সন্ধ্যাটা তাইতার কাছে অনেক উপভোগ্য মনে হলো। সার্জনদের আলোচনায় এমন অনেক ডাক্তারি বিস্ময়কর ঘটনার কথা স্থান পেল যা এর আগে উচ্চারিত হতে শোনেনি। মেঘ-বাগিচার এক বা দুই বাটি অসাধারণ মদের কল্যাণে ওদের গাম্ভীর্য খসে পড়তেই মেরেন ও তিনাত অভিযান আর যুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ করা নানান বিস্ময়কর ঘটনার কথা বলে ওদের আনন্দ যোগাল। খাবার শেষে গিব্বা বাঁশি বাজাল, তাইতা গান গাইল।
পরিচারক তাইতা ও মেরেনকে ওদের কোয়ার্টারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এলে খানিকটা অংশ ওদের সাথে এগোল তিনাত।
আমাদের কবে পাহাড়ে নিয়ে যাবার কথা ভাবছ, কর্নেল? জানতে চাইল তাইতা।
আরও কয়েকটা দিন বাকি আছে। আমরা বিদায় নেওয়ার আগে অন্য কয়েকটা ব্যাপার সামাল দিতে হবে আমাকে। আপনাদের বিদায়ের আগে যথেষ্ট পূর্বাভাস দেব আমি।
আমি মুতাঙ্গি ছেড়ে আসার পর আমার সঙ্গীনী, মেয়েটাকে দেখেছ তুমি? জানতে চাইল তাইতা।ফেন নাম ওর। ওকে অনেক মনে পড়ছে।
তাকেও সমানভাবে আপনার প্রতি আকৃষ্ট মনে হয়েছে। এখানে আসার সময় গ্রাম হয়ে এসেছি আমি। আমাকে দেখে আমার ঘোড়ার পিছন পিছন ছুটে এসেছে আপনার খবর জানতে। আপনাকে নিয়ে যেতেই এখানে আসছি বললে দারুণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল সে। আপনাকে ওর সম্মান আর শ্রদ্ধা জানানোর দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে। দেখে খুবই ভালো আর খুশিতে আছে বলে মনে হয়েছে তাকে। চামকার মেয়ে, ওকে নিয়ে আপনার গর্ব করা উচিত।
আসলেও তাইতা, সায় দিল তাইতা। আমি সেজন্যে গর্বিত।
*
তাইতার সেরাতের স্বপ্নগুলো বেশ জটিল আর নানা স্তর বিশিষ্ট ছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওর পরিচিত নারী-পুরুষরা ভীড় জমাল সেখানে। কিন্তু বাকি সবাই অচেনা, তারপরেও ওদের ছাবি এত সূক্ষ্মভাবে ওর মনে খোদাই হয়ে গেল যেন ওরা শত শত বছরের রক্তমাংসের মানুষ, কল্পনা ও মাকড়শার জালে বোনা নয়। স্বপ্নগুলো একই সুতোয় গাঁথা যেগুলো দিয়ে ওকে এক প্রত্যাশার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে: দারুণ বিস্ময়কর একটা কিছু ঘটতে চলেছে-এক অসাধারণ ভাণ্ডারের খোঁজ করছে ও, ওর হাতের নাগালেই রয়েছে সেটা।
এক ধরনের উৎফুল্ল ভাব নিয়ে দিনের প্রথম আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথে জেগে উঠল ও, কিন্তু তার পেছনে কোনও কারণ খুঁজে পেল না। নাক ডেকে ঘূমাচ্ছে মেরেন, ওকে ওভাবেই রেখে আঙিনায় বের হয়ে এলো ও। শিশিরের মুক্তোয় ভরে গেছে। সূর্যটা সবে ক্লিফ বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। কোনও চিন্তাভাবনা ছাড়াই, স্রেফ গলায় ঝোলানো মাদুলিটা একবার পরখ করে আবারও উপরের বাগানের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করল ও।
