আমিই তুমি, বলল আগন্তুক। কণ্ঠস্বর ওর নিজের হিসাবেই শনাক্ত করল তাইতা।
না, জোরে বলে উঠল তাইতা। আমিই আমি, তুমি লিজিয়ন। বেড়ালের থাবার কালো চিহ্ন বহন করছ তুমি। আমি সত্যির শাদা চিহ্নের স্পর্শ পেয়েছি। তুমি ভোরের ইয়োসের সৃষ্টি করা কল্পনা। আমি বাস্তবতা।
তোমার একগুঁয়েমি দিয়ে আমাদের দুজনকেই হতবাক করছ, কারণ আমরা দুজন এক, সমান, পুকুরের ওপারের লোকটা বলল। আমাকে অস্বীকার করার মানে নিজেকেই অস্বীকার করা। তোমাকে সেই সম্পদ দেখাতে এসেছি যা আমাদের দুজনেরই হতে পারে।
আমি দেখব না, বলল তাইতা, তোমার বিষাক্ত ইমেজগুলো আমার দেখা হয়ে গেছে।
না বলার সাহস করো না, কারণ তাতে তোমার নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হবে, বলল প্রতিবিম্ব। তোমাকে আমি যা দেখাতে যাচ্ছি কোনও মরণশীল মানুষ কোনওদিন দেখনি। পুকুরের দিকে তাকাও, তুমি যে আসলে আমি।
কালো জলের দিকে তাকাল তাইতা। কিছু নেই ওখানে, বলল ও।
সবই আছে, বলল অপর তাইতা। তুমি আর আমি, মানে আমরা সত্যিকার অর্থে সারা জীবন যা চেয়েছি। তোমার অন্তর্চক্ষু খোল, চলো একসাথে খুলি। তাই করল তাইতা, সাথে সাথে একটা আবছা দৃশ্য ভেসে উঠল ওর সামনে। যেন বন্ধ্যা বালিয়াড়ি ভরা সুবিশাল মরুভূমির দিকে তাকিয়েছে।
ওই মরুভূমি হচ্ছে সত্যির জ্ঞান বিহীন আমাদের অস্তিত্ব, বলল অপর তাইতা। সত্যি ছাড়া সবই বন্ধ্যা, একঘেয়ে। কিন্তু মরুভূমির ওধারে দেখ, আমার ক্ষুধার্ত আত্মা।
তাই করল তাইতা। দিগন্তে একটা বিশাল আলোক বিন্দু দেখতে পেল। একটা ঐশী আলো, একটামাত্র খাঁটি হীরা থেকে কেটে বের করা পাহাড়।
ওটাই সেই পাহাড় সব ভবিষ্যদ্বক্তা আর ম্যাগাস যার জন্যে যুদ্ধ করে। খামোকাই তা করে তারা। কোনও মরণশীল মানুষের পক্ষে ওই ঐশী আলোর নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। সব জ্ঞান আর প্রজ্ঞার পাহাড় ওটা।
অসম্ভব সুন্দর, ফিসফিস করে বলে উঠল তাইতা।
অনেক দূর থেকে ওটা দেখতে পাচ্ছি আমরা। মরণশীল মন ওটার চূড়ায় দাঁড়ালে কী সৌন্দর্য পাওয়া যাবে, কল্পনাও করতে পারবে না। তাইতা লক্ষ করল বুড়ো লোকটা খুশি আর শ্রদ্ধায় কাঁদছে। আমরা একসাথে ওই চূড়ায় গিয়ে দাঁড়াতে পারি, আমার অন্য সত্তা। কোনও মানুষ যা কোনওদিন পায়নি আমরা তা পেতে পারি। এরচেয়ে বড় পুরস্কার আর হতে পারে না।
উঠে ধীর পায়ে পুকুরের কিনারে এসে দাঁড়াল তাইতা। দৃশ্যের দিকে ভালো করে তাকাল ও, এমন একটা আকাক্ষা বোধ করল যা ওর অতীতের সব আকাঙ্ক্ষাকে ছাপিয়ে গেল। এটা কোনও গ্লানিকর কামনা নয়, কোনও খারাপ দৈহিক ইচ্ছাও নয়। এটা একেবারে পরিষ্কার, উন্নত ও খাঁটি, হীরক পাহাড়ের মতোই।
