তাইতা বুঝতে পারছিল ওর সামনে আরেকটা প্রলোভনের বীজ তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু সেটাকে ঠেকানোর কোনও উপায় আছে বলে মনে হলো না। যেভাবেই হোক, সহযোগিতা করলে হয়তো ইয়োসের দিকে এক কদম এগিয়ে যেতে পারবে ও। চোখ বুজে কুঁচকির উপর থেকে হাত সরিয়ে নিল ও। বুকের উপর আড়াআড়িভাবে হাত রেখে শুয়ে রইল চুপচাপ। টিউনিক উঁচু করে আলতো করে পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করছে হান্নাহ, টের পেল। ওর মনে শয়তানের রোপন করা কামুক ছবিগুলো বিরামহীনভাবে উঠে আসতে লাগল। গুঙিয়ে ওঠা ঠেকাতে দাঁতে দাঁত চাপল ও।
আমার কাজ শেষ, বলল হান্নাহ। আপনার সহযোগিতার জন্যে ধন্যবাদ। আগামীকাল আপনার বিদায় নেওয়ার সময় কর্নেল তিনাত আনকুরের হাতে কাউন্সিলের কাছে জবাব পাঠাব আমি।
আগামীকাল, ভাবল তাইতা। জানে এই স্বর্গরূপী নরক থেকে উদ্ধার পাওয়ার সংবাদে ওর খুশি হওয়া উচিত, কিন্তু ঠিক উল্টো অনুভূতি হলো ওরা। চলে যেতে ইচ্ছা করছে না ওর, আবার ওকে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে কিনা জানতে অধীরভাবে অপেক্ষা করতে লাগল। এখনও ওর মনে ছায়া খেলা খেলছে ইয়োস।
*
জ্বালামুখের দেয়ালের উপরে সূর্য উঠে আসতে এখনও ঘণ্টাখানেক বাকি আছে। কিন্তু কোয়ার্টার থেকে বের হয়ে আসার পর কর্নেল তিনাত ও তার দলবলকে অপেক্ষায় দেখল তাইতা ও মেরেন। ওদের মালপত্র বইছে মেরেন। নিজের ব্যাগ বে-র পিঠে তুলে দিয়ে উইন্ডস্মোকের কাছে চলে গেল ও, ওটার জিনের পেছনে বেঁধে দিল তাইতার মালপত্র। তাই কাছে যেতে হ্রেষারবে স্বাগত জানাল মেয়ারটা, প্রবলভাবে নাক দিয়ে ঠেলতে লাগল। ওর কাঁধে চাপড় দিল তাইতা। আমারও তোর কথা খুব মনে পড়েছে, কিন্তু ওরা বোধে হয় তোকে অনেক বেশি ধুরা খাইয়েছে, ওকে ভর্ৎসনা করল ও। হয় বেশি খেয়েছিস, নইলে তোর পেটে আবার বাচ্চা এসেছে।
স্যাডলে চেপে তিনাতের বাহিনীকে অনুসরণ করে খিলানের ভেতর দিয়ে প্রাঙ্গণের উপর দিয়ে এগিয়ে হ্রদের চাতালের দিকে এগিয়ে চলল ওরা। রাস্তাটা যেখানে বনের দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে পৌঁছে স্যাডলে ঘুরে বসে পেছনে তাকাল তাইতা। স্যানেটোরিয়ামের দালানকোঠা জনশূন্য ঠেকল, যেন ওখানে কেউ নেই, কেবল ঝর্না থেকে মেঝের নিচে উষ্ণ পানি বয়ে নিয়ে যাওয়া ফুগুলোর ফোকর দিয়ে বাষ্প উঠে যাচ্ছে। ভেবেছিল হান্নাহ ওদের বিদায় জানাতে আসবে, না আসায় কিছুটা হতাশ হয়েছে ও। গত এক সপ্তাহে অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা লাভ করতে হয়েছে ওদের। নিজের পেশার প্রতি মহিলার অঙ্গীকার ও তার জ্ঞানের বহরের প্রতি শ্রদ্ধাবান হয়ে উঠেছে ও। আবার সামনে চোখ ফেরাল ও, এসকর্টদের সাথে বনের ভেতরে ঢুকল।
