মাথা দোলাল মেরেন। আসলেই মহান মানুষ ছিলেন তিনি, তবে আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ না করে পারছি না, ম্যাগাস। আপনার চেয়ে কোনওভাবেই বড় ছিলেন না।
প্রশংসায় আমোদিত হাসি দিল তাইতা। অনুগত মেরেন, আশা করি আমার সত্যিকারের দোষ কখনওই যেন ধরতে না পারো। অবশ্য, বলতে গেলে, দিমিতার সামনাসামনি ইয়াসের মোকাবিলা করেছেন। শক্তি ও প্রজ্ঞা সত্ত্বেও প্রথম মোকাবিলাতেই ওকে প্রায় শেষ করে দিয়েছিল ইয়োস, পরের হামলায় সফল হয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তবে ইয়োস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানোর মতো যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেছেন, নীলে বাঁধ দেওয়ার পেছনে তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মিশরকে এমন অবস্থায় নামিয়ে আনা যাতে জনগণ তাকেই একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসাবে স্বাগত জানায়। তাহলে তার পক্ষে মিশরের দুই রাজ্যের ক্ষমতা দখল করে নেওয়া সহজ হবে। মিশরের সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতা হাতে পেলে চড়ুই পাখির ঝাকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া বাজপাখির মতো পৃথিবীর অন্যান্য জাতির উপর হামলে পড়বে সে। সবাইকে তার ইচ্ছার অধীনে নিয়ে আসা তার একমাত্র খায়েশ।
এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিল তিনাত তবে এখন আগ্রহী হয়ে উঠেছে সে। ইয়োন্স নামের এই প্রাণীর সাথে কোথায় মোকবিলা করেছেন দিমিতার? সেটা কি জাররির ঘটনা?
না। অনেক দূরের এক দেশ, একসময় সেখানে থাকত সে। মনে হচ্ছে সেখান থেকেই পালিয়ে এখানে চলে এসেছিল সে। মাটির নিচের আগুন ও উত্তপ্ত নদী থেকে প্রাণশক্তি সঞ্চয় করতে হয় তাকে। দিমিতারের দেওয়া সূত্র জাররিতে নিয়ে এসেছে আমাকে। একসাথে স্যাডলের উপর ঘুরে লম্বা মুকুটঅলা পাহাড়ের দিকে তাকাল তিনজন।
অবশেষে কথা বলল তিনাত। এখানে তিনটা বিরাট আগ্নেয়গিরি আছে। কোনটা তার ঠিকানা?
মেঘ-বাগিচাই তার শক্তঘাঁটি, জবাব দিল তাইতা।
নিশ্চিত হচ্ছেন কীকরে?
আমি ওখানে থাকতে দেখা দিয়েছিল সে।
তাকে দেখেছেন? চিৎকার করে উঠল মেরেন।
ঠিক তাকে না, তবে তার নানা রূপের কয়েকটা নিয়ে আমার সামনে হাজির হয়েছিল।
দিমিতারের মতো আপনাকে আক্রমণ করেনি, যে ম্যাগাসের কথা আপনি বলেছেন? জানতে চাইল তিনাত
না, কারণ আমার কাছে একটা কিছু চায় সে। সেটা আয়ত্তে এসে গেলেই কোনও রকম দ্বিধা ছাড়াই আমাকে ধ্বংস করে দেবে সে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত আমি নিরাপদ-কিংবা তার কাছে থাকা অবস্থায় যতখানি নিরাপদ থাকা সম্ভব।
আপনার কাছে সে কী চায়? জানতে চাইল তিনাত। মনে হচ্ছে সবই তো আয়ত্তে আছে।
আমার জ্ঞান আর বিদ্যা নিতে চায় সে, যা তার নেই।
বুঝলাম না। আপনি বলতে চাইছেন সে চায় আপনি তাকে শিক্ষা দেন?