তোমার অনুভূতি বুঝতে পারছি, বলল নকল তাইতা। কারণ আমারও ওই একই অনুভূতি। উঠে দাঁড়াল সে। আমাদের আটকে রাখা, বন্দি করে রাখা এই প্রাচীন নাজুক দেহের দিকে একবার তাকাও। এর সাথে এককালে আমাদের সেই নিখুঁত রূপের তুলনা করো, যেটা আবার আমাদের হতে পারে। পানিতে তাকিয়ে আমাদের আগে কেউ দেখেনি কেউ আর কোনও দিন দেখবে না এমন একটা জিনিস দেখ। এর সবই আমাদের হাতে তুলে দিতে রাখা হয়েছে। এমন উপহার প্রত্যাখ্যান করা কি অপবিত্রতা নয়? হীরার পাহাড়ের দৃশ্যের দিকে ইঙ্গিত করল সে। দেখ, কীভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমরা কি আর কখনও ওটার দিকে চোখ ফেরাতে পারব? সিদ্ধান্ত আমাদের, তোমার আর আমার। ঝলমলে পাহাড়ের দৃশ্য কালো জলে মিশে গেল। তাইতাকে শূন্য, বেদনার্ত করে তুলল।
ওর হুবহু প্রতিবিম্ব উঠে পুকুরের কিনারা ঘুরে ওর কাছে এলো। তাইতাকে আলিঙ্গন করতে হাত মেলে দিল সে। বিতৃষ্ণার একটা শিহরণ বোধ করল ও। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভ্রাতৃত্বমূলক ইঙ্গিতের সাড়া দিতে হাত ওঠোল। ওরা স্পর্শ করার আগেই একটা নীল ঝলক কড়কড় করে উঠল ওদের মাঝখানে। স্থির বিদ্যুতের ঝলকের মতো একটা ধাক্কা বোধ করল তাইতা। ওর অপর সত্তা হারিয়ে গেল ওর মাঝে। এক হয়ে গেল ওরা।
হীরার পাহাড়ের ঝলক জাদুর পুকুর ছেড়ে বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়ার অনেক পরেও রয়ে গেল ওর মনে।
নিচের গেটে ওর অপেক্ষায় ছিল মেরেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে আপনাকে খুঁজে মরছি, তাইতার সাথে যোগ দিতে ছুটে এলো সে। কিন্তু এ জায়গাটা বড্ড অদ্ভুত। কয়েক হাজার রাস্তা থাকলেও সবই আবার এখানে ফিরে এসেছে।
আমার খোঁজে এসেছ কেন? ডাইনীর বাগানের জটিলতা মেরেনের কাছে ব্যাখ্যা করা অর্থহীন।
কর্নেল তিনাত আনকুর খানিক আগে এসে পৌঁছেছে এখানে। ক্যাপ্টেন ওনকার কোনও লক্ষণ নেই। বলতে খুশি লাগছে যে সৎ কর্নেলের সাথে কথা বলার তেমন একটা সুযোগ হয়ে ওঠেনি আমার। এটাও বলতে পারব না যে তাতে অনেক ফায়দা হতো আমার। তার কখনওই তেমন কিছু বলার থাকে না।
একাই এসেছে সে?
না, অন্যরাও আছে, ছয়জন সৈনিক আর দশ মেয়ের একটা দল।
কী ধরনের মেয়ে?
অনেক দূরে থেকে দেখেছি আসলে-হ্রদের এই পাশে ছিলাম আমি। ওদের ভেতর অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। ওদের অল্প বয়সী মনে হয়েছে, অবশ্য ঘোড়ার পিঠে ঠিকমতো বসতে পারছিল না। ভাবলাম ওদের আগমনের ব্যাপারটা আপনাকে আগেভাগে জানানো দরকার।
ঠিক করেছে তুমি, অবশ্য সেজন্যে তোমার উপর সব সময়ই নির্ভর করতে পারি আমি।
আপনার হয়েছে কী? আপনার চোখে মুখে কেমন যেন অদ্ভুত অভিব্যক্তি-ঘোর লাগা মৃদু হাসি আর স্বপ্নিল চোখ। কী অকাজ করছিলেন আপনি, ম্যাগাস?