বাগানে ঢোকার পরপরই প্রবল হয়ে উঠল ওর ভালো থাকার অনুভূতি। ছড়িতে ভর দিয়ে নেই ও, ওটা কাঁধের উপর ফেলে রেখেছে, দীর্ঘ স্থির পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে। শয়তানের গুহার দিকে চলে যাওয়া পথটা অস্পষ্ট নয়। ওখানে পৌঁছে দেখল জায়গাটা নির্জন। কেউ নেই, নিশ্চিত হয়ে জীবিত প্রাণীর খোঁজে দ্রুত গোটা এলাকাটা তল্লাশি করল। এখানে আর কেউই ছিল না। ওর অন্য সত্তার হেঁটে বেরাবার জায়গাটার জমিন স্যাঁতসেঁতে, নরম হলেও মানুষের পায়ের ছাপের আলামত চোখে পড়ল না। কোনও কিছুরই কোনও মানে হচ্ছে না। নিজের মানসিক সুস্থতার উপর বিশ্বাস রাখাই ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে ওর পক্ষে। আপন মন ও ইন্দ্রিয়ের সাক্ষী মানতে পারছে না। ওকে পাগলামীর প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। ডাইনী।
ধীরে ধীরে বাজনার ব্যাপারে সজাগ হয়ে উঠল ওঃ সিস্ট্রামসের রূপালি সুর এবং ডুগডুগির টানা আওয়াজ। মাদুলিটা শক্ত করে ধরে রাখল ও, আস্তে আস্তে গুহার মুখোমুখি হলো। কী দেখতে হবে ভেবে কিছুটা ভীত আবার কিছুটা উদ্ধত।
গুহার মুখ থেকে একটা ভাবগম্ভীর আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রা বের হয়ে শ্যাওলায় ঢাকা চাতালের উপর দিয়ে এগিয়ে গেল। চারটে অদ্ভুত চিড়িয়া কাঁধের উপর একটা সোনা ও আইভরির পালকি বইছে। প্রথম বাহক হচ্ছে বিদ্যার দেবতা ইবাইস-মাথা থথ। দ্বিতীয়জন চমৎকার সোনালি বর্ম ও তীর ধনুকে সজ্জিত যুদ্ধের দেবতা আনুকে, তৃতীয় জন অসীম ও দীর্ঘায়ুর দেবতা হেহ; তার পরনের পোশাক রুবি পাথরের মতো সবুজ, চোখজোড়া ঝলমলে হলুদ, লক্ষ বছরের তালের পাতা বহন করছে সে। শেষজন হচ্ছে পৌরুষ ও উর্বতরার দেবতা মিন, শকুনের চামড়ার মুকুট পরেছে সে, তার সম্পূর্ণ উথিত পুরুষাঙ্গ মাৰ্বল খুঁটির মতো কুঁচকি থেকে বের হয়ে আছে।
আর পালকিতে দাঁড়িয়ে অসাধারণ একটা অবয়ব, যেকোনও স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় দ্বিগুণ। তার পরনের স্কার্ট সোনার কাপড়ের, ব্রেসলেট ও অ্যাংকলেট খাঁটি সোনার, সোনা দিয়ে তৈরি ব্রেসপ্লেটে নীলকান্তমণি, টারকোয়েজ আর কামেলিয়ান বাসানো; ওটার মাথার উপর রাজকীয় গোখরা আর ভুরুতে শকুনের মাথাসহ মিশরের দ্বৈত মুকুট শোভা পাচ্ছে। অলঙ্কার বসানো বর্মের উপর আড়াআড়িভাবে অবয়বটার উপর রয়েছে শক্তির প্রতীকী কস্তনি।
ফারাও তামোসের জয় হোক! তাকে স্বাগত জানাল তাইতা। আমি তাইতা, আপনার জাগতিক দেহ আমিই পরিষ্কার করেছি, নব্বই দিবসের শোক কালে আপনার সেবা করেছি। আপনার শবদেহের মামিকরণের ব্যান্ডেজ বেঁধেছি। সোনার শবাধারে আপনাকে স্থাপন করেছি।