আসলে সে ভ্যাম্পায়ার বাদুরের মতো, তবে রক্তের বদলে শিকারের সত্তা আর আত্মা শুষে নেয়। শত শত বছর ধরে হাজার হাজার ম্যাগাস ও ভবিষ্যদ্বক্তার বেলায় এমন করেছে সে। কর্নেল তিনাত, তুমি যাদের জাররিতে নিয়ে আসার কথা বলেছ ওদের পৌঁছে দেওয়ার পর কী ঘটেছে তাদের ভাগ্যে?
ক্যাপ্টেন ওনকা এই পথেই ওদের পাহাড়ে নিয়ে গেছে। তারপর ওদের কী হয়েছে জানি না। সম্ভবত মেঘ-বাগিচার কোথাও আছে তারা, স্যানেটোরিয়ামে থাকছে। হয়তো ডাক্তার হান্নাহর সাথে কাজ করছে।
তোমার কথা ঠিক হতেও পারে, তবে আমার মনে হয় না। আমার বিশ্বাস তাদের কাছ থেকে ডাইনী সমস্ত জ্ঞান আর প্রজ্ঞা কেড়ে নিয়েছে।
সত্রাসে ওর দিকে চেয়ে রইল তিনাত। পরের প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার সময় কণ্ঠের সুর পাল্টে গেল ওর-ভয়ের ছাপ সেখানে। তাহলে তাদের কী হয়েছে বলে মনে করেন, ম্যাগাস?
হ্রদের কুমীরগুলো দেখেছ না? ওদের বিরাট আকার লক্ষ করেছ?
হ্যাঁ, সেই একই ভীত কণ্ঠে বলল তিনাত।
আমার বিশ্বাস এটাই তোমার প্রশ্নের উত্তর।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তিনাত। তারপর জানতে চাইল, আপনি সেই ঝুঁকি নেবেন, ম্যাগাস?
একমাত্র এভাবেই আমার পক্ষে তার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। তাকে অবশ্যই সামনাসামনি দেখতে হবে, কেবল তার প্রকাশ নয়। তারপর হয়তো নিজের অজান্তেই আমাকে একটা সুযোগ করে দেবে সে। হয়তো আমাকে খাট করে দেখে সতর্কতায় ঢিল দেবে।
আপনি ব্যর্থ হলে আমার লোকজনের কী হবে?
তোমাদের সবাইকেই জাররি থেকে পালাতে হবে, নইলে নিশ্চিত মৃত্যু ঘটবে।
আজীবন দাসত্বের চেয়ে মরণ অনেক ভালো, স্বভাবজাত গাম্ভীর্যের সাথে বলল তিনাত। তাহলে আপনি আবার মেঘ-বাগিচায় ফিরে যাবেনই?
হ্যাঁ। আমাকে ফের ডাইনীর আস্তানায় ফিরতে হবে।
কীকরে সেটা করবেন?
সুপ্রিম কাউন্সিলের হুকুমে। আমার বিশ্বাস ইয়োস আমাকে তার কাছে। পাঠানোর নির্দেশ দেবে। আমার আত্মার জন্যে মুখিয়ে আছে সে।
*
পাহাড়ের শেষ ঢাল বেয়ে নামার সময় আরেক দল ঘোড়সওয়ারকে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখল ওরা। দল দুটো যখন কেবল কয়েক শো কদম দূরে, অচেনা ঘোড়সওয়ারদের একজন স্পার দাবিয়ে সামনে ছুটে এলো। সে কাছাকাছি আসতেই মেরেন বলে উঠল, এ যে দেখছি ওনকা।
তোমার নতুন চোখটা পুরোনোটার মতোই ভালো কাজ দিচ্ছে, মন্তব্য করল তাইতা। তারপর অন্তর্চক্ষু দিয়ে আগুয়ান অশ্বারোহীর আভা পরখ করল। ওনকার আভা জ্বলজ্বল করছে, জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টগবগ করছে।
ক্যাপ্টেন ক্ষেপে আছে, বলল তাইতা।
