এমন হতে পারে তার ভালো আচরণের পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে আমরা যার খবর রাখি না।
*
ওরা শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ করার প্রায় সাথে সাথে কাজের কথা পাড়ল হান্নাহ। কর্নেল তিনাত আনকুত লর্ড আকেরের স্বাক্ষর করা সুপ্রিম কাউন্সিলের একটা ডিক্রি আমার হাতে দিয়ে গেছে। সেজন্যে আপনার দিক থেকে কোনও রকম অসুবিধা বা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু আপনার উপর একটা পরীক্ষা চালিয়ে কাউন্সিলের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমাকে। সেজন্যে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সুতরাং আপনি আমার সাথে আমার কামরায় এলে কৃতজ্ঞ বোধ করব, যাতে এখুনি কাজ শুরু করতে পারি।
হান্নাহর কণ্ঠে হুকুমের সুর শুনে অবাক হলো তাইতা, যতক্ষণ না বুঝতে পারল যে সুপ্রিম কাউন্সিলের জারি করা যেকোনও ডিক্রিই জাররিতে কারনাকে বাজপাখির সীলমোহরঅলা ফারাওর নির্দেশের মতোই সমান গুরুত্ব বহন করে।
অবশ্যই, ডাক্তার। নির্দেশ পালন করতে পারলে খুশিই হবো।
স্যানেটোরিয়ামের অন্যতম দূরবর্তী ব্লকে ডাক্তার হান্নাহর কামরাগুলো চুনাপাথরের টালি দেওয়া। শদামাঠা, কোনওরকম ঠাসঠাসি নেই। দূরের দেয়াল বরাবর পাথরের তাকের সাথে দুই সারি কাঁচের পাত্র রাখা। প্রত্যেকটাতে পরিষ্কার তরলে মানুষের জ্বণ ভাসছে। স্পষ্টতই কোনও রকম সংরক্ষক দ্রব্য হবে। নিচের তাকে নয়টা জ্বণের নমুনা জরায়ু থেকে বের করে আনার সময় অনুযায়ী সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে ছোটটা ফিকে ব্যাঙাচির চেয়ে বড় হবে না, আর সবচেয়ে বড়টি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার ঠিক আগ মুহূর্তে বের করা।
একেবারের উপরের তাকের জ্বণগুলো মোটামুটি বিকৃত, কয়েকটার চোখ দুটোর বেশি, অন্যগুলোর বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই; একটার আবার ভয়ঙ্কর দর্শন দুটো মাথা রয়েছে। এমন সংগ্রহ কোনওদিন দেখেনি তাইতা। এমনকি সার্জন হিসাবে বিকৃত ও অপুর্ণাঙ্গ মানবদেহ দেখে অভ্যস্ত হলেও এমনি করুণ রেলিকসের
প্রদর্শনীতে রীতিমতো বিতৃষ্ণা জেগে উঠল ওর।
নিশ্চয়ই সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে ভিন্ন আগ্রহ রয়েছে তার, ভাবল ও, মেঘ বাগিচায় আসার পর থেকে এখানে অনেক বেশি অন্তসত্তা মেয়ে দেখার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কামরার বাকি অংশ একটা বিরাট পরীক্ষার টেবিল দখল করে রেখেছে, একটা মাত্র লাইম স্টোনের ব্লক থেকে কুঁদে বের করা হয়েছে ওটাকে। তাইতা বুঝতে পারল হান্নাহ সম্ভবত টেবিলটাকে অপারশেন ও সন্তান প্রসবের কাজে ব্যবহার করে থাকে। কারণ টেবিলের উপরে গর্ত করা রয়েছে, পায়ের কাছে একটা নালার ফুটো দিয়ে তরল বের হয়ে এসে নিচের মেঝেতে রাখা একটা গামলায় জমা হচ্ছে।
