সেটা কি তার দিকেই ফেরত পাঠাতে পেরেছিলেন? জানতে চাইল তাইতা। তার জাদু দিয়েই তাকে ঘায়েল করতে পেরেছিলেন?
সে হয়তো আত্মতুষ্টিতে ভুগছিল, কারণ আমার বাকি শক্তিকে খাট করে দেখেছিল বলে নিজেকে যথাযথভাবে সুরক্ষিত করেনি। তার সত্তা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছিলাম আমি। অন্তর্চক্ষু দিয়ে তখনও টের পাচ্ছিলাম তা। খুব কাছে ছিল সে। আমাদের মাঝখানে কেবল সংকীর্ণ প্রণালীটা ছিল। আমার হামলা ঠিকই জোরালভাবে আঘাত করে তাকে। ইথারে তার অর্তনাদ শুনতে পেয়েছি। তারপরই উধাও হয়ে গেছে সে। কিছু সময়ের জন্যে তাকে শেষ করতে পেরেছি বলে বিশ্বাস করেছিলাম। আমার মেজবানরা এরনা পাহাড়ের ঢালের ভাইদের সাহায্যে গোপন অনুসন্ধান চালিয়েছিল। ওদের কাছে জানতে পারি, উধাও হয়ে গেছে সে, তার সাবেক আস্তানা পরিত্যক্ত। বিজয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করিনি। মোটামুটি গায়ে শক্তি ফিরে পাওয়ামাত্র নিরাপদ সেই আশ্রয় ছেড়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দূর কোণে, বরফের মহাদেশে চলে গেছি আমি। ইয়োসের নাগাল থেকে এর বেশি দূরে যাওয়া সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে। অবশেষে শান্তিতে থাকার মতো একটা জায়গার খোঁজ পাই, তখনও পাথর চাপা ব্যাঙের মতো সন্ত্রস্ত ছিলাম। অল্প কিছুদিন পর, পঞ্চাশ বছর বা তার কম হবে, ফের শত্রুর পুনরাবির্ভাব টের পাই। যেন বিপুলভাবে বেড়ে উঠেছিল তার ক্ষমতা। আমার উদ্দেশে ছুঁড়ে দেওয়া ভয়ঙ্কর তীরের গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছিল ইথারে। আমার সঠিক অবস্থান ধরতে পারেনি সে। তার অনেকগুলো তীর আমার অবস্থানের কাছাকাছি এলেও কোনওটাই লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি। তারপর থেকে প্রতিটি দিনই ছিল রীতিমতো সংগ্রাম, উত্তরাধিকারীকে খুঁজে ফিরছিলাম আমি। তার আক্রমণের জবাব দেওয়ার মতো ভুল করার সুযোগ ছিল না। যখনই টের পেয়েছি এগিয়ে আসছে সে, স্রেফ নীরবে অন্য কোথাও সরে গিয়েছি। অবশেষে বুঝতে পেরেছি পৃথিবীর বুকে একটা জায়গাই আছে যেখানে আমার খোঁজ করবে না সে। তখন আবার গোপনে এরনায় ফিরে যাই। তার পুরোনো আস্তানা, আমার বন্দিশালা সেই গুহায় আশ্রয় নিই। তার অশুভ শক্তির জোরাল প্রতিধ্বনি তারপরও আমার নাজুক অস্তিত্ব ঢেকে দিচ্ছিল। পাহাড়ে গা ঢাকা ছিলাম আমি। এক সময় টের পেলাম আমার প্রতি তার আগ্রহ কমে গেছে। তার অনুসন্ধান এলোমেলো হয়ে এক সময় বন্ধ হয়ে গেল। হয়তো ভেবেছে, আমি শেষ হয়ে গেছি বা আমার ক্ষমতা এমনভাবে নষ্ট করে দিয়েছে যে আমাকে আর ঝুঁকি মনে হয়নি। তারপর আপনার জোরাল অস্তিত্ব টের পাওয়ার সেই আনন্দময় দিন পর্যন্ত আত্মগোপনেই ছিলাম। সরস্বতীর যাজিকারা আপনার অন্তর্চক্ষু খুলে দেওয়ার পর সে কারণে ইথারে তৈরি হওয়া অস্থিরতা টের পেলাম। এবার আপনি যে তারাটাকে লস্ত্রিস ডাকেন, সেটা দেখা দিল। নিজের বিক্ষিপ্ত স্থিরতা একত্রিত করে তারা অনুসরণ করে আপনার কাছে হাজির হই।
দিমিতারের কথা শেষ হলে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল তাইতা। উইন্ডস্মোকের পিঠে উবু হয়ে বসে আছে ও, ওটার সহজ দুলুনির সাথে দোল খাচ্ছে। মাথার চারপাশে জড়িয়ে রেখেছে জোব্বাটা। ওটার ফোকর দিয়ে কেবল ওর চোখজোড়া দেখা যাচ্ছে। তো এরনায় না থাকলে, অবশেষে জিজ্ঞেস করল ও। কোথায় আছে সে, দিমিতার?
