তোমাকে দেখেছি, চিনতে পারছি, গালালার তাইতা, এককালে ফারাওর চেয়ে কম ছিলে না তুমি, কিন্তু জীবিত যেকোনও ফারাওর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
আপনি জগতের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য গোটা মিশরের ফারাও ছিলেন। আপনার চেয়ে শক্তিশালী কেউ কোনওদিন আসবে না।
পুকুরের কাছে এসো, তাইতা। ওদিকে দিকে তাকিয়ে দেখ তোমার জন্যে কী ভাগ্য অপেক্ষা করে আছে।
কিনারের দিকে এগিয়ে গেল তাইতা, পানির দিকে তাকাল। মুহূর্তের জন্যে মাথাটা ঘুরে উঠল ওর। মনে হলো যেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। মহাসাগর, মরুভূমি আর অন্যান্য ছোটখাট পাহাড়সারি ওর অনেক নিচে বিছিয়ে আছে।
পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য দেখে নাও, বলে উঠল ফারাওর প্রতিমূর্তি। সব শহর আর মন্দির, সবুজ জমিন, বন জঙ্গল আর চারণভূমি দেখ। দেখে নাও সমস্ত খনি আর গহ্বর যেখান থেকে দাসের দল মূল্যবান ও চকচকে পাথর তুলে আনছে। দেখে নাও রত্ন ও অস্ত্রভাণ্ডার যেখানে বহুযুগের সম্পদ জমা হয়ে আছে। এসবই তোমার অধিকার আর শাসনের অপেক্ষায়। সোনালি কস্তনি নাড়লেন ফারাও। তাইতার চেখের সামনে দৃশ্যপট বদলে গেল।
সমতলের উপর দিয়ে কুচকাওয়াজ করে চলেছে বিশাল শক্তিশালী সেনাদল। সাগরের ঢেউয়ের মতো স্রোত তুলে এগিয়ে চলা যোদ্ধাদের ব্রোঞ্জের হেলমেটকে ছাড়িয়ে গেছে ঘোড়ার লেজের গোছা। বৰ্ম, ফলা আর বর্শাগুলো স্বর্গের তারার মতো ঝিলিক দিচ্ছে। যোদ্ধারা রথের পথে একবার হামলে পড়ছে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। কুচকাওয়াজ করে চলা পা আর চাকার ঘড়ঘড়ানি কাঁপিয়ে দিচ্ছে গোটা দুনিয়া। এই বিশাল সেনাদলের পেছন সারি তাদের সামনের সারির তোলা ধুলোর মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন তাদের শেষ নেই।
এই সেনাবাহিনী তোমার অধীনে থাকবে, বলে উঠলেন ফারাও। আবার অলঙ্কৃত কস্তনি নাড়লেন তিনি। ফের বদলে গেল দৃশ্য।
সকল সাগর-মহাসাগরের ছবি দেখতে পেল তাইতা। এই মহাপরাক্রমশালী বিস্তারের উপর দিয়ে ভেসে চলেছে যুদ্ধজাহাজের বহর। গালি আর বৈঠার দ্বিগুন সারিঅলা বারমি রয়েছে, ওগুলোর পাল ড্রাগন আর শুয়োর, সিংহ, দৈত্যদানো এবং পৌরাণিক জীবজন্তুর ছবিতে ভরা। ঢাকের বাদ্য মাঝিদের ছন্দ বেঁধে দিচ্ছে, ওদের যুদ্ধ র্যামের দীর্ঘ ব্রোঞ্জের ডগার কাছে ফেনা তুলে পাক খাচ্ছে পানি। যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা এত বেশি যে মহাসাগরের দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত বিছিয়ে আছে।
দেখ, তাইতা! এই নৌবাহিনীর নেতৃত্বে থাকবে তুমি। কোনও মানুষ বা জাতি তোমার সাথে টিকতে পারবে না। সারা দুনিয়া আর এর সব মানুষের উপর কর্তৃত্ব। ফলাবে তুমি। কস্তনিটা সরাসরি ওর দিকে দোলালেন ফারাও। তাঁর কণ্ঠস্বর যেন গোটা পরিবেশ পরিপূর্ণ করে তুলল, সব ইন্দ্রিয় ভোঁতা করে দিল, আকাশের বজ্ৰধনির মতো।