তাইতার কাছে ওর পেশাব-পায়খানার নমুনা চেয়ে নিয়ে পরীক্ষা শুরু করল হান্নাহ। সামান্য থতমত খেয়ে গেল ও। একবাতানায় এক সার্জনের সাথে পরিচয় হয়েছিল ওর, বজ প্রক্রিয়া নিয়ে তার আবার বিকৃত দুর্বলতা ছিল। কিন্তু হান্নাহর পদমর্যাদার একজন একই রকম আগ্রহ দেখাবে বলে ভাবেনি। অবশ্য ওকে একটা কিউবিকলে নিয়ে যেতে দিল ও, এখানে তার একজন সহকারী একটা বড়সড় গামলা ও এক জগ পানি দিল ওকে যাতে তার অনুরোধ রক্ষার পর পরিষ্কার হয়ে নিতে পারে।
হান্নাহর কাছে ফিরে আসার পর ওর বর্জ্য পরখ করল সে, তারপর টেবিলের উপর চিত হয়ে শুয়ে পড়তে বলল। তাইতা লম্বা হয়ে শোয়ার পর ওর বর্জ্য থেকে নাক, চোখ, আর মুখের দিকে মনোযাগ সরাল। একজন সহকারী তেলের কুপির আলো ওর চোখের দিকে পাঠাতে একটা রূপালি চাকতি ব্যবহার করল। এবার ওর বুকে কান পেতে মনোযোগ দিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস আর হৃৎপিণ্ডর স্পন্দন শুনল সে।
আপনার হৃৎপিণ্ড আর ফুসফুস ঠিক তরুণের মতো। আপনার দীর্ঘায়ু হওয়াটা বিস্ময়কর কিছু নয়। ইশ, আমাদের সবাইকে যদি ফন্টের স্বাদ নিতে দেওয়া
হতো। তাইতার সাথে নয় বরং যেন আপনমনেই কথা বলছে সে।
ফন্ট? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
বাদ দিন, নিজের ভুল বুঝতে পারল সে। এড়িয়ে গেল প্রসঙ্গটা। একজন বয়স্কা মহিলার অলস কথাবার্তাকে আমলে নেবেন না। চোখ তুলে না তাকিয়ে পরখ করে চলল সে।
অন্তর্চক্ষু খুলল তাইতা। লক্ষ করল, মহিলার আভার কিনারাগুলো বিকৃত হয়ে আছে। ফন্টের কথা উল্লেখ করায় নিজের উপর বিরক্তির লক্ষণ। তারপরই বিকৃতিটা মিলিয়ে যেতে দেখল। আভা কঠিন হয়ে উঠল। ফন্ট সম্পর্কে ওর দিক থেকে আর কোনও প্রশ্ন আসার সম্ভাবনার প্রতি মনটাকে বন্দি করে ফেলল। নিশ্চয়ই গিল্ডের অন্যতম রহস্য হয়ে থাকবে এটা। সময় নেবে ও।
ওর বুক পরীক্ষা শেষ করল হান্নাহ, তারপর পিছিয়ে গেল; সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকাল। এবার আপনার লিঙ্গের ক্ষত পরীক্ষা করতে হবে আমাকে, বলল সে।
নিজেকে বাঁচাতে সহজাত প্রবৃত্তির বশেই নিচের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল তাইতা।
ম্যাগাস, আপনি কায়মনোবাক্যে সম্পূর্ণ নিজের মাঝে মগ্ন একজন মানুষ। আপনার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার বিশ্বাস আমি তা সারিয়ে তুলতে পারব। এমন কর্তৃপক্ষ আমাকে এই কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে আমার পক্ষে যা অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। আপনি আমার বিরোধিতা করতে পারেন, সেক্ষেত্রে আমি সহকারীদের তলব করতে বাধ্য হবো, প্রয়োজনে আমাকে সাহায্য করার জন্যে কর্নেল তিনাত আনকুত ও তার লোকজনকেও ডাকব। কিংবা আমাদের দুজনের পক্ষেই ব্যাপারটা আপনি সহজ করে তুলতে পারেন। কিন্তু দ্বিধায় ভুগল তাই। আবার শান্ত কণ্ঠে কথা বলল হান্নাহ। আপনার প্রতি আমার কেবলই গভীর শ্রদ্ধা বোধ রয়েছে। আপনার অসম্মান করার কোনও ইচ্ছা আমার নেই। বরং, আপনাকে অসম্মানের হাত থেকে বাঁচাতে চাই। আপনার ক্ষত ঠিক করে দেওয়ার মতো আর কোনও কিছুই আমাকে অতটা সম্ভষ্টি যোগাতে পারবে না, যাতে আপনার মনের পূর্ণতার মতোই শারীরিক পূর্ণতার জন্যেও সারা জগতের শ্রদ্ধা লাভ করতে পারেন।