বলেছি তো, আমার জানা নেই।
যদিও মনে হচ্ছে আপনার জানা নেই, কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ওকে শুধরে দিল তাইতা। ওর কাছে কতদিন আটক ছিলেন? দশ বছর বললেন না?
দশ বছর, সায় দিলেন দিমিতার। প্রত্যেকটা বছর ছিল অনন্ত কালের মতো।
তাহলে তো অন্য যেকারও চেয়ে তাকে বেশি চেনেন আপনি। আপনার মাঝে তার অংশ আছে, ভেতর বাইরে নিজের ছাপ রেখে গেছে সে।
আমার কাছ থেকে নিয়েছেই শুধু, দেয়নি কিছু।
তার কাছ থেকে আপনিও নিয়েছেন বৈকি, হয়তো সমান নয়, তবে নারী পুরুষের কোনও মিলনই সম্পূর্ণ নিষ্ফল হয় না। তার সম্পর্কে ধারণা রয়েছে আপনার। হতে পারে সেটা আপনার জন্যে প্রচণ্ড বেদনাদায়ক হওয়ায় আড়াল করে রেখেছেন। বের করে আনতে সাহায্য করতে দিন।
অনুসন্ধানীর ভূমিকা গ্রহণ করল তাইতা। নির্মম হয়ে উঠল ও, শিকারের শারীরিক বা মানসিক দুর্বলতা ও ক্ষতের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে এখনও ওর মাঝে রয়ে যাওয়া মহা ডাইনীর অবশিষ্ট সমস্ত স্মৃতি খুঁড়ে বের করে আনতে লাগল, তা যত ক্ষীণ বা গভীরভাবে চাপা থাকুক। দিনের পর দিন বুড়ো মানুষটার মন তছনছ করে চলল। তবে পথ চলা থামাল না। বুনো মরুসূর্যকে ফাঁকি দিতে রাতের বেলায় চলছে, ভোরের আগে আবার শিবির ফেলছে। দিমিতারের তাঁবু খাটানোমাত্র সূর্যালোক থেকে আশ্রয় নিচ্ছে ওরা। তারপর জিজ্ঞাসাবাদের কাজ শুরু করছে তাইতা। অবশেষে বুড়ো মানুষটার ভোগান্তির সত্যিকার মাত্রা, ওর সাহস ও ইয়োসের বিপুল বিস্তারি নিপীড়নের কবল থেকে বাঁচতে তার শক্তির প্রয়োজন দেখে তার প্রতি জোরাল দরদ ও সমীহ বোধ করলেও নিজের কাজ থেকে বিরত হওয়ার মতো দয়া দেখাতে গেল না।
অবশেষে মনে হলো তাইতার শেখার মতো আর কিছু বাকি নেই, কিন্তু সম্ভষ্ট হতে পারল না ও। দিমিতারের জানানো তথ্যগুলোকে মনে হলো বাহ্যিক ও তুচ্ছ।
বাবিলনে আহুরা মাযদার পুরোহিতরা এক ধরনের জাদু চর্চা করে, অবশেষে দিমিতারকে বলল ও। মানুষকে মৃত্যুর কাছাকাছি গভীর ঘোরে পৌঁছে দিতে পারে ওরা। তারপর তার মনকে সময় ও স্থানের বিচারে সুদূরে, একেবারে জন্মের ক্ষণটিতে পর্যন্ত পাঠাতে পারে। জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়, বলা বা শোনা সমস্ত কথা, প্রতিটি কণ্ঠস্বর ও চেহারা পরিষ্কার হয়ে ওঠে তার কাছে।