এসব কিছুই তোমার হাতের মুঠোয়, গালালার তাইতা, সামনে ঝুঁকলেন ফারাও, তারপর কস্তনি দিয়ে মিনের কাঁধে স্পর্শ করলেন। দেবতার বিশাল দণ্ড বেঁকে উঠল। তোমার শক্তি আর বীর্জ হয়ে উঠবে অপরাজেয়।
এবার অনন্ত ও দীর্ঘ জীবনের দেবতা হেহর কাধ স্পর্শ করলেন তিনি, লক্ষ বছরের তালের পাতা নাড়লেন তিনি। তোমাকে নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ দেহে চিরন্তন তারুণ্য দেওয়া হবে।
তারপর প্রজ্ঞা ও সকল জ্ঞানের দেবতা থথকে স্পর্শ করলেন তিনি। দীর্ঘ বাঁকানো ঠোঁট খুলল সে, কর্কশ গমগমে চিৎকার ছাড়ল। তোমাকে সকল প্রজ্ঞা, জ্ঞান আর বিদ্যার অধিকার দেওয়া হবে।
ফারাও যখন শেষ স্বর্গীয় অবয়ব আনুকে-কে স্পর্শ করলেন, বর্মের উপর তলোয়ার দিয়ে আঘাত হানল সে। যুদ্ধে বিজয়ী হবে তুমি, সারা দুনিয়া, সাগর ও আকাশের উপর আধিপত্য করবে, সব মানুষ তোমাকে প্রণাম করবে। এসবই তোমাকে দেওয়া হচ্ছে, গালালার তাইতা। কেবল হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিলেই। হলো।
ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়ানো ফারাওর সোনালি প্রতিমূর্তি জ্বলন্ত চোখে সরাসরি তাইতার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভাবগম্ভীর জাঁকের সাথে বাহকরা গুহার অন্ধকার গহ্বরে নিয়ে গেল পালকিটা। দৃশ্যটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে অবশেষে মিলিয়ে গেল।
ঘাসের উপর লুটিয়ে পড়ে ফিসফিস করে কথা বলে উঠল তাইতা, আর না। আমি আর প্রলোভন সহ্য করতে পারব না। এসব মহা মিথ্যার অংশ, কিন্তু কোনও মরণশীলের পক্ষেই তাকে রোখা সম্ভব নয়। সব রকম যুক্তিকে ছাপিয়ে আমার মন এসবকে সত্যি ভাবতে প্রলুব্ধ হচ্ছে। আমার মাঝে ক্ষুধা ও আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলছে, যা আমার বোধশক্তিকে ধ্বংস করে দেবে, আমাকে চিরন্তন জীবন থেকে বঞ্চিত করবে।
অবশেষে যখন গুহা ছেড়ে নেমে এলো, দেখল মেরেন ওর জন্যে বাগানের গেটে অপেক্ষা করছে। আপনাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি, ম্যাগাস। কেন যেন মনে হচ্ছিল আপনি বিপদে আছেন। আমার সাহায্য দরকার হতে পারে। কিন্তু বনের ভেতর পথ হারিয়ে ফেলেছি।
সব ঠিক আছে, মেরেন। তোমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই, যদিও সব কিছুর উপর তোমার সাহায্যকে আমি মূল্য দিই।
মহিলা ডাক্তার আপনার খোঁজ করছিল। কেন আপনাকে চাইছে, জানি না, তবে আমার মন বলছে যে ওকে বেশি গভীরভাবে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।
তোমার পরামর্শ আমার মনে থাকবে। অবশ্য, সৎ মেরেন, এখন পর্যন্ত তো তোমার সাথে কোনও রকম খারাপ আচরণ করেনি সে, তাই না?
