ছা, সম্মানিত ম্যাগাস। কর্নেল ক্যাম্বিসেস, শুভেচ্ছা। দেখতে পাচ্ছি তোমার চোখের অপারেশন সফল হয়েছে। আমার অভিনন্দন। তোমাদের মুতাঙ্গির কোয়ার্টারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে আমার প্রতি। সুপ্রিম কাউন্সিল তলব না করা পর্যন্ত ওখানেই থাকতে হবে তোমাদের। তলব আসতে কয়েক দিনের বেশি লাগবে না।
ওনকার আভা এখনও রাগে দপদপ করছে। ঘোড়ার পেটে লাথি দিয়ে ওটার গতি দুলকি চালের চেয়ে একটু বেশি বাড়িয়ে তুলল সে, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল ওরা।
দুটো দল পাশ কাটানোর সময় তিনাত বা ওনকা পরস্পরকে পাত্তা দিল না, এক দল উপরে উঠছে, আরেক দল নিচে যাচ্ছে। তাইতাও কর্নেল তিনাতকে উপেক্ষা করে তার সাথে মেঘ-বাগিচার দিকে আগুয়ান দলটার দিকে তাকাল। পূর্ণাঙ্গ পোশাক পরা ছয়জন সৈনিক, তিনজন সামনে, বাকি তিনজন পেছনে। ওদের মাঝখানে রয়েছে পাঁচজন অল্প বয়সী মেয়ে, সবাই কমনীয় চেহারার, প্রত্যেকের পেটেই বাচ্চা। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মেরেন ও তাইতার উদ্দেশে হাসল ওরা, কিন্তু কথা বলল না কেউ।
মুতাঙ্গি থেকে আধা লীগ দূরে থাকতে একটা বিশাল কোল্টের পিঠে চেপে ছোটখাট একটা অবয়ব বন থেকে সবেগে বের হয়ে এলো। সবুজ মাঠের উপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে আসতে শুরু করল ওদের দিকে। তার দীর্ঘ সোনালি চুল বাতাসে পতাকার মতো উড়ছে।
এই যে ঝামেলার আগমন, যথারীতি ভালোই আছে, বলে হেসে উঠল মেরেন। এই দূরত্বেও উত্তেজনায় ফেনের চিৎকার শুনতে পাচ্ছে ওরা।
মনকে উষ্ণ করে তোলার মতো একটা দৃশ্য, বলল তাইতা। ওর দৃষ্টি কোমল, প্রেমময়।
ওর পাশে এসে লাগাম টেনে ধরল ফেন, মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা লাফ দিয়ে পার হলো। ধরো আমাকে! রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল।
বলতে গেলে প্রায় অপ্রস্তুত অবস্থায় এই আক্রমণের স্বীকার হয়েছে তাই। কিন্তু সামলে নিল ও, দুই হাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরল ফেন, মুখ দাবাল গালে।
এইসব কায়দার পক্ষে এখন অনেক বড় হয়ে গেছ তুমি। আমরা দুজনই চোট পেতে পারতাম। প্রতিবাদ করল তাইতা। কিন্তু ফেনের মতো করেই জড়িয়ে ধরে রাখল ওকে।
আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম তুমি আর ফিরবে না। খুবই একঘেয়ে লাগছিল।
গ্রামের সব বাচ্চাকাচ্চা ছিল তোমার সাথে, মৃদু কণ্ঠে যুক্তি দেখাল তাই।
ওরা তো বাচ্চাই, তাইতার কণ্ঠলগ্ন থেকেই মেরেনের দিকে তাকাল ও।
তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল, সৎ মেরেন। হিলতো কীভাবে আমাকে তীর ছোঁড়া শিখিয়েছে দেখলে অবাক হয়ে যাবে। তোমার সাথে আমার তীর ছোঁড়ার একটা প্রতিযোগিতা হবে। বিরাট একটা পুরস্কার থাকবে তাতে- হঠাৎ থেমে গিয়ে যারপরনাই বিস্ময়ের সাথে মেরেনের দিকে তাকাল ও। তোমার চোখ! চিৎকার করে বলে উঠল। ওরা তোমার চোখ ঠিক করে দিয়েছে। তোমাকে আবার সুন্দর লাগছে।
শেষবার দেখার পর তুমি আরও বড় আর সুন্দর হয়ে উঠেছ, জবাব দিল মেরেন।
ওহ, দুষ্টু মেরেন! হেসে উঠল ফেন। আরও একবার ঈর্ষার একটা খোঁচা অনুভব করল তাইতা।
গ্রামে পৌঁছানোর পর হিলতো, নাকোন্তো ও ইম্বালি ওদের স্বাগত জানাতে পেরে দারুণ খুশি হয়ে উঠল। বাড়ি ফেরার উপহার হিসাবে হিলতো ও নাকোন্তো পাঁচটা বিরাট আকারের দারুণ মদের জগ আর একটা মোটাসোটা ভেড়া পাঠাল। ইম্বালি ও ফেন ধুরা আর সজি তৈরি করল। পরে অর্ধেক রাত জুড়ে আগুনের ধারে বসে ভোজ পর্ব সারল ওরা। পুনর্মিলন উদযাপন করল। মেঘ-বাগিচার একেবারেই ভিন্ন জগতের পর এখানকার পরিবেশ এতটাই ঘরোয়া ও পরিচিত লাগল যে এক মুহূর্তের জন্যে ইয়োসের ভীতি যেন দূরের ও ভিত্তিহীন মনে হলো।