ভ্যানগার্ডের সাথে সামনে রয়েছে তিনাত। ক্লিনিক ছেড়ে আসার পর মাত্র একবার ওদের সাথে কথা বলেছে সে-কেবল আনুষ্ঠানিক সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্যে।
ওরা বাইরের দুনিয়ার দিকে চলে যাওয়া জ্বলামুখের ভেতরের সুড়ঙের কাছাকাছি আসার সাথে সাথে মেঘ-বাগিচায় থেকে যাবার ইচ্ছাটুকু ক্রমে মিলিয়ে যাওয়া টের পেলো তাইতা। আবার ফেনের সাথে দেখা হওয়ার কথা ভাবতে শুরু করল ও, মন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। প্রিয় কুচকাওয়াজের সুর ভাজছিল মেরেন, এক ঘেয়ে বেসুরো। তবে এটা তার খোশ মেজাজের নিশ্চিত লক্ষণ। হাজার হাজার লীগ একসাথে চলতে গিয়ে এই সুর শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাই এখন আর বিরক্ত বোধ করে না।
সুড়ঙের গেট দৃষ্টিসীমার এলে গতি কামিয়ে ওর পাশে চলে এলো তিনাত। এবার আপনার জোব্বা গায়ে চাপানো উচিত। টানেলে বেশ ঠাণ্ডা, বাইরে একেবারে বরফ হয়ে যাবার যোগাড় হবে। প্রবেশ পথে পৌঁছানোর সময় আমাদের অবশ্যই একসাথে থাকতে হবে। দূরে সরে যাবেন না। শিম্পাঞ্জিগুলোর মেজাজ মর্জি বোঝা ভার, বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ওদের নিয়ন্ত্রণ করে কে? জানতে চাইল তাইতা।
জানি না। আগেও যখন এদিকে এসেছি কোনও দিন কোনও মানুষের ছায়াও দেখিনি। ওর আভা পরখ করে তাইতা বুঝতে পারল লোকটা সত্যি কথা বলছে।
সমতলে আসার পর শিম্পাঞ্জিদের বুনো দৃষ্টি এড়িয়ে গেল ও। লাফ দিয়ে সামনে এসে ওর পায়ের গন্ধ শুকল একটা। ভয়ে পিছু হটল উইন্ডস্মোক। আক্রমণাত্মক ঢঙে মাথা দোলাতে লাগল বাকি দুটো। তবে ওদের বের হতে দিল। তাসত্ত্বেও তাইতা বুঝতে পারল ওরা হিংস্রতার কত কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, কত সহজেই ওরা আক্রমণের উস্কানি পেতে পারে। আক্রমণ করে বসলে ওদের ঠেকানোর মতো কিছুই করার ছিল না ওর।
ওরা সুড়ঙের মুখে পৌঁছানার পর স্যাডলের উপর সামনে ঝুঁকল তাইতা, পাথরের গায়ে ঘষা খেল ওর জোব্বার টুপি। আগের মতোই সুড়ঙটাকে অন্তহীন ঠেকল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাতাসের ভীতিকর গর্জন কানে এলো ওদের, সামনে ধূসর মিটিমিটি আলো দেখতে পেল।
পাহাড়ের কঠিন, অসাধারণ আঁকে বের হয়ে এলো ওরা। মেঘ-বাগিচার প্রশান্ত সৌন্দর্য থেকে একেবারেই ভিন্ন। শিম্পাঞ্জির দল ওদের চারপাশে ভীড় করল, কিন্তু অনীহার সাথে ওদের পথ করে দিতে লাফিয়ে হেলেদুলে সরে গেল। পথে বের হয়ে এসে বাতাসের অত্যাচারের মুখে পড়ল ওরা। চামড়ার জোব্বায় নিজেদের জড়িয়ে নিয়ে বাতাসের ঝাপ্টার বিরুদ্ধে লড়াই করে আগে বাড়তে মাথা নামাল ঘোড়াগুলো। পেছনে খাড়া হয়ে গেল লেজগুলো। বরফ শীতল বাতাসে ওদের নিঃশ্বাসে যেন বাষ্প বের হচ্ছে, বরফে পিছলে যাচ্ছে ওদের খুর।
